পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা!
অ+ অ-প্রিন্ট
পবিত্র কুরআনের সুরা বনি ইসরাইলের ২৪ নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা নির্দেশ করেছেন, “শুধু আমারই ইবাদত কর এবং পিতামাতার প্রতি সদয়তা প্রদর্শন কর। তাদের মধ্যে কোন একজন অথবা উভয়ই যদি বার্ধক্যে উপনীত হয় তবে তাদের প্রতি কখনও কোন প্রকার বিতৃষ্ণা বা নিন্দার ভাব প্রদর্শন করবে না; এবং তাদের সাথে ভালভাবে কথা বলবে।”  

আবার সুরা আনকাবুতের ৯নং আয়াতে বলা হয়েছে “আমরা পিতামাতার প্রতি সদয় হতে নির্দেশ প্রদান করেছি; আর যদি তারা জ্ঞানের অভাবে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে ও তা মান্য করতে বলে তবে তা করো না। তুমি আমার দিকেই প্রত্যাবর্তণ করবে এবং আমিই তোমাকে  তোমার কৃতকর্মের কথা জানাব।”

সহি বুখারী শরীফের বর্ণনা করা হয়েছে একজন লোক একদা পবিত্র নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বললেন যে, তার বেশ কয়জন সন্তান রয়েছে; তবে তাদের কাউকেই তিনি চুমু দেন নাই। উত্তরে নবীজী বললেন,“নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তার সেই বান্দারেই ক্ষমা প্রদর্শন করবেন যারা অপরের প্রতি সদয় প্রদর্শন করে।”

এ হাদিসেরই অন্যত্র বলা হয়েছে,“প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) একদা হযরত আলীর (রাঃ) পুত্র আল হাসানকে চুমু খেলেন।  হাবিস আল তামিমের পুত্র আল আকরা তখন তাঁঁর সাথে বসে ছিলেন। আল আকরা বললেন,“আমার দশজন সন্তান রয়েছে এবং তাদের একজনকেউ আমি চুমু খাইনি। পবিত্র নবী তার দিকে তাকিয়ে বললেন,“যে অপরের প্রতি ক্ষমাশীল নয় তার প্রতিও ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে না।”

এ হাদিসেই আবার বলা হয়েছে জায়িদের পুত্র উসামা বর্ণনা করেছেন,“মুহাম্মদ (সাঃ) তঁাঁর এক উরুদেশে আমাকে এবং অপর উরুদেশে হাসানকে বসিয়ে জড়িয়ে ধরতেন এবং বলতেন,“হে আল্লাহ অনুগ্রহপূর্বক এদের প্রতি ক্ষমাশীল হও, কেননা আমি এদের প্রতি ক্ষমাশীল।”

তিরমিজি শরীফে বলা হয়েছে,“সেই ব্যক্তি আমাদের অর্ন্তভূক্ত নয় - যে আমাদের নবীনদের প্রতি ক্ষমাশীল নয় এবং যে আমাদের প্রবীনদের সম্মান করেনা।”

প্রতিশ্রুত মসীহ মাওউদ (আঃ) বলেছেন,“আত্ম-মর্যাদা এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারী ব্যক্তি,  যিনি ধৈর্য্যশীল ও গাম্ভীর্যপূর্ণও বটে, কোন শিশুকে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সংশোধন অথবা সঠিক পথ দেখানোর অধিকার রাখেন। তবে ক্রোধপূর্ণ ও গরম মেজাজী কোন ব্যক্তি,  যিনি সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়েনে, শিশুদের অভিভাবক হওয়ার জন্য উপযুক্ত নন।”

গত ১৯শে অক্টোবর, ২০১৪ইং তারিখে লন্ডনে অনুষ্ঠিত আনসার ইজতেমায় খলিফাতুল মসীহ আল খামেস হজরত মাসরুর আহমদ বলেন,“তবে আমাদের নিজেদের এ বিষয়টি পর্যালোচনা  করে দেখতে হবে যে, ইসলামের উপরোক্ত সত্য শিক্ষা আমরা কতটুকু পালন করছি ... ইসলামের সত্য শিক্ষা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রথিত করতে হবে এবং ইতিবাচক উদাহরণগুলোর মাধ্যমেই জীবন পরিচালনা করতে হবে। আর এটাই হচ্ছে আমাদের পবিত্র নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পবিত্রতা এবং মহত্বকে এবং ইসলাম যে একটি জীবন্ত ধর্ম তা বিশ^ব্যাপি তুলে ধরার সঠিক উপায়।”

গত ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৩ইং তারিখে জুম্মার খুতবায় যুগ খলিফা বলেন, “আর তাই পিতা-মাতার এটি একটি বড় দায়িত্ব যে তারা, কর্মের মাধ্যমে, তাদের সন্তানদের নামাজ পড়তে উদ্বুদ্ধ করবেন। কর্মের মাধ্যমে তারা তাদের সন্তানদের সত্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করবেন এবং অন্যান্য উঁচু স্তরের নৈতিক গুণাবলীর বিষয়ে অবহিত করবেন যাতে করে সন্তানেরাও ঐ সকল গুণাবলী নিজেদের মধ্যে প্রথিত করতে পারে। তাদের মিথ্যা শপথ গ্রহণ পরিহার করতে হবে যাতে করে সন্তানেরাও এসব থেকে রক্ষা পেতে পারে।  পিতা-মাতা যদি ধার্মিক হন, নিয়মিত নামাজ পড়েন, কুরআন পড়েন এবং ভালবাসা ও মায়ামমতার পরিবেশে একত্রে বাস করেন এবং মিথ্যাকে ঘৃণার সাথে পরিহার করেন তবে তাদের পরিচর্যা এবং প্রভাবাধীন সন্তানেরাও এধরণের নৈতিক উৎকর্ষতাকে গ্রহণ করবে। অন্যদিকে পিতা-মাতা যদি মিথ্যা বলেন, মারামারি ও ঝগড়া বিবাদ করেন, বাড়ির ভিতর অপর সম্পর্কে গালিগালাজপূর্ণ অথবা অসম্মানজনক কথাবার্তা বলেন, এমনকি জামাত সম্পর্কিত যতাযথ বিষয় বা এধরণের অন্যান্য খারাপ কর্মকান্ডের বিষয়ে ব্যবস্থা না নেন যা তাদের সন্তানেরা দেখছে; তাতে করে ঐসব প্রবণতার কারণে সন্তানেরাও তা অনুকরণ করে বা ঐ পরিবেশের প্রভাবের কারণে সন্তানেরাও এসব খারাপ জিনিসই শিখে থাকে।”

ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে বিয়ে-শাদী করার পর নিজেদের পরিবার আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরেন অথবা পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় ব্যস্ত হয়ে পরতে অনেকটাই বাধ্য হন। আবার কর্মক্ষেত্র, ক্যারিয়ার, নিজ সন্তানের ভবিষ্যৎসহ বহুবিধ কারণে ছেলে মেয়েদের মা-বাবা বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য থেকে দূরে, কোন কোন ক্ষেত্রে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে, অবস্থানের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে বয়োজ্যেষ্ঠরা অনেকটাই একাকিত্বে ভুগতে থাকেন বা নিজেদের অসহায় মনে করেন।  ছেলে মেয়ে আর নতি নাতনির প্রতি ভালবাসা প্রকাশের সুযোগ থেকে বষ্চিত হন। আবার ভবিষ্যতে সাহায্য - সমর্থনের প্রয়োজন হলে তারা নিজ সন্তানের কাছ থেকে সেটা না পাওয়ার ভয় তাদের মধ্যে কাজ করে। সেক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েরা তাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে মাতা-পিতাকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা, সম্ভাব্য সকল যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা, সম্ভব হলে তাদের দেখতে যাওয়া, তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা বা তাদের সেবার জন্য লোক রেখে দিতে পারেন।  মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে পরিবারের প্রবীন সদস্যদের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা বুঝার এবং পালন করার তৌফিক দান করুন (আমীন)।  

=================

গত অক্টোবর মাসে ওয়াশিংটন ডিসি জামাতের বার্ষিক সাধারণ সভায় পঠিত বক্তব্যের সারসংক্ষেপ। 

অনুবাদ - শহীদ মোঃ মোবাশে^র, প্রকাশনা সম্পাদক, আহমদীয়া মুসলিম জামাত ওয়াশিংটন ডি.সি., যুক্তরাষ্ট্র        

 

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৩:০০:২৮