আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
মুহা. আবু বকর বিন ফারুক
অ+ অ-প্রিন্ট
মহররম মাসের দশ তারিখকে ইয়াওমে আশুরা বলা হয়। এ দিনটি অতীব সম্মানিত। এ দিনের মর্তবা, ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য অফুরন্ত। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনে বহু ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যার কারণে এ দিনের গুরুত্ব বহু অংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দিনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি হলো : এদিনে আল্লাহ তায়ালা লওহে মাহফুজ ও প্রাণিকূলের প্রাণ সৃষ্টি করেন। দুনিয়ার সমস্ত সমুদ্র, মহাসমুদ্র এবং পাহাড় পর্বত এ দিনেই সৃষ্টি হয়। হযরত আদম (আঃ)কে আল্লাহ তায়ালা এই তারিখে সৃষ্টি করে এই তারিখেই বেহেশতে প্রবেশ করিয়েছেন। আবার আদম (আঃ) বেহেশত হতে দুনিয়ায় পদার্পণের পর এই তারিখেই তাঁর তাওবা কবুল হয়েছিলো। হযরত ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ (আঃ)কে আল্লাহ তায়ালা এই তারিখে সৃষ্টি করেছেন এবং এই তারিখে তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)কে আল্লাহর হুকুমে জবেহ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিলো। হযরত মূসা (আঃ) এর পিছু নিয়ে ফেরআউন ও তার দলবল নীলনদে ডুবে মরেছিলো এবং মূসা (আঃ) ও তাঁর কাওমের লোকজন নীলনদ পার হয়ে নদীর তীরে উঠে ছিলেন এইদিনে। হযরত ঈসা (আঃ) দুনিয়ায় আগমন করেছিলেন এইদিনে। আর এ তারিখেই আখেরী পয়গাম্বর সাইয়্যেদুল মুরসালিন রাহমাতুলি্লল আলামীন রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)সহ নবী বংশের ৭২জন কারবালার ময়দানে নির্মমভাবে শাহাদাতবরণ করেন। সর্বশেষ আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী মহররম মাসের দশ তারিখে তথা আশুরার দিন ফেরেশতা হযরত ইস্রাফীল (আঃ) শিঙ্গায় ফুঁক দিয়ে কেয়ামত ঘটাবেন। এ কারণেই মহররম মাসের দশ তারিখকে ঐতিহাসিকভাবে ইয়াওমে আশুরা বলা হয়। এ মাসের সম্মান রক্ষার্থে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও এ মাসে কাফের মোশরেকদের সাথে যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হন নি।

ইয়াওমে আশুরার ফজিলত ও মর্তবা অনেক। এ বিষয়ে সামান্যতম আলোকপাত করা হলো। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মাসের ৯ ও ১০ তারিখে রোজা রাখতেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে দুই দুই রাকয়াতের নিয়তে চারি রাকয়াত নফল নামাজ পড়ে এবং প্রতি রাকয়াতে সূরা ফাতেহার সাথে সূরা যিলযাল, সূরা কাফেরুন এবং সূরা এখলাস পাঠ করে আল্লাহ তায়ালা তাকে হাশরের মাঠে বিপদমুক্ত করবেন।

তাযকেরাতুল আওরাদ কিতাবে উদ্ধৃত, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)-এর এক রেওয়ায়েতে আছে, যে ব্যক্তি আশুরার রাতে সোবহে সাদেকের পূর্বক্ষণে চারি রাকয়াত নফল নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তায়ালা তার যাবতীয় গুনাহ মাফ করবেন, তাকে বহু সওয়াবের অধিকারী করবেন এবং সে বেহেশতের যাবতীয় নেয়ামতের হকদার হবে। এই নামাযের প্রতি রাকয়াতে সূরা ফাতেহার সাথে একবার আয়াতুল কুরসী ও তিনবার সূরা এখলাস এবং নামাজ শেষে একশতবার সূরা এখলাস পাঠ করবে।

উক্ত কিতাবে আরও আছে, আশুরার রাত্রে যে ব্যক্তি একশত রাকয়াত নফল নামাজ আদায় করে এবং প্রত্যেক রাকয়াতে সূরা ফাতেহার সাথে তিনবার করে সূরা এখলাস ও নামাযান্তে ৭০ বার কালেমায়ে তামজীদ পাঠ করে তার যাবতীয় গোনাহ আল্লাহ তায়ালা মোচন করে দেন।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মহররম মাসের আশুরার দিনে রোযা রাখে আল্লাহ তাকে দশ হাজার ফেরেশতার পুণ্য দান করবেন।

অন্য হাদীসে এসেছে- যে ব্যক্তি আশুরার তারিখে রোযা রাখে আল্লাহ তার আমলনামায় ষাট বছরের রোযা এবং রাত জেগে এবাদত করার সওয়াব লিখে দিবেন। অপর এক হাদীসে এসেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মহররম মাসের দশ তারিখে আশুরার দিনে একটি রোযা রাখবে, আল্লাহ তাকে দশ হাজার শহীদ ও এবং দশ হাজার হাজীর সওয়াব দান করেবেন। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, হযরত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, রমজানের ফরজ রোযার পর উৎকৃষ্ট রোযা মুহাররম মাসের রোযা।

রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার দিন রোযা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামদেরকেও রোযা রাখতে বলতেন। আশুরার রোযা মহররম মাসের ৯ ও ১০ তারিখে রাখতে হয়। আশুরার দিনে শরীয়ত সমর্থিত যে কোনো নেক আমল করা যায়। তবে হায় হোসাইন! হায় হোসাইন! বলে শরীরে খুর দ্বারা আঘাত, ঢোলসহ বাদ্যযন্ত্র, তাজিয়া এগুলো শরীয়ত সমর্থিত নয়। বরং আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাতবরণ কোনো হলো এসব নিয়ে ওয়াজ আলোচনা হওয়া বাঞ্চনীয়। অন্যায়-অবিচার, জুলুম, নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে ইমাম হোসাইন শাহাদাতবরণ করেন। ইমাম হোসাইন খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। অথচ একদল নামধারী মুসলমান নবীজী (সাঃ)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রাঃ) কে শহীদ করে দেয়।

তারা কেমন মানুষ বা মুসলমান যে, রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় নাতীকে শহীদ করে দিলো? এরাই হচ্ছে ইসলামের নাম নিয়ে মুনাফিক গোষ্ঠী। সেই ইয়াজিদের প্রেতাত্মা আজো আছে, কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এখন আমাদের উচিত কারবালার শিক্ষায় আমাদের জীবন গঠন করা। ইয়াওমে আশুরা উপলক্ষে মিলাদ, দোয়া ও কারবালার ঘটনার সঠিক কারণ তুলে ধরে আলোচনা করা। যাতে এর দ্বারা মুসলমানগণ ঈমানী শক্তি সঞ্চার করতে পারে। ইমাম হোসাইন (রাঃ) এটাই আমাদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়তে হবে যদিও নিজের জীবন যায়। ইমাম বাহিনী নিজেদের জীবন দ্বীনের জন্যে উৎসর্গ করে দিয়ে এটাই প্রমাণ করেছেন। হক আর বাতিল কখনও এক হতে পারে না।

 

 

 

 

 

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১১:০৮:১৭