মাহে রমজানে ওমরার ফজিলত
মওলানা মুহাম্মাদ ইসমাঈল খান ইসলাম
অ+ অ-প্রিন্ট
রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাতের সওদা নিয়ে পবিত্র রমজানুল  মোবারক সমাগত। এই মাসের প্রধান আমল সিয়াম সাধনা। এ মাসের অতুলনীয় ফজিলতের কারণে নেয়ামত আবশ্যকীয় আমলগুলো এই মাসে অধিক গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়। পাশাপাশি আল্লাহর নেক বান্দারা এই মাসে অধিক মনোযোগের সঙ্গে নফল ইবাদতগুলো পালন করে থাকেন। কেননা অন্যান্য মাসে ইবাদত ও কোনো সৎকর্ম পালন করলে যে সওয়াব হয়, রমজান মাসে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নফল হিসেবে সারা বছর পালন করার মতো একটি অন্যতম আমল হচ্ছে ওমরা পালন। 

ওমরা শব্দের আভিধানিক অর্থ ভ্রমণ করা। শরিয়তের বিধানমতে, ওমরার নিয়ম হলোÑ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সুন্নত বা নফল ওমরা পালনের নিয়ত করে হজের মতো ‘মিকাত’ তথা ইহরাম বাঁধার নির্ধারিত জায়গা থেকে বা তার আগেই ইহরামের নিয়ত করতে হয়। অতঃপর বাইতুল্লাহ শরিফে এসে সাত চক্কর তাওয়াফ করে সাফা মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের সাঈ করতে হয়। সর্বশেষ হলক (মাথা মু-ানো) কিংবা কসরের (চুল ছোট করা) মাধ্যমে ইহরাম খুলতে হয়। 

ওমরা পালনের ফজিলত আমরা অনেকগুলো হাদিস থেকে জানতে পারি। যেমনÑ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরা আদায় করো। কেননা হজ ও ওমরা দারিদ্র্য এবং গোনাহ দূর করে দেয় ঠিক সেভাবে, যেভাবে হাপরের আগুন লোহা, স্বর্ণ ও রুপা থেকে ময়লা দূর করে দেয়।’ (তিরমিজি, হজ অধ্যায় : ৮১০)।

অপর এক হাদিসে ওমরা পালনের ফজিলত এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছেÑ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘একটি ওমরা পরবর্তী ওমরা পর্যন্ত মাঝখানের গোনাহগুলোর জন্য কাফফারাস্বরূপ।’ (বোখারি : ১৭৭৩; মুসলিম : ৩১৮০)।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীয়ে আকরাম (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদকারী, হজ পালনকারী এবং ওমরা পালনকারীÑ তারা সবাই আল্লাহর প্রতিনিধি। আল্লাহ তাদের ডাক দিয়েছেন, তারা সেই ডাকে সাড়া দিয়েছে। সুতরাং তারা আল্লাহর কাছে যা কিছু প্রার্থনা করবে, আল্লাহ অবশ্যই তাদের তা প্রদান করবেন।’ (ইবনে মাজাহ : ২৮৯৩)।

ওমরা পালন করা যে কত তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদত, হাদিসগুলোর মাধ্যমে আমরা তা জানতে পারলাম। আর এই আমল যদি রমজান মাসে পালন করা হয়, নিঃসন্দেহে তার সওয়াব সত্তর থেকে সাতশ গুণ বা বহুগুণ বৃদ্ধি হয়ে অফুরন্ত সওয়াবের কারণ হয়ে যাবে। উপরন্তু একাধিক হাদিসে রমজান মাসে ওমরা পালন করার জন্য আলাদা ফজিলতের বর্ণনাও এসেছে। রমজান মাসে ওমরা পালনকে নবীয়ে আকরাম (সা.) হজের সমান সওয়াব বলে উল্লেখ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, যখন নবী করিম (সা.) হজ থেকে ফিরে এলেন, উম্মে সিনান নামের আনসারি মহিলা সাহাবিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীসে তোমাকে হজ পালনে বাধা প্রদান করেছিল?’ তিনি জবাবে বললেন, ‘অমুকের বাবা (নিজ স্বামী)। তার পানি টানার দুটি উট আছে, একটিতে সওয়ার হয়ে তিনি হজ আদায় করতে গেছেন, আর অপরটি আমাদের জমিতে পানি সিঞ্চনের কাজে আটক আছে।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘তবে মনে রেখো! রমজান মাসে ওমরা আদায় করলে আমার সঙ্গে হজ আদায় করার সমান মর্যাদা পেতে পার।’ শব্দের কিছুটা ভিন্নতায় অপর বর্ণনায় এসেছে, নবীজি (সা.) সেই মহিলা সাহাবিকে বলেছিলেন, ‘রমজান মাস এলে তুমি ওমরা করে নিও। কেননা রমজান মাসে ওমরা করা হজের সমান মর্যাদা রাখে।’ (বোখারি : ১৮৬৩; মুসলিম : ২৯২৮)। 

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘রমজান মাসের ওমরা পালন হজের সমান মরতবাপূর্ণ।’ (ইবনে মাজাহ, হজ অধ্যায় : ২৯৯১)। হাদিসটি হজরত যাবের (রা.) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং হজরত আবু মা’কিল (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে। 

রমজান মাস এমনিতেই ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে কাটানোর সবচেয়ে উপযুক্ত মাস। আর এই মাসে যদি ওমরা পালনের উদ্দেশে পবিত্র ভূমি মক্কা ও মদিনা গমনের তওফিক লাভ হয়েই যায়, তবে এই মোবারক সফরের মাধ্যমে ওমরা পালনের সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ বেশ কিছু আমল করা হয়ে যাবে। সে সময় আল্লাহর পবিত্র ঘর স্বচক্ষে অবলোকন করার সুযোগ হবে, যা একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। আবার এই সফরে মসজিদে হারাম এবং মসজিদে নববিতে নামাজ আদায়ের সুযোগ হয়ে যাবে, যে মসজিদদ্বয়ে নামাজ আদায়ের বিশেষ ফজিলতের বর্ণনা হাদিসের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। হজরত জাবির (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘মসজিদুল হারাম ছাড়া অন্য যে-কোনো মসজিদে নামাজ আদায় অপেক্ষা আমার এই মসজিদে (তথা মসজিদে নববিতে) নামাজ আদায় হাজার গুণ ফজিলতপূর্ণ। আর অন্য যে-কোনো মসজিদে নামাজ আদায়ের চেয়ে মসজিদে হারামে নামাজ আদায় করা এক লাখ গুণ ফজিলতপূর্ণ।’ (ইবনে মাজাহ : ১৪০৬)। অতএব যাদের সামর্থ্য ও সুযোগ আছে, আপনারা এখনই পবিত্র ওমরা পালনের নিয়ত করুন এবং এ রমজানেই পবিত্র কাবা ও নবীজি (সা.) এর রওজা মোবারক জিয়ারত করে আসুন। 

লেখক : ইমাম ও খতিব, বাইতুল ফালাহ জামে মসজিদ, পল্লবী, ঢাকা

 

১১ মে, ২০১৮ ০৪:৫১:৫৭