মহানবী সা. এর বিরুদ্ধে যাদুগ্রস্থ হবার অপবাদ খণ্ডন
সালেহ আহমেদ
অ+ অ-প্রিন্ট
ইসলামের শত্রুরা মহা নবী সা. এর বিরুদ্ধে আপত্তি করার কোন সূযোগ হাতছাড়া করে নি এবং আজও ইসলামের শত্রুরা কোন সূযোগ পেলে আপত্তি করতে দ্বিধা করে না। এর চাইতে হৃদয় বিদারক হলো, এসব মিথ্যা রটনা,আপত্তি ও অপবাদ সমূহ পূঁজি করে,  না জেনে না বুঝে, কিছু নামধারী ধর্মীয় বোদ্ধা  এসব ঘটনা ও আপত্তি সত্য বলে চালিয়ে মুখরোচক কিস্সা কাহিনী বানিয়ে নিয়েছে যাকে আমরা অনেকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছি। এর মধ্যে অন্যতম হলো নাউযুবিল্লাহ মহা নবী সা. এর ওপর নাকি যাদু করা হয়েছিলো।

বুখারী শরীফ ও ইবনে সাআদ এ হাদীসের কতিপয় বর্ণনায় এ বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে, যার সারমর্ম হলো হুদায়বীয়া সন্ধির পর লাবীদ বিন আ’সাম নামাক এক ইহুদী মহানবী সা. এর ওপর ‘সাহর’ অর্থাৎ যাদু করেছিলো। আর সে নাকি মহা নবী সা. এর মাথার চুল নিয়ে একটি চিরুনিতে বান মেরে একটি কূপে ফেলে রেখেছিলো। বলা হয় এ যাদুর প্রভাবে তিনি সা. নিরুৎসাহিত, মনমরা ও উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন। তিনি অনেক কিছু ভুলে যেতেন। অনেক সময় মনে করতেন আমি এ কাজটি করেছি কিন্তু আসলে তিনি সা. তা করেন নি। পালায় নির্ধারিত স্ত্রীর ঘরে যাবার পরিবর্তে অন্য স্ত্রীর ঘরে চলে যেতেন। এক পায়ের জুতা অন্য পায়ে পরতেন। পোশাক পরিধানের সময়ও ভুল করতেন। তিনি সা. ঘাবরে যেতেন এবং অনেক বেশী দোয়া করতেন। পরবর্তিতে আল্লাহ তা’লা সূরা ফালাক ও সূরা নাস অবতির্ন করেন এবং এর দ¦ারা তাঁকে যাদুমুক্ত করেন। ইত্যাদি ইত্যাদি। এ হলো এ সম্পর্কে বর্ণিত রেওয়াআতের সারমর্ম। 

এ সব রেওয়াআতকে ভিত্তি করে যে সব কিসসা কাহীনি বানানো হয়েছে তাতে করে আমাদের দৃষ্টি মূল বিষয় থেকে সরে গেছে এবং সাধারন এর জন্য সত্য উদঘাটন করা কিছুটা কঠিন হয়ে গেছে। উক্ত ঘটনাকে সত্যি বলে মেনে নিলে এ কথা মানতে হবে,নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ ! মহা নবী সা. দূর্বল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন এবং এক অভিশপ্ত ইহুদী নিজ যাদু বলে তাঁকে সা. দিয়ে যা ইচ্ছা তা করাতে পেরেছে। নাউযুবিল্লাহ! সেই অভিশপ্ত ইহুদী নিজ যাদু বলে মহানবী সা. এর মন মস্তিষ্ক নিজ নিয়ন্ত্রনাধীন নিয়ে যা ইচ্ছা তা করাতে পেরেছে এবং মহা নবী সা. এর মত পাহাড়ের চাইতে বহুগুণ বেশী মনোবল শক্তির অধিকারী ব্যক্তি তার সামনে নিরুপায় ছিলেন ? পবিত্র কুরআনে মহানবী সা. এর অসাধারণ মনোবল ও শক্তিশালী হবার কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন

لَوْ أَنزَلْنَا هَٰذَا الْقُرْآنَ عَلَىٰ جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ ۚ وَتِلْكَالْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ٘ 

অর্থাৎ আমরা যদি এই কুরআনকে কোন পাহাড়ের ওপর অবতির্ন করতাম তা হলে তুমি নিশ্চয় একে আল্লাহর ভয়ে বিনীত, বিদীর্ণ হতে দেখতে। আর এসব উপমা যা আমরা মানব জাতির জন্য বর্ণনা করছি যেন তারা চিনতা করতে পারে।(সূরা হাশর ২২)। একজন মুসলমান যে মহানবী সা. কে ভালোবাসে সে কখনো এই অলীক চিন্তা করতেই পারেনা।

শয়তানী শক্তি দ্বারা মহানবী সা. কে প্রভাবিত করা গেছে তা নিশ্চিত ভাবে প্রত্যাখ্যান যোগ্য। তিনি হলেন সমস্ত শয়তানী শক্তির ওপর বিজয়লাভকারী শ্রেষ্ঠ রসূল। তিনি হলেন শয়তানী শক্তি সমুহকে সমূলে উৎপাটনকারী মহান সেনা নায়ক। তিনি সা. কি ভাবে এক অভিশপ্ত ইহুদীর যাদুবিদ্যার কাছে পরাস্ত হতে পারেন? মহানবী সা. এর প্রেমিক হয়ে এ কথা ভাবতে অবাক লাগে। তাঁর ওপর যাদু করা হয়েছিলো এবং তিনি যাদুগ্রস্থ হয়েছিলেন এমনটি বলা পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। এমনটি শুধু দাবী নয় বরং মহানবী সা. নিজেই এ বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি সা. বলেন

قال مع کل ٲنسان شیطان قالت عائشة و معک یا رسول اللہ ؟ قال نعم و لکن ربّی ٲعاننی علیہ حتّی ٲسلم ﴿صحیح مسلم﴾

অর্থাৎ মহানবী সা. বললেন প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে শয়তান আছে। হযরত আয়েশা রা. বললেন হে আল্লাহর রসূল আপনার সাথেও কি ? তিনি সা. বললেন হ্যাঁ! তবে আল্লাহ তা’লা আমাকে শয়তানের ওপর বিজয় দান করেছেন। তাই এত সুস্পষ্ট দলীল থাকা সতে¦ও এ বলা তাঁর সা. এর ওপর যাদু হয়েছিল বা তিনি সা. যাদুগ্রস্থ হয়েছিলেন এক অলীক ধারনা ছাড়া আর কিছু নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’লা বলেন,کتب اللہ لٲغلبنّ ٲنا و رسلی    অর্থাৎ আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ,আমি এবং আমার রসূলগণই বিজয়ী হবো। (সূরা মুজাদেলা ২২)। কেউ চালাকী করে বা ধোকাবাজী করে বা যাদু বিদ্যা দ্বারা আল্লাহর নবীকে পরাভুত করবে উপরোক্ত আয়াত তা খন্ডন করে। সন্মোহন শক্তি দ্বারাও আল্লাহর নবীকে প্রভাবিত করা যায় না । যেমন হযরত মূসা আ. সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

فٲذا حبالھم و عصیھم یخیل ٲلیہ من سحرھم ٲنھا تسعی ﴿ طہ ٦۷﴾

অর্থাৎ তাদের যাদু ক্রিয়ার ফলে সহসা তাদেও দড়ি ও লাঠিগুলি মূসার নিকট এরূপ মনে হলো যেন ঐগুলি দৌড়াদৌড়ি করছে। (সূরা তাহা ৬৭)

ٲنما صنعوا کید ساحر و لا یفلح الساحر حیث ٲتی ﴿طہ ۷۰﴾ 

অর্থাৎ তারা যে কলাকৌশল করেছে তা কেবল যাদুকরের ধোকাবাজি। এবং যাদুকর যেখান থেকেই আসুক না কেন সফলতা লাভ করতে পারে না।(সূরা তাহা ৭০)। যাদুকরদের ধোকাবাজির বিরুদ্ধে আল্লাহর নির্দেশে মূসা আ. যখন তার লাঠি নিক্ষেপ করলেন তখন তারা যে কলা কৌশল করেছিলো তাৎক্ষনিক ভাবে তা নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেল। যাদুকররা পরাজিত হয়ে সিজদাবনত হয়ে গেলো। সূরা তাহার ৭০ নং আয়াতে আল্লাহ তা’লা বলছেন “ যাদুকর যেখান থেকেই আসুক না কেন সফলতা লাভ করতে পারবে না।”  আয়াতের এ অঙ্গিকার সব নবীদের জন্য প্রযোজ্য। তবে মহানবী সা. যিনি শ্রেষ্ঠ রসূল তিনি কি এ আয়াতের অর্ন্তভুক্ত নন? অবশ্যই ! তিনিই এ আয়াতের সর্বাপেক্ষা সন্বোধিত সত্ত্বা। তাহলে চিন্তা করে অবাক হতে হয় মহা নবী সা. এর ওপর কি ভাবে যাদু করা সম্ভব! এ আয়াত ঘোষনা দিচ্ছে মহানবী সা. এর ওপর সন্মোহন শক্তির প্রয়োগ বা যাদু করা সম্ভব ছিলনা।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’লা বলেন,

  نَّحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَسْتَمِعُونَ بِهِ إِذْ يَسْتَمِعُونَ إِلَيْكَ وَإِذْ هُمْ نَجْوَىٰ إِذْ يَقُولُ الظَّالِمُونَ إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا رَجُلًا مَّسْحُورًا     ٘انظُرْ كَيْفَ ضَرَبُوا لَكَ الْأَمْثَالَ فَضَلُّوا فَلَا يَسْتَطِيعُونَ سَبِيلًا     ٘

অর্থাৎ তারা যে উদ্দেশ্যে কান পেতে তোমার কথা শুনে, আমরা সে সম্পর্কে সম্পুর্ণরূপে অবগত আছি। আর তারা যখন নির্জনে পরস্পর সলা-পরামর্শ করে এবং সে সব যালেমরা বলে তোমরা কেবল একজন যাদুগ্রস্থ ব্যক্তির অনুসরণ করছো (আমরা সে সম্পর্কেও সম্পুর্ণরূপে অবগত আছি)।দেখ! তারা তোমার সম্বন্ধে কিরূপ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করে,যার ফলে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং তারা কোন পথ (খুঁজে) পায় না। (বনী ইসরাঈল ৪৮-৪৯)। এ আয়াতে আল্লাহ বলছেন, মহানবী সা. যাদুগ্রস্থ হয়েছেন এ কথা শুধু মাত্র কাফেররা বলে থাকে। যারা বলে মহানবী সা. এর ওপর যাদু করা হয়েছিলো তারা কি ভেবে দেখবেন এ আয়াত তাদের কোন দলের অর্ন্তভুক্ত করছে? এ আয়াত স্পষ্ট ভাবে বলে দিচ্ছে মহানবী সা. এর ওপর যাদু করা সম্ভব নয় এবং তাঁর সা. এর ওপর কোন যাদু করা হয় নি। আসলে মহানবী সা. এর ওপর যাদু করা হয়ে থাকলে নাউযুবিল্লাহ পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াত বাতিল করতে হবে এবং নাউযুবিল্লাহ! এও বলতে হবে আল্লাহ তা’লা মহানবী সা. এর ক্ষেত্রে তাঁর অঙ্গিকার পূর্ণ করেন নি। যেমন উপরোক্ত আয়াত তো আছেই এ ছাড়া,  وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ অর্থাৎ এবং আল্লাহ তোমাকে মানুষের কবল থেকে রক্ষা করবেন। (সূরা মায়েদা ৬৮)وما کان لہ علیھم من سلطان  অর্থাৎ তাদের (মুমিনদের) ওপর তার (শয়তানের) কোন আধিপত্য ও ক্ষমতা নেই। (সূরা সাবা ২২)। ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রশ্ন উঠে তাহলে প্রকৃত ঘটনা কি? সীরাতে নবুবী সা. এর দিকে গভীর ভাবে মনোনিবেশ করলে, হযরত আয়েশা রা. এর বর্ণনার প্রেক্ষাপট, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং কাফেরদের ও মুনাফেকদের কর্মতৎপরতা বিশ্লেষন করলে জানা যায়,এ ঘটনাটি হুদায়বিয়া সন্ধির পর পরই ঘটেছিলো । (তাবাকাতে ইবনে সাআদ)। উপরোক্ত ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে এ কথা স্পষ্ট ভাবে প্রতিয়মান হয়, মহানবী সা. কিছু দিনের জন্য ভুলে যাবার রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন যা কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ও শারিরীক দূর্বলতার কারণে হয়েছিলো। আর ঠিক সে সময়ে এক অভিশপ্ত ইহুদী ও মুনাফিকরা ষড়যন্ত্র করে এ কথা ছড়িয়ে দেয় যে নাউযুবিল্লাহ মহানবী সা. যাদুগ্রস্থ হয়েছেন এবং লাবিদ বিন আসিম এ যাদু করেছে। তবে আল্লাহ তা’লা তাঁকে সা. দ্রূ্রূত আরোগ্য দান করে শত্রুদের মুখে চুনকালি মেখে দিয়েছিলেন। প্রকৃত ঘটনাটি কি ছিল তা বলার পূর্বে হাদীসে ব্যাবহৃত ‘سحر’ শব্দটির অর্থ জেনে নেয়া প্রয়োজন। ‘سحر ’ (সাহর) আরবী শব্দ, এর অর্থ হলো অজানা কোন কিছুর কারণের প্রভাব প্রকাশিত হওয়া। অভিধানে আছে ‘السحر’ অর্থাৎ ما لطف مٲخذہ و دقّ যার উৎস অজানা বা পর্দার অন্তরালে কিন্তু এর প্রভাব প্রকাশিত। (আকরাবুল মাওয়ারেদ)। এটা হলো ‘সাহর’ এর মৌলিক অর্থ। অভিধানে এ শব্দের আরো অর্থ করা হয়েছে।এসব অর্থের ওপর ভিত্তি করে ‘সাহর’ যে সব অর্থ হতে পারে তা নি¤েœ দেয়া হলো। 

(ক) কোন মিথ্যা বিষয়কে চালাকী ও প্রতারনার সাথে সত্য বলে প্রকাশ করা। (খ) অন্যকে ধোকা দেয়ার উদ্দেশ্যে চালাকী ও হাতের  চাতুরী ও কৌশল অবলম্বন করা। অর্থৎ ঃৎরপশ (গ) কোন মিথ্যা উদ্দেশ্যে সফল হবার জন্য ফিতনা সৃষ্টি করে তা হতে সাহায্য নেয়া। (ঘ) রূপার ওপর সোনার পানি চড়ানো বা এমন রং চড়ানো যাতে করে মানুষ তা সোনা বলে মনে করে। (ঙ) বাগ্মিতা পুর্ণ  গদ্য , পদ্য ও বক্তৃতা যা পড়ে বা শুনে মানুষ মোহিত হয়ে যায়। (চ) সন্মোহন শক্তি দ্বারা অন্যকে সন্মোহিত করে দেয়া। অর্থাৎ সবংসবৎরংস  (ছ) যাদু, যা শয়তানী শক্তি দ¦ারা করা হয়। অর্থাৎ রিঃপয পৎধভঃ বা সধমরপ। উপরোক্ত অর্থগুলি অভিধান ও সাধারন ভাবে প্রচলিত ভাষা অনুযায়ী প্রমানিত। 

 এক রুইয়ার ভিত্তিতে মহানবী সা. সাহাবীদের সাথে নিয়ে উমরা করতে  মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু মক্কাবাসীদের বিরোধীতার  কারণে উমরা না করেই, হুদায়বিয়া নামক স্থানে মহানবী সা. কে কাফেরদের সাথে সন্ধি করে  ফিরে আসতে হয়। কাফের ও মুনাফেকদের দৃষ্টিতে এটি মুসলমানদের পরাজয় ছিলো। মুসলমানদের অনেকেই এমনটি হওয়ায় হতাশ এবং অপমান বোধ করছিলো। কাফের ও মুনাফিকরা মুষলমানদের সাথে এ নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রƒপ করতো। এমন কি হয়রত উমর রা. এর মত মহান সাহাবীও এ ঘটনায় বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। দূর্বল চিত্তের মুসলমানদের জন্য তিনি সা. চিন্তিত হয়ে পড়েন, কোথাও এ ঘটনা তাদের জন্য ফিতানার কারন না হয়ে দাড়ায়। এই ঘটনার আকস্মিকতা, কাফের ও মুনাফেকদের আচরণ এবং এর সাথে সাহাবাদের আচরণ মহানবী সা. কে বিচলিত করে তোলে। এ সময়ে তিনি সা. খুব বেশী বেশী দোয়া করছিলেন। বর্ণিত হয়েছে دعا و دعا অর্থাৎ তিনি সা. বেশী বেশী দোয়া করতেন। সফরের ক্লান্তি, সে সময়কার বিব্রতকর অবস্থার কারনে চিন্তিত হওয়ার সাথে তিনি সা. প্রচন্ড মাথা ব্যাথায় আক্রান্ত হন। মাথা ব্যাথার কারণে তিনি সা. কয়েকবার শিঙ্গা লাগান।  (দেখুন যাদুল মাআদ এবং ফাতহুল বারী ) । যার ফলে তিনি সা. শারিরীক ভাবে দূর্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং ¯œায়ু দূর্বল্যে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। সে সময়ে তিনি সা. কিছু দিনের জন্য ভুলে যাবার রোগে আক্রান্ত হন। রক্তে মাংসে গড়া মানুষের জন্য  এহেন পরিস্থিতিতে এমনটি হওয়া স্বাভাবিক। মুনাফেকরা যখন দেখলো মহানবী সা. অসুস্থ তখন তারা বলতে শুরু করলো নাউযুবিল্লাহ তাঁর সা. এর ওপর যাদু করা হয়েছে। তারা বলতে লাগলো যাদুর কারণে তিনি সা. ভুলে যাচ্ছেন। মানুষদের ধোকা দেবার জন্য তারা প্রাচীন পদ্ধতি অনুযায়ী একটি চিরুনিতে কিছু চুল গিট মেরে একটি পরিত্যাক্ত কূপে ফেলে দেয়। মহানবী সা. যখন যাদু করার বিষয়ে মুনাফিকদের কথা জানতে পারলেন তিনি সা. আল্লাহর কাছে এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবার জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ তা’লা তাঁর সা. এর দোয়া কবুল করলেন।

হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত “রসূলুল্লাহ সা. এর ওপর যাদু করা হয়। এমন অবস্থা হয় যে তাঁর মনে হতো তিনি বিবিগণের কাছে এসেছেন অথচ তিনি তাদের কাছে আসেন নি। সুফিয়ান বলেন( অর্থাৎ বর্ণনাকারী বলছেন হযরত আয়েশা রা. নয় ) এ অবস্থা হলো যাদুর চরম অবস্থা । বর্ণনাকারী বলেন একদিন রসূলুল্লাহ সা. ঘুম থেকে জেগে উঠেন এবং বলেন হে আয়েশা! শুনো আমি আল্লাহর কাছে যে বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম তিনি তা আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন (অর্থাৎ আমি যে দোয়া করছিলাম আল্লাহ তা কবুল করেছেন)। (স্বপ্নে দেখি) আমার নিকট দু’জন লোক এলো তাদের একজন আমার মাথার নিকট এবং অন্যজন আমার পায়ের নিকট বসলো। আমার কাছের লোকটি অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলো এ লোকটির কি হয়েছে ? দ্বিতীয় লোকটি বললো ‘مطبوب’ ( এ বাক্যটির অনুবাদ করা হয়ে থাকে, ‘একে যাদু করা হয়েছে’) তিনি অসুস্থ। প্রথমজন বললো ‘من طبّہ’ ( এ বাক্যটির অনুবাদ করা হয়ে থাকে কে যাদু করেছে?) তাঁর অসুস্থতার কারণ কি ?  আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে ما وجع الرجل  অর্থাৎ কি অসুখ হয়েছে। দ্বিতীয় জন বললো,যুরায়ক গোত্রের ইহুদী লাবীদ বিন আসাম। সে এক মুনাফেক। প্রথমজন বললো (বর্ণনায় বলা হয়েছে ‘ فیما ’ এ শব্দটির অনুবাদ করা হয়ে থাকে কিসের মধ্যে যাদু করা হয়েছে।) ব্যাপারটা কি? প্রথমজন বললো কি ভাবে? দ্বিতীয় ব্যক্তি বললো চিরুনী ও চুল দিয়ে। প্রথমজন বললো কোথায়? দ্বিতীয়জন বললো খেজুর গাছের মোচার মধ্যে রেখে যারওয়ান নামক কূপের ভিতর পাথরের নীচে রাখা আছে। তিনি সা. সাহাবাদের সাথে নিয়ে কূপের নিকট এসে সে স্থানটি পরিদর্শন করলেন এবং বলেন এইটিই সেই কূপ যা আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছ্।ে তিনি সা. সেখান থেকে এসে হযরত আয়েশা রা. কে বললেন, এর পানি মেহদী মিশ্রিত পনির ন্যায়। আর একূপের (চারপশের) খেজুর গাছের মাথাগুলো ( দেখতে ) শয়তানের (সাপের ফনার) মাথার ন্যায় (অর্থাৎ কূপটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিলো)। হযরত আয়েশা রা. বলেন আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি সেইগুলো অর্থাৎ চিরুনি ইত্যাদি কেন বের করলেন না ? তিনি সা. বললেন আল্লাহর কসম তিনি আমাকে ‘عافانی ’ অর্থাৎ তা থেকে নিরাপদে রেখেছেন এবং আমাকের ‘شفانی’ আরোগ্য দান করেছেন, তাই আমি মানুষের দৃষ্টি অসত্য-অনিষ্ট বিষয়ের দিকে নিবদ্ধ হোক তা পছন্দ করি নাই (বলে সেগুলোকে বের করি নাই) বরং কূপটি (মাটি দিয়ে) বন্ধ করিয়ে দিয়েছি।” (বুখারী শরীফ কিতাবুস সিহরে)

উক্ত হাদীসই আমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে বলে দেয় তাঁর সা. এর ওপর কোন যাদু করা হয়নি।

ক) হযরত আয়েশা রা. এর ঘটনাটি ‘ সুহেরা’ শব্দ দ¦ারা বর্ণনা করা। এর অর্থ হলো ‘ঐযে বলা হতো যাদু করা হয়েছিল’। আরবী ভাষায় حکایت عن الغیر (অর্থাৎ অন্যের কথাকে এমন ভাবে বলা যেন সে নিজেই বর্ণনা করছে) এর চর্চা অনেক বেশী। অর্থাৎ ঐযে লোকেরা বলাবলি করেছিল তাঁকে সা. যাদু করা হয়েছে।  অথবা ‘অজানা কারণে অসুস্থ হয়ে যাওয়া’। এ অর্থ অভিধান সমর্থন করে। 

খ) حکایت عن الغیر (অর্থাৎ) কুরআনেও এর ব্যাবহার আছে। যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’লা বলেন,   ذُقْ ۚۙ اِنَّکَ اَنۡتَ الْعَزِیۡزُ الْکَرِیۡمُ অর্থাৎ ‘স্বাদ গ্রহন কর। তুমি একজন মহা শক্তিশালী  সন্মানিত মানুষ।’ (সূরা দুখান ৫০) এখানে নাউযুবিল্লাহ  আল্লাহ তা’লা দোযখবাসীদের শক্তিশালী ও সন্মানিত বলছেন না বরং حکایت عن الغیر এর ভাষায় বলছেন তোমরা যে নিজেদের  মহা শক্তিশালী ও সন্মানিত মনে করতে আজ  আযাবের স্বাদ গ্রহন কর। মহানবী সা. এর স্বপ্নে দুইজন ব্যক্তির কথোপকথন অবিকল কুরআনের ভাষার ন্যায় ছিল। তাদের কথা বলার ভঙ্গিমা ছিল حکایت عن الغیر । অর্থাৎ লোকেরা বলাবলি করছে তাঁকে সা. যাদু করা হয়েছে।আর এভাবে লোকদের মাঝে যে কথাবার্তা হচ্ছিল তা তারা দুইজন বলাবলি করলো। 

গ) এ এক এমনই অপবাদ যেভাবে বানি মুসতালাক এর যুদ্ধের সময় হযরত আয়েশা রা. এর ওপর জঘন্য অপবাদ দেয়া হয়েছিল। এ অপবাদ দেয়ার মাধ্যমে সরল প্রকৃতির মুসলমানদের মাঝে বিভ্রান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কৌশল করা হয়েছিল। এ ষড়যন্ত্রের হোতা ছিল ইহুদী ও মুনাফেক। 

ঘ) যে সব দ্রব্যাদির মধ্যে যাদু করা হয়েছিল তা বের করে জালিয়ে না দেয়া প্রমান করে যাদু করা হয় নি। তিনি সা. কুপটি মাটি দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন। যাদু করা  হয়ে থাকলে মাটি দিয়ে ভরে দিলেও এই যাদুর ক্রিয়া ক্রিয়াশীল থাকবে। তাই মহানবী সা. এর প্রতিক্রিয়াও প্রমান করে তিনি জানতেন যাদু করা হয়নি। 

ঙ) হুদায়বীয়ার সন্ধির পর মহানবী সা. এ অসুখে আক্রান্ত হন। হুদায়বীয়ার পুরো ঘটনা মহানবী সা. কে বিচলিত করে তুলেছিল। শিঙ্গা লাগানোর কারণে তিনি সা. শারিরীকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েছিলেন। আর সে সময়ে হুদায়বীয়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোন ওহী অবতির্ন হচ্ছিলনা। এ সব কারণে তিনি সা. সে সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন। । এটি কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়। মহানবী সা. বলেছেন, انما آنا بشر انسی کما تنسون فاذا نسیت فاذکرونی অর্থাৎ আমি তোমাদেরই মত মানুষ। তোমরা যেভাবে ভুলে যাও আমিও সেভাবে ভুলে যেতে পারি। কাজেই আমি যদি কোন কিছু ভুলে যাই তোমরা আমাকে তা স্মরণ করিয়ে দিও। (আবু দাউদ)। সূতরাং তিনি সা. এর অসুস্থ হওয়ার বিষয়টি প্রমানিত তাই তাঁকে সা. যাদু করা হয়েছিল বলে যা কিছু বল হয় তা এক মিথ্যা অপবাদ। আর যারা এ কথা বলে তারা মহানবী সা. এর শত্রুদের ভাষায় কথা বলে।

যাদু করার যে রেওয়ায়েত হাদীসে আছে সে সম্পর্কে অতীতের কয়েকজন বুজুর্গদের মতামত  তুলে ধরছি,

قد قام الدلیل علی صدق النبی صلی اللہ علیہ و سلم والمعجزات شاھدات بتصدیقہ و اما ما یتعلق بامور الدنیا التی لم یبعث لاجلھا فھو فی ذلک عرضة لما یعترض من البشر کالامراض۔               মহানবী সা. এর সত্যতার অনেক অকাট্য দলীল প্রমাণ আছে। তাছাড়া তাঁর সা. এর অসংখ্য মুযেজাও তাঁর সত্যতার দলীল। জাগতিক বিষয়াদী যা তাঁর সা. এর নবুওয়তের সাথে সম্পৃক্ত নয় তার মধ্যে (অর্থাৎ যাদু সম্পর্কিত হাদীসের বর্ণনায় যা বলা হয়েছে) তা হলো  এক ধরনের অসুস্থতা যেভাবে অন্যান্য মানুষ অসুস্থ হয়ে থাকে। (ফাতহুল বারী শারাহ বুখারী দশম খন্ড )।

আল্লামা ইবনুল কাস্সার বলেন

الذی اصابہ کان من جنس المرض بقولہ فی اخرالحدیث اما انہ فقد شفانی

অর্থাৎ মহানবী সা. এর যা হয়েছিল তা অসুখ ছিল যেভাবে হাদীসের শেষাংসে তিনি সা. বলেন فقد شفانی

অর্থাৎ আল্লাহ তালা আমাকে আরোগ্য দান করেছেন।( ফাতহুল বারী শারাহ বুখারী দশম খন্ড) 

হাদীসের রেওয়ায়েতে সুরা ফালাক ও সূরা নাসের কোন কথা উল্লেখ নেই। অতএব উপরে বর্ণিত দলীলাদি দ্বারা প্রমানিত হয় মহানবী সা. এর ওপর কোন যাদু ক্রিয়াশীল হয়নি আর নাউযুবিল্লাহ তিনি সা. কখনও যাদুগ্রস্থ হন নি।

یا رب صل علی نبیک دائما 

فی ھذہ الدنیا و بعث ثانی

 

০৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১৩:১১:১০