কুরআন পাঠের গুরুত্ব ও প্রতিদান
এ.কে.এম. মহিউদ্দীন
অ+ অ-প্রিন্ট
কুরআনের আয়নায় নিজেকে প্রতিবিম্বিত করার মধ্যে কী যে বরকত তা আমরা ভালোভাবেই জানি। তবু আমরা পিছিয়ে পড়ছি এটি পাঠ বা তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে। ইতিহাস এটা স্বীকৃতি দেয় যে, মাত্র ২৩ বছরে গোটা আরব জাহানের বর্বর একটা জাতিকে কী দ্রুত সভ্যতার আলোয় বদলে দেওয়া হয়েছিল। আর এটা সম্ভব হয়েছিল আল-কুরআনের বদৌলতে। আসুন সেই কুরআনের কিছু ফজিলত হিসাব মিলিয়ে নিই—

কুরআন আল্লাহ্‌র বাণী। সৃষ্টিকূলের ওপর যেমন স্রষ্টার সম্মান ও মর্যাদা অপরিসীম, তেমনি সকল বাণীর ওপর কুরআনের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অতুলনীয়। মানুষের মুখ থেকে যা উচ্চারিত হয়, তার মধ্যে কুরআন পাঠ সর্বাধিক উত্তম। এখানে পয়েন্ট আকারে কিছু ফজিলত বর্ণিত হচ্ছে—

কুরআন পাঠের প্রতিদান : রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের একটি অক্ষর পড়বে, সে একটি নেকী পাবে। আর একটি নেকী দশটি নেকীর সমপরিমাণ। (তিরমিজি)

কুরআন শিক্ষা করা, মুখস্থ করা ও তাতে দক্ষতা লাভ করার ফজিলত : নবী করীম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করবে এবং তা মুখস্থ করবে এবং (বিধি-বিধানের) প্রতি যত্নবান হবে, সে উচ্চ-সম্মানিত ফেরেশতাদের সাথে অবস্থান করবে। আর যে ব্যক্তি কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কুরআন পাঠ করবে এবং তার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবে সে দ্বিগুণ ছওয়াবের অধিকারী হবে। (বুখারী, মুসলিম)

অন্যত্র তিনি আরও বলেন, কিয়ামত দিবসে কুরআন অধ্যয়কারীকে বলা হবে, কুরআন পড় এবং উপরে উঠো। যেভাবে দুনিয়াতে তারতীলের সাথে কুরআন পড়তে সেভাবে পড়। যেখানে তোমার আয়াত পাঠ করা শেষ হবে, জান্নাতের সেই সুউচ্চ স্থানে হবে তোমার বাসস্থান। (তিরমিজি)

ইমাম খাত্তাবী (রহ.) বলেন হাদীসে এসেছে যে, জান্নাতের সিঁড়ির সংখ্যা হচ্ছে কুআনের আয়াতের সংখ্যা পরিমাণ। কুরআনের পাঠককে বলা হবে, তুমি যতটুকু কুরআন পড়েছ ততটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠ। যে ব্যক্তি সম্পূর্ণ কুরআন পড়েছে, সে আখেরাতে জান্নাতের সবশেষ সিঁড়ির ধাপে উঠে যাবে। যে ব্যক্তি কুরআনের কিছু অংশ পড়েছে সে ততটুকু উপরে উঠবে। অর্থাৎ যেখানে তার পড়া শেষ হবে সেখানে তার সওয়ারের শেষ সীমানা হবে।

যার সন্তানে আল-কুরআন শিক্ষা করবে তার প্রতিদান : নবী করীম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করবে, শিক্ষা করবে ও তদানুযায়ী আমল করবে; তার পিতা-মাতাকে দু’টি পোশাক পরিধান করান হবে, যা দুনিয়ার সকল বস্তুর চেয়ে অধিক মূল্যবান। তারা বলবে, কোন্‌ আমলের কারণে আমাদেরকে এত মূল্যবান পোশাক পরানো হয়েছে? বলা হবে, তোমাদের সন্তানের কুরআন গ্রহণ করার কারণে। (হাকেম)

পরকালে কুরআন সুপারিশ করবে : রাসূল (সা.) বলেন, তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা কিয়ামত দিবসে কুরআন তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হবে। (মুসলিম)

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) বলেন, কিয়ামতের দিন সিয়াম ও কুরআন বান্দার জন্য আল্লাহ্‌র কাছে সুপারিশ করবে। (আহমাদ, হাকেম)

কুরআন তিলাওয়াত, অধ্যয়ন এবং কুরআন নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার জন্য একত্রিত হওয়ার ফজিলত : রাসূল (সা.) বলেন, কোনো সম্পদ্রায় যদি আল্লাহ্‌র কোনো ঘরে একত্রিত হয়ে কুরআন পাঠ করে এবং তা পরস্পরে শিক্ষা লাভ করে, তবে তাদের ওপর প্রশান্তি নাজিল হয়, আল্লাহ্‌র রহমত তাদেরকে আচ্ছাদিত করে এবং ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে। আল্লাহ্‌ তাঁর নিকটস্থ ফেরেশতাদের সামনে তাদের কথা আলোচনা করেন। (মুসলিম)

কুরআন পাঠের আদব : ইমাম ইবনে কাসীর (র.) কুরআন পাঠের কিছু আদব উল্লেখ করেছেন, আর তা হচ্ছে—

ক) পবিত্রতা অর্জন না করে কুরআন স্পর্শ করবে না বা তিলাওয়াত করা যাবে না।

খ) কুরআন পাঠের আগে মেসওয়াক করে নিবে।

গ) সুন্দর পোশাক পরিধান করবে।

ঘ) কিবলামুখী হয়ে বসবে।

ঙ) হাই উঠলে কুরআন পড়া বন্ধ করে দিবে।

চ) বিনা প্রয়োজনে কুরআন পড়া অবস্থায় কারো সাথে কথা বলবে না।

ছ) মনোযোগ সহকারে কুরআন পাঠ করবে।

জ) সওয়াবের আয়াত পাঠ করলে থামবে এবং উক্ত সওয়াব আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করবে। আর শাস্তির আয়াত পাঠ করলে তা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করবে।

ঝ) (পঠন ব্যতিত) কুরআনকে খুলে রাখবে না বা তার ওপরে কোনো কিছু চাপিয়ে রাখবে না।

ঞ) অন্যের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় এমন উচ্চ আওয়াজে কুরআন পড়বে না।

ট) বাজারে বা এমন স্থানে কুরআন পড়বে না যেখানে মানুষ আজেবাজে কথা-কাজে লিপ্ত।

কীভাবে কুরআন পাঠ করবে : আনাস ইবন মালিক (রা.)-কে রাসূলের (সা.) কুরআন পাঠের পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, তিনি টেনে টেনে পড়তেন। ''বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম'' পাঠ করার সময় ''বিসমিল্লাহ্'' টেনে পড়তেন, একইভাবে ''আররাহমান'' টেনে পড়তেন, ''আররাহীম'' টেনে পড়তেন। (বুখারী)

কীভাবে কুরআন পাঠে সওয়াব বৃদ্ধি হয় : যে ব্যক্তিই আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে একনিষ্ঠভাবে কুরআন পাঠ করবে সেই তার সওয়াবের অধিকারী হবে। কিন্তু এই সওয়াব বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে যখন হৃদয়-মন উপস্থিত রেখে আয়াতগুলোর অর্থ বুঝে গবেষণার দৃষ্টি নিয়ে তা পাঠ করবে। তখন একেকটি অক্ষরের বিনিময়ে দশ থেকে সত্তরগুণ; কখনও সাতশত গুণ পর্যন্ত সওয়াব বৃদ্ধি করা হবে।

দিন-রাতে কতটুকু কুরআন পাঠ করবে : রাসূলের (সা.) সাহাবীগণ সাধারণত প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাঁদের কেউ সাতদিনের কম সময়ে সাধারণত কুরআন খতম করতেন না। বরং তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করার ব্যাপারে হাদীসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

অতএব সম্মানিত পাঠকের কাছে নিবেদন, আসুন আমরা আমাদের দিনের একটি অংশ কুরআন পাঠের জন্য নির্ধারণ করি। যত ব্যস্তই থাকি না কেন ওই অংশটুকু পড়ে নিতে সচেষ্ট হই। যুক্তি হচ্ছে— যে কাজ সব-সময় করা হয় তা অল্প হলেও বিচ্ছিন্নভাবে বেশি কাজ করার চেয়ে উত্তম। অবহেলা বা গাফিলতির কারণে যদি কুরআন পড়া না হয় তাহলে পরবর্তী দিন যেন আবারও পড়ার জন্য সচেষ্ট হই যেন সকলে। রাসূলের (সা.) ভাষ্য হচ্ছে— ‘কোনো মানুষ যদি কুরআনের নির্দিষ্ট অংশ না পড়েই ঘুমিয়ে পড়ে তবে ফজর ও জোহর নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে যেন তা পড়ে নেয়। তাহলে তার আমলনামায় তা রাতে পড়ার মতো সওয়াব লিখে দেওয়া হবে।’ (মুসলিম)

 

 

০১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০৯:৫২:০১