দোয়া কবুলের উত্তম উপলক্ষ
কাজী আবুল কালাম সিদ্দীক ইসলাম
অ+ অ-প্রিন্ট
দোয়া বা প্রার্থনা আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দার সুন্নত। কারণ নবী ও রাসুলদের থেকে শুরু করে মোমিনরা আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়ার মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন পূরণের আবেদন করতেন। মানুষ হিসেবে আমরা আমাদের চাহিদাগুলো আল্লাহর কাছে বলব, আমাদের ভুলগুলোর জন্য তাঁর কাছে ক্ষমা চাইব। তিনি ওয়াদা করেছেন, তিনি আমাদের ডাকে সাড়া দেবেন, আমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা করো, আমি তোমাদের প্রার্থনা কবুল করব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত থেকে বিমুখ, তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।’ (সূরা মোমিন : ৬০)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে উত্তম কোনো ইবাদত নেই।’ (তিরমিজি : ৩৩৭০)। সত্যিই এ এক বড় সুযোগ। আল্লাহর কাছে চাওয়ার আগে আমাদের যা লক্ষ রাখতে হবে

হজের সময় দোয়া

কবুলের স্থান

আমরা চলতে-ফিরতে, উঠতে-বসতে, কাজেকর্মে সবসময় মনে মনে আল্লাহর কাছে চাইব। তবে বিশেষ কিছু সময়, স্থান ও উপলক্ষ আছে, যাতে দোয়া করার ব্যাপারে অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। তার মধ্যে হজ ও ওমরাকারীর দোয়া অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদকারী যোদ্ধা, হজকারী এবং ওমরাকারী আল্লাহর প্রতিনিধি। তারা দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন এবং প্রার্থনা করলে আল্লাহ দিয়ে থাকেন।’ (ইবনে মাজা)।

তিরমিজির এক বর্ণনায় আছে, ‘সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দোয়া।’ জিলহজ মাসের ৯ তারিখে যারা আরাফায় অবস্থান করেন, তাদের দোয়া কবুল হয়। এটা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বহুসংখ্যক হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এছাড়া পবিত্র হজের সময় যেসব জায়গায় দোয়া করার ফজিলতের কথা এসেছে, তা হলো কাবাঘরের ভেতরে, কাবাঘর তাওয়াফ করার সময়, সাফা-মারওয়া পাহাড়ের ওপর, সাফা-মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে, আরাফাতের দিন আরাফার ময়দানে, মুজদালিফায় মাশআরুল হারাম নামক জায়গায় এবং হজের সময় ১১ ও ১২ জিলহজ ছোট জামারায় পাথর নিক্ষেপের পর দোয়া করা। হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করলে গোনাহ মাফ হয়। (নাসাঈ : ৫/২২১)। হাজরে আসওয়াদের একটি জিহ্বা ও দুইটি ঠোঁট রয়েছে, যে ব্যক্তি তাকে চুম্বন-স্পর্শ করল, তার পক্ষে সে কেয়ামতের দিন সাক্ষী দেবে। (আহমদ : ১/২৬৬)। তবে হাজরে আসওয়াদ শুধুই একটি পাথর, যা কারও কল্যাণ বা অকল্যাণ কোনোটাই করতে পারে না। (বোখারি : ৩/৪৬২)।

মসজিদুল হারামে প্রবেশের সময় সুন্নত হলো ডান পা আগে বাড়িয়ে দেয়া এবং এ দোয়া পড়া ‘বিসমিল্লাহি ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসুলুল্লাহ, আল্লাহুম্মাফতাহলি আবওয়াবা রাহমাতিকা, আউজুবিল্লাহিল আজিমি ওয়া ওয়াজহিহিল কারিমি ওয়া সুলতানিহিল কাদিমি মিনাশ শায়তানির রাজিম।’

অর্থ ‘আল্লাহর নামে (প্রবেশ করছি)। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসুলের ওপর। হে আল্লাহ! আপনি আপনার অনুগ্রহের দ্বার আমার জন্য উন্মুক্ত করে দিন। আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে মহান আল্লাহ, তাঁর সম্মানিত চেহারা ও সত্তা, আর অনাদি শক্তির অসিলায় আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ 

অনেকে আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করে; কিন্তু প্রার্থনা নিবেদনের ক্ষেত্রে আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে অংশীদার করে। মনে করে, আমার কথা আল্লাহ সরাসরি হয়তো না-ও শুনতে পারেন। তাই তার ঘনিষ্ঠ কারও কাছে প্রার্থনা করলে সে তাঁর কাছে পৌঁছে দেবে। আবার অনেকে আল্লাহর কাছে সরাসরি প্রার্থনা করেছেন দীর্ঘদিন; কিন্তু দোয়া কবুলের কোনো আলামত না দেখে ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে দোয়া করা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে দোয়া করেন ঠিকই; কিন্তু কীভাবে করলে তা বৃথা যায় না, কখন দোয়া করলে তা কবুল হতে পারে, কীভাবে করলে কবুল হবে না এ বিষয়ে তেমন একটা খবর রাখেন না।

দোয়া করার আদব

আপনি দেখবেন, কোনো মানুষ যখন কারও কাছে কিছু চায়, তখন আদব-কায়দা বা শিষ্টাচারের সঙ্গেই তা চায়। সে নিজের কথা সুন্দর করে উপস্থপনা পদ্ধতি আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করে। এভাবে দরখাস্ত যত গুরুত্বপূর্ণ হবে তার আদব ও উপস্থাপনা ততই সুন্দর এবং মার্জিত করা হয়। এসব প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য একটাই সে যা আবেদন করেছে, তা যেন পায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের চেয়ে এমন বড় সত্তা কে আছে, যার কাছে আদব-কায়দা ও পূর্ণ শিষ্টাচারসহ প্রার্থনা করা যেতে পারে? অপরদিকে দোয়া-মোনাজাত যখন সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত, তখন অবশ্যই এটা আদায় করতে তার যত বিধিবিধান, শর্তাবলি, নিয়মকানুন, শিষ্টাচার আছে, তার সবই পালন করতে হবে। লক্ষ্য থাকবে, আমার এ প্রার্থনা যেন আল্লাহর কাছে কবুল হয়। সুতরাং এ ব্যাপারে বেশকিছু বিষয়ে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে। যেমন দোয়া করার সময় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে দোয়া করা। যদি আল্লাহ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান থাকে তাঁর কুদরত, মহত্ত্ব, ওয়াদা পালনের প্রতি ঈমান থাকে, তাহলে এ বিষয়টা আয়ত্ত করা সহজ হবে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ এ ধরনের বলবে না হে আল্লাহ আপনি যদি চান, তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিন। যদি আপনি চান, তাহলে আমাকে অনুগ্রহ করুন। যদি আপনি চান, তাহলে আমাকে জীবিকা দান করুন। বরং দৃঢ়তার সঙ্গে প্রার্থনা করবে এবং মনে রাখবে, তিনি যা চান তা-ই করেন, তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না।’ (বোখারি : ৭৪৭৭)।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে দোয়া করা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ ও তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচার প্রবল আগ্রহ নিয়ে দোয়া করা। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালকের কাছে দোয়া করবে।’ ( সূরা আরাফ : ৫৫)।

দোয়ায় আল্লাহর হামদ ও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি দরুদ পেশ করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দোয়ার শুরুতে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা করা ও রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি দরুদ পড়া দোয়া কবুলের সহায়ক বলে হাদিসে এসেছে। এছাড়া আল্লাহর সুন্দর নামগুলো ও তাঁর মহৎ গুণাবলি দ্বারা দোয়া করার ব্যাপারে এরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাকে সেসব নাম দিয়ে প্রার্থনা করবে।’ (সূরা আরাফ : ১৮০)।

মানুষ কখনও সুখের সময় অতিবাহিত করে কখনও দুঃখের সময়। অনেক মানুষ এমন আছেন, যারা শুধু বিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকেন ও প্রার্থনা করেন। আবার অনেকে এমন আছেন, যারা বিপদে পড়লে আল্লাহকে ডাকতে ভুলে যান। কিন্তু সত্যিকার মোমিন ব্যক্তি সুখে ও দুঃখে সর্বদা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে থাকেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে চায়, আল্লাহ বিপদ-মুসিবতে তার প্রার্থনা কবুল করুন, সে যেন সুখের সময় আল্লাহর কাছে বেশি করে প্রার্থনা করে।’ (তিরমিজি ও হাকেম)।

দোয়া কবুলের অনুকূল

অবস্থা ও সময়

উপরে আমরা হজের সময় দোয়ার কথা উল্লেখ করেছি। এছাড়াও কিছু সময় রয়েছে, যাতে দোয়া কবুল করা হয়। এমনি মানুষের কিছু অবস্থা আছে, যা দোয়া কবুলের উপযোগী বলে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আজানের সময় এবং যুদ্ধের ময়দানে যখন মুজাহিদরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুইটি সময় এমন, যাতে দোয়া ফেরত দেয়া হয় না অথবা খুব কম ফেরত দেয়া হয়। তা হলো আজানের সময়ের দোয়া এবং যখন যুদ্ধের জন্য মুজাহিদরা শক্রের মুখোমুখি হন। (আবু দাউদ)। আজান ও একামতের মধ্যবর্তী সময়ে দোয়া ফেরত দেয়া হয় না। সুতরাং তোমরা দোয়া করো। (তিরমিজি ও আহমদ)। বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় যখন সে সিজদারত থাকে। সুতরাং তোমরা এ সময় বেশি করে দোয়া করো। (আবু দাউদ ও নাসাঈ)। রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো কোন দোয়া সবচেয়ে বেশি কবুল করা হয়? তিনি বলেন, শেষ রাতে এবং ফরজ সালাতের শেষে। (তিরমিজি)। 

 

০৭ আগস্ট, ২০১৭ ১০:৩৫:৫৬