সুরা মুলকের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
মহান আল্লাহ নবী-রাসুলদের মাধ্যমে মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন সঠিক জীবনাদর্শ তথা সৌভাগ্যের পথ ও তা অর্জনের কর্মসূচি। তবে এই সঠিক পথ বেছে নেয়াকে মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়নি।

ফলে অনেক মানুষ এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করতে গিয়ে মুক্তি, সৌভাগ্য ও সঠিক পথের মাধ্যম তথা নবী-রাসুলদের বিরোধী বা শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। হীন কামনা-বাসনা, অজ্ঞতা ও আত্ম-প্রেমের শিকার হয়েই তারা সত্যের এবং নবী-রাসুলদের নবুওতের সত্যতার বিরোধী ও প্রত্যাখ্যানকারী হয়ে ওঠে। তাই কিয়ামত পর্যন্ত এ ধরনের অসচেতন সব মানুষকে সতর্ক করার জন্য পবিত্র কুরআনের সুরা মুলক্-এ তুলে ধরা হয়েছে দোযখের প্রহরী ও দোযখীদের সংলাপ। এখানে বলা হচ্ছে সঠিক পথ বেছে নিতে মানুষ যেন ভুল না করে। সুরা মুলক্-এর আট ও নয় নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

'যারা তাদের পালনকর্তাকে অস্বীকার করেছে তাদের জন্যে রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। সেটা কতই না নিকৃষ্ট স্থান। যখন সেখানে তাদের ছুঁড়ে ফেলা হবে,তখন তারা তার উৎক্ষিপ্ত ভয়ানক গর্জন শুনতে পাবে (ফলে তারা খুবই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে)। ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে- (কারণ, সব সময় এভাবেই তা টগ্‌বগ্‌ করতে থাকে)। যখনই তাতে ছুঁড়ে ফেলা হবে কোনো সম্প্রদায়কে- তখন তাদেরকে দোযখের সেনারা প্রশ্ন করবে: তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আসেনি?'

তখন তারা বলবে: হ্যাঁ, আমাদের কাছে সতর্ককারী এসেছিল,কিন্তু এরপর আমরা তাদেরকে অস্বীকার করেছিলাম এবং তাদের সম্পর্কে মিথ্যারোপ করে বলেছিলামঃ আল্লাহ তা’আলা কোন কিছু নাজিল করেননি। তোমরা মু'মিন বা বিশ্বাসীরা মহাবিভ্রান্তিতে পড়ে রয়েছ।    

-অর্থাৎ দোযখীরা স্বীকার করে বলবে, তারা নবী-রাসুলদের যে কেবল অস্বীকার করত তা নয়, একইসঙ্গে তাঁদের প্রাণ-সঞ্চারী বাণীকেও অমান্য করত। তারা আরও বলবে: আমরা মানুষের আত্মিক বা চিন্তাগত রোগের চিকিৎসাকারী এই মহান চিকিৎসকদের বিভ্রান্ত বলে অপবাদ দিতাম ও তাঁদেরকে আমাদের কাছ থেকে দূরে তাড়িয়ে দিতাম! কিন্তু হায়! আমরা যদি শুনতাম ! অথবা আমরা যদি বিবেককে কাজে লাগাতাম তাহলে আজ দোযখে থাকতে হত না!

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, একদল কাফির বা মুনাফিক বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর অনুপস্থিতিতে তাঁর বিরুদ্ধে অশালীন ও অন্যায্য কথা বলত। আর মহান আল্লাহর ওহির ফেরেশতা হযরত জিবরাইল (আ) তাদের এসব কথা মহানবীর কাজে জানিয়ে দিতেন। তাদের কেউ কেউ একে-অপরকে বলত: তোমরা এসব কথা গোপনে বলবে যাতে মুহাম্মাদের আল্লাহ শুনতে না পারে! –এ অবস্থায় নাজিল হয় সুরা মুলক্‌-এর ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াত। এখানে মহান আল্লাহ বলছেন: তোমরা তোমাদের কথা গোপনে বল অথবা প্রকাশ্যে বল,তিনি তো অন্তরের বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত। যিনি সৃষ্টি করেছেন,তিনি কি করে জানবেন না? তিনি সূক্ষ্মজ্ঞানী তথা রহস্যগুলো নিখুঁতভাবে জানেন এবং সম্যক জ্ঞাত।

সুরা মুলক্‌-এর ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

'তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে সুগম করেছেন, অতএব,তোমরা তার কাঁধে বা উপত্যকাগুলোয় বিচরণ কর এবং তাঁর দেয়া রিযিক আহার কর। জেনে রাখ তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবন হবে তোমাদের।'

নানা ধরনের ঘূর্ণন-গতি থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীকে মনে হয় স্থির গ্রহ। পৃথিবী নিজের অক্ষকে কেন্দ্র করে তিনভাবে ঘুরছে। আবার সূর্যকে অক্ষ করেও ঘুরছে পৃথিবী। সৌরজগতের বা ছায়াপথের অন্য গ্রহ-নক্ষত্রগুলোর সাথে তাল মিলিয়েও এক ধরনের গতিতে ঘুরছে বা চলছে পৃথিবী।  পৃথিবীর নানা ধরনের এসব গতি বা ঘুর্নন খুব দ্রুত গতি-সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সেসবকে এমনই মোলায়েম ও ধীর লয়ের বলে মনে হয় যে এইসব গতির সুস্পষ্ট নানা প্রমাণ ও নিদর্শন না থাকলে কেউ বিশ্বাসই করত না যে পৃথিবীর গতি রয়েছে বা তা ঘুরছে অথবা নড়াচড়া করছে। পৃথিবীর ভূখন্ড এত কঠিন বা এবড়ো-থেবড়ো নয় যে গ্রহটি মানুষের বসবাসের অযোগ্য, আবার এত বেশি নরম নয় যে মানুষ তাতে ডেবে যেতে থাকে। অর্থাৎ পৃথিবীর ভূখণ্ড মানুষের বসবাসের জন্য পুরোপুরি উপযোগী।   

পৃথিবীর অবস্থান সূর্য থেকে খুব বেশি দূরে নয় যে এখানে তীব্র শীতলতা থাকে, কিংবা এত বেশি কাছেও নয় যে মানুষ খুব বেশি গরম অনুভব করে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বাতাসের চাপও এমন যে তা মানুষের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ এবং ভূমির মাধ্যাকর্ষণও এত তীব্র নয় যে চাপের ফলে আমাদের শরীরের হাড়গুলো এলোমেলো হয়ে পড়তে পারে! এই আকর্ষণ এত কমও নয় যে অন্য কোনো কিছুর টানে মানুষ তার স্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে মহাশূন্যে উড়ে যাবে। মোট কথা আমাদের এই পৃথিবীর ভূমি মানুষের জন্য সব দিক থেকেই এমন ভারসাম্যপূর্ণ যে তা মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে বা বশীভূত অবস্থায় রয়েছে।

জমিনকে মানুষের জন্য সুগম করে দেয়া হলেও সুরা মুলক্‌-এর ১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, তিনি চাইলে ও নির্দেশ দিলে বশীভূত এই জমিন বা শান্ত পৃথিবী অশান্ত হয়ে যাবে এবং শুরু হবে ভূমিকম্প ও জমিনে দেখা দেবে ফাটল। ফলে তোমাদের বাড়ি-ঘর ও শহরগুলো তলিয়ে যাবে মাটির গর্তের ভেতরে। সুরা মুলক্-এর ১৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

ভূমিকম্প সম্পর্কে যেভাবে ভাবনাহীন ও নিশ্চিত হওয়া যায় না, তেমনি আকাশ থেকে প্রবল ঘূর্ণি হাওয়াসহ পাথরের বৃষ্টি বর্ষণের বিষয়েও মানুষ নিশ্চিত হতে পারে না। আল্লাহ চাইলে ভূমি ধসিয়ে বা পাথরের বৃষ্টির মাধ্যমে মানুষকে পাথরের স্তুপের নীচে জীবন্ত কবর দিতে পারেন।

- কিন্তু যারা খোদাদ্রোহী বা অবিশ্বাসী তারা মুক্তির পথ বা সুপথ বন্ধ করে দেয় নিজেদের জন্য। তারা মহান আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে অস্বীকার করে। তারা উপহাস করে বলে:

এই প্রতিশ্রুতি তথা কিয়ামত কবে হবে,যদি তোমরা সত্যবাদী হও? –এর জবাবে পরের আয়াত তথা সুরা মুলক্‌-এর ২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

হে নবী আপনি বলুন, এর জ্ঞান আল্লাহ তা’আলার কাছেই আছে। আমি তো কেবল প্রকাশ্য সতর্ককারী।

মক্কার কাফিররা বিশ্বনবী (সা) ও মুসলমানদের প্রতি অভিশাপ দিত এবং তাঁদের মৃত্যু কামনা করত। মহানবী (সা) এবং তাঁর সঙ্গীরা ইন্তিকাল করলে ইসলামের পথে তাঁদের আহ্বানও শেষ হয়ে যাবে বলে তারা দুরাশা পোষণ করত।

সুরা মুলকের ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

হে নবী আপনি বলুন, তোমরা কি ভেবে দেখেছ-যদি আল্লাহ তা’আলা আমাকে ও আমার সঙ্গীদেরকে ধ্বংস করেন অথবা আমাদের প্রতি দয়া করেন, তবে কাফিরদেরকে কে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে রক্ষা করবে?

পরের আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

হে নবী আপনি বলুন, তিনি পরম করুণাময়, আমরা তাতে বিশ্বাস রাখি এবং তাঁরই উপর ভরসা করি। শিগগিরই তোমরা জানতে পারবে,কে প্রকাশ্য পথ-ভ্রষ্টতায় আছে। 

 

 

 

 

২৮ জানুয়ারি, ২০১৯ ০৮:৫৪:৩৩