শবে বরাতের গুরুত্ব ও ফজিলত
হাফেজ মাওলানা আবু নাঈম
অ+ অ-প্রিন্ট
আজ দিবাগত রাতে শবে বরাত। ‘শব’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ শব্দটি আরবি বারআত থেকে গৃহীত; যার অর্থ বিমুক্তকরণ, সম্পর্ক ছিন্ন করা, নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া ইত্যাদি। আমাদের সমাজে শবে বরাত ভাগ্যরজনী হিসেবে পরিচিত। সাধারণ ধারণা, ভাগ্যরজনী হিসেবে এ রাতে বান্দার এক বছরের রিজিকসহ যাবতীয় বিষয়ে আল্লাহ কর্তৃক সিদ্ধান্ত হয়। মোটামুটি বলা যায়, বান্দার জন্য আল্লাহর এটি একটি বাজেট। আমাদের এ অঞ্চলে শবে বরাত সাড়ম্বরে পালিত হয় এবং দিনটি থাকে সরকারি ছুটির দিন। রেডিও-টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় এবং মসজিদে মসজিদে দোয়া অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। গ্রামীণ জীবনে শবে বরাতের প্রভাব আরো বেশি ছিল। ঘরে ঘরে হালুয়া-রুটি বিতরণ ও ভালো খানার ব্যবস্থা এবং বাড়ি বাড়ি মিলাদ অনুষ্ঠান ছিল সাধারণ বিষয়। এ ছাড়া ঘর-দোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও কাপড়-চোপড় ধোয়া তো ছিলই। সময়ের প্রেক্ষিতে কুরআন-হাদিস চর্চার কারণে এর আবেদন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে এবং দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে এখন আর মানুষ কোনো কিছু চোখ বন্ধ করে মেনে নেয় না। ইবাদতের নামে যেকোনো আচার-আচরণের পেছনে তারা দলিল তালাশ করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে ইবাদত তখনই ইবাদত বলে বিবেচিত হয়, যখন তার সমর্থনে কুরআন ও হাদিসের প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআন ও হাদিসে সমর্থন না থাকলে তা নতুন উদ্ভাবন বা বিদয়াত হিসেবে পরিগণিত হয়। আর বিদয়াত সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট- ‘সব বিদয়াতই গোমরাহি এবং তা জাহান্নামে যাওয়ার যোগ্য’। ইসলামে ইবাদত গুলোকে ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। ফরজ-ওয়াজিব স্পষ্ট এবং উম্মাহর মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো মত পার্থক্য নেই। ফরজ-ওয়াজিব পালন করতে প্রতিটি মুসলিম নর-নারী বাধ্য এবং এর অন্যথা কবিরা গুনাহ। মূলত আখিরাতে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হতে হবে ফরজ-ওয়াজিব সম্পর্কে। প্রথমেই বলা যায়, শবে বরাতের আমল ফরজ-ওয়াজিব পর্যায়ের কোনো ইবাদত নয়; তাই এত ঘটা করে পালন করা ও সরকারি ছুটি থাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। পবিত্র কুরআনে শবে বরাতের কোনো উল্লেখ নেই। সূরা দুখানের একটি আয়াতের অর্থ ‘নিশ্চয়ই আমি এটি (আল কুরআন) এক বরকত ও কল্যাণময় রাতে নাজিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি তো (জাহান্নাম থেকে) সতর্ককারী। এই রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়’। কেউ কেউ বরকতময় রাত বলতে শবে বরাতকে ( নিসফে শাবান অর্থ মধ্য শাবান) বুঝিয়েছেন। কুরআন থেকে কুরআনের ব্যাখ্যা হলো সর্বোত্তম ব্যাখ্যা। সূরা কদরে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, তিনি কুরআনকে কদরের রাত্রে নাজিল করেছেন। আর কদরের রাত যে রমজান মাসে তাও বোঝা যায় সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে উল্লিখিত রমজান মাসে কুরআন নাজিলের কথা উল্লেখ করায়। শবে বরাতে নয়, কুরআন রমজান মাসে কদরের রাতে নাজিল হওয়া বিষয়ে উম্মাহর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। শবে বরাতে বিষয়টি আমরা হাদিসে তালাশ করতে পারি। সিহাহ সিত্তাহ হাদিসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- বুখারি ও মুসলিম এবং এ হাদিস দু’টিতে শবে বরাতের কোনো উল্লেখ নেই। ইবনে মাজায় আলী রা:-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেছেন : ‘১৪ শাবানের রাতে তোমরা বেশি বেশি করে ইবাদত করো এবং দিনের বেলায় রোজা রাখো। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা সূর্যাস্তের সাথে সাথে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন : কে আছো আমার কাছে গুনাহ মাফ চাইতে? আমি তাকে মাফ করতে প্রস্তুত। কে আছো রিজিক চাইতে? আমি তাকে রিজিক দিতে প্রস্তুত। কে আছো বিপদগ্রস্ত আমি তাকে বিপদমুক্ত করতে প্রস্তুত। কে আছ…’ এভাবে (বিভিন্ন প্রয়োজনের নাম নিয়ে) ডাকা হতে থাকে সুবহি সাদিক পর্যন্ত । রমজানের প্রস্তুতি স্বরূপ রজব ও শাবান মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় রাসূল (সা:) একটু বেশি ইবাদত-বন্দেগি করতেন। আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত- ‘অন্য যেকোনো মাসের তুলনায় শাবান মাসে রাসূলুল্লাহ (সা:) বেশি বেশি রোজা রাখতেন’। শবে বরাতের রোজা না বলে আইয়ামে বিজের তিনটি রোজা ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ যে-কেউ রোজা রাখতে পারেন। আশা করা যায়, অন্যান্য মাসের তুলনায় শাবান মাসে একটু বাড়তি সওয়াব পাওয়া যাবে। কোনোরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই নিজ গৃহে নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া-দরুদ পাঠ করে আল্লাহর কাছে চাওয়া যেতে পারে। শেষ রাতে (তাহাজ্জুদ নামাজ) উঠে নামাজের মধ্যে বিশেষ করে সেজদায় নিজের সব প্রয়োজন আল্লাহর কাছে পেশ করা যায়। এটা শুধু শবে বরাতেই নয়, প্রতিটি রাতেই আল্লাহর কাছে ধর্ণা দেয়া যায় এবং প্রতিটি রাতই ফজিলতপূর্ণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, নফল ইবাদত-বন্দেগির সওয়াব তাদেরই জন্য যারা ফরজ-ওয়াজিবগুলো নিষ্ঠার সাথে পালন করে। আমাদেরকে বুঝতে হবে, কম গুরুত্বপূর্ণ বলেই মত পার্থক্য। ফলে এসব বিষয়ে যেকোনো একটি মত গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাড়াবাড়ি করা, অপরের প্রতিবিদ্বেষ পোষণ ও হেয় করা এবং দলাদলি করাটাই হলো গুনাহের কাজ। তাই এসব ব্যাপারে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। আবার এমন অনেকে আছেন, এসব নিয়ে আলোচনা করাটাও পছন্দ করেন না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলোÑ এক দিনের জন্য হলেও তো কিছু লোক মসজিদে একত্র হয়, আলোচনা শুনে ও ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করে তাতে মন্দ কী? সারা বছর ফরজ-ওয়াজিব পালন না করে দ্বীনকে একটি বিশেষ দিবসের ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে নেয়াটাই হলো ক্রটি। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় সর্বক্ষণ আল্লাহর হুকুম পালনের নামই ইবাদত। সে একটি মুহূর্তও আল্লাহর ইবাদতের (গোলামির) বাইরে থাকতে পারে না। তাই বছরের বিশেষ একটি দিনে নয়, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং রাসূল সা: নির্দেশিত ইবাদত-বন্দেগিই পারে মানুষকে পরিশুদ্ধ করতে। আল্লাহপাক শবে-বরাতের খায়ের এবং বরকত আমাদের উপর নসিব করুন- আমিন।

 

২৯ এপ্রিল, ২০১৮ ১১:৪৭:৪০