শবে বরাতের গুরুত্ব ও মর্যাদা
মাও. আবুল হাসান মো. নাসরুল্লাহ
অ+ অ-প্রিন্ট
ইসলামের সর্বাধিক ফযিলতপূর্ণ ও বরকতময় রজনীগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পবিত্র শবে বরাত। উম্মাতে মোহাম্মদীর মর্যাদা বৃদ্ধি, রহমাত ও মাগফিরাতের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে শবে বরাত এক মহা নিয়ামত। পাপ-পঙ্কিলতায় জর্জরিত হতভাগ্য কোন ব্যক্তির জন্য খাঁটি তওবা করে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের অপূর্ব সুযোগ এ মহিমান্বিত রজনী। তাইতো বছর ঘুরে যখন শবে বরাত মুসলমানের দোরগোড়ায় উপস্থিত হয়, তখন তারা এর ফযিলত ও বরকত হাসিলে ব্যাকুল হয়ে ওঠে।  

শবে বরাত

আরবী শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে শবে বরাত বলা হয়। ফার্সী ভাষায় শবে বরাতের শাব্দিক অর্থ- ভাগ্য রজনী। ভারত বর্ষের মুসলমানদের নিকট এটি ভাগ্য রজনী হিসেবেই সুপ্রসিদ্ধ। মহিমান্বিত এ রজনীর  আরবী নাম হচ্ছে “লাইলাতুল বারাআত” (মুক্তির রজনী)। 

হাদীস শরীফে এ রজনীকে “লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান” (মধ্য শাবানের রজনী) উল্লেখ করা হয়েছে। গোটা মুসলিম জাহানে এ নাম দুটিই বেশি সমাদৃত।

শবে বরাতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেনঃ “আমি একে অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রজনীতে, আমি তো সতর্ককারী। এ রজনীতে প্রত্যক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরিকৃত হয়। (সূরা দুখান-৩-৪ আয়াত)। তাবেয়ীপ্রবর হযরত ইকরামা (রা.) ও একদল আইম্মায়ে কিরামের মতে, এ আয়াতে উল্লেখিত “মোবারক রজনী” দ্বারা উদ্দেশ্য লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বা শবে বরাত। যদিও জমহুর মুফাসসিরীন এর দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়েছেন  লাইলাতুল ক্বদর। কিন্ত এতে  শবে বরাতের সম্ভাবনা একদম  নাকচ হয়ে যায়নি। তাই একদল মোফাসসিরীনের মত অনুযায়ী শবে বরাত “মোবারক রজনী” হওয়ায় এ রাতটি অন্যান্য রাতের তুলনায় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।  হাদীস গ্রন্থসমূহে শবে বরাতের গুরুত্ব ও মর্যাদা  সম্পর্কিত অনেক হাদীস এসেছে। অত্যধিক গুরুত্ববহ এসব হাদীসের একটি হযরত আয়শা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) একদা রাতে সালাত আদায় করছিলেন। তিনি সিজদায় দীর্ঘ সময় থাকলেন। এতে আমার মনে হল যে, তাঁর ওফাত হয়ে গেছে। আমি যখন এমনটি দেখলাম তখন শয়ন থেকে উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলী নাড়া দিলাম, ফলে তিনি নড়ে উঠলেন। অতঃপর যখন তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠালেন এবং নামায শেষ করলেন তখন বললেন, হে আয়শা তুমি কি মনে করেছিলে যে, নবী (স.) তোমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ , আমি এমনটি মনে করিনি। বরং আপনার দীর্ঘ সিজদার কারণে আমার মনে হয়েছে যে আপনার ওফাত হয়ে গেছে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স.)  সম্যক জ্ঞাত। তিনি বললেন, এটি মধ্য শাবানের রাত। আল্লাহ তায়ালা এ রাতে বান্দাদের প্রতি তাঁর রহমত প্রেরণ করেন। যারা ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদেরকে ক্ষমা করেন, যারা দয়া প্রার্থনা করে তাদেরকে দয়া করেন এবং যারা বিদ্বেষী তাদেরকে তাদের অবস্থাতেই রেখে দেন। (বায়হাক্বী, শোয়াবুল ঈমান, ৩/৩৮৩৫)

শবে বরাতের অসংখ্য নাম ও এ রাতের মর্যাদা

শবে বরাতের অসংখ্য নাম রয়েছে। এ নামগুলোর তাৎপর্য  বিশ্লেষণে ফুটে ওঠে এ রাতের  সুমহান মর্যাদা। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে  নামের সংখ্যাধিক্যই  শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে। যেমন, পবিত্র কোরআনের অসংখ্য নাম এ গ্রন্থের সুউচ্চ মর্যাদার বহিঃপ্রকাশ। 

আবুল খাইর আত-তালিকানী (রহঃ) শবে বরাতের ২২ টি নাম উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি নাম হল-লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (মধ্য শাবানের রাত), লাইলাতুল বারাআহ (মুক্তির রাত), লাইলাতুল মোবারাকাহ (বরকতময় রাত), লাইলাতুর রাহমাহ (অনুগ্রহের রাত), লাইলাতুল ক্বিসমাহ (বন্টনের রাত), লাইলাতুত তাকফীর (কাফফারার রাত), লাইলাতুল ইজাবাহ (দোয়া কবুলের রাত), লাইলাতুস সাক (সনদের রাত), লাইলাতুল জায়িযাহ (পুরস্কারের রাত), লাইলাতুল ক্বদর (ভাগ্য রজনী) ও লাইলাতু ঈদিল মালাইকাহ (ফিরিশতাদের ঈদের রাত) ইত্যাদি। 

 -(সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বিন আলুভী আল-মালেকী, লিমাযা শাবান?, পৃঃ-৭২)

মুক্তির রজণী শবেবরাত

হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী, আল্লাহ তায়ালা এ রাতে বান্দাদের এক বৃহৎ দলের গুণাহ মাফ করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন বিধায় এ রাতকে  লাইলাতুল বারাআত বা গুনাহ মুক্তির রাত বলা হয়। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) বলেন- ট্যাক্স আদায়কারীগন যেমন জনগনের কাছ থেকে পূর্ণ কর আদায় করে তাদেরকে বারাআত বা দায়মুক্তের সার্টিফিকেট হস্তান্তর করেন, আল্লাহ তায়ালাও এ রাত্রে মুমিন বান্দাদের ক্ষমা করে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সার্টিফিকেট দেন  বলে এ রাতের নামকরণ হয়েছে লাইলাতুল বারাআত (তাফসীরে কাবীর)। 

তিরমিযী শরীফে হযরত আয়শা (রা.)  হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, মধ্য শাবানের রাত্রিতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে তাঁর রহমাত প্রেরণ করেন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চেয়ে অধিক সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করেন। (তিরমিযী-৭৩৯, মুসনাদে আহমাদ-২৬০৬)। 

ইমাম বায়হাক্বীর বর্ণনায় এসেছে- আল্লাহ তায়ালা এ রাত্রে কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চেয়ে অধিক সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ দান করেন। (বায়হাক্বী, শোয়াবুল ঈমান-৩/৩৮৩৭) উল্লেখ্য, এখানে কালব গোত্রের কথা এ জন্যই বলা হয়েছে যে, তখনকার সময় আরব দেশে সর্বাধিক সংখ্যক মেষ ছিল একমাত্র তাদের। উদ্দেশ্য, উক্ত রাতে আল্লাহ তায়ালার ব্যাপক ক্ষমার প্রতি উম্মতের দৃষ্টি আকর্ষণ। (যুরকানী, শরহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যাহ, ১০/ ৫৬০)

লেখক : প্রভাষক (আরবী),নাঙ্গুলী নেছারিয়া ফাযিল মাদরাসা,কাউখালী, পিরোজপুর।

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ২২:৫০:২৯