মসজিদের আদব
শাহ মাহমূদ হাসান ইসলাম
অ+ অ-প্রিন্ট
মুসলমানদের মসজিদ অন্যান্য ধর্মের মতো নিছক কোনো উপাসনাগৃহ নয়। মুসলমানদের কাছে মসজিদ অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান। কারণ প্রত্যেকটি মসজিদই আল্লাহর পবিত্র ঘর। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মসজিদ মূলত আল্লাহর ঘর।’ (সূরা জিন : ১৮)। মসজিদ পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট জায়গা এবং আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে প্রিয় স্থান। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম জায়গা মসজিদ, আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা বাজার।’ (মুসলিম : ১৫৬০)। 

মসজিদের আদব : ১. ওজুসহ পাকপবিত্র অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করা সুন্নত। নাপাক অবস্থায় অথবা কাঁচা পেঁয়াজ-রসুনের মতো দুর্গন্ধযুক্ত কোনো খাবার খেয়ে মসজিদে প্রবেশ করা উচিত নয়। বিড়ি-সিগারেট, গুল-তামাক ও মাদকজাত দ্রব্য খেয়ে মসজিদে প্রবেশ করা জায়েজ নয়। 

২. মসজিদে ধীর-স্থিরতার সঙ্গে গমন করা উচিত। রাকাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কায় তাড়াহুড়া করে দৌড়ে যাওয়া ঠিক নয়। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘তোমরা নামাজে অবশ্যই ধীর-স্থিরতার সঙ্গে আসবে। যতটুকু পাবে, আদায় করবে। আর যতটুকু ছুটে যাবে, পূর্ণ করবে।’ (বোখারি : ৬০৯)।

৩. মসজিদে মোবাইল ফোনের ব্যবহার এখন অসহনীয় ও অমার্জনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে নামাজের সময় মোবাইলর ফোনের রিংটোনের কারণে ইবাদতের পরিবেশ নিদারুণ বিঘিœত হয় এবং অনেক সময় তা চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। তাই মসজিদে প্রবেশের আগেই মোবাইল ফোন বন্ধ করা উচিত। ভুলবসত যদি মোবাইল ফোন খোলা থাকে আর নামাজরত অবস্থায় রিংটোন বেজে ওঠে, তাহলে এক হাত ব্যবহার করে ফোন বন্ধ করে দিতে হবে। তাতে অন্যদের নামাজ অন্তত নির্বিঘœ আদায় সম্ভব হবে।

৪. মসজিদে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করা ও বাম পা দিয়ে বের হওয়া এবং মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার দোয়া পড়া সুন্নত। মসজিদে প্রবেশের দোয়া হলো, ‘বিসমিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসুলিল্লাহ, আল্লা-হুম্মাফতাহলি আবওয়াবা রহমাতিক।’ আর মসজিদ থেকে বের হওয়ার দোয়া হচ্ছে, ‘বিসমিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসুলিল্লাহ, আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা মিন ফাদলিক, আল্লাহুম্মা-সিমনি মিনাশ শাইতানির রাজিম।’ 

৫. মসজিদে সর্বদা ইতিকাফের নিয়তে প্রবেশ করে মসজিদের ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখা উচিত। 

৬. মসজিদে অতিরিক্ত শব্দ করে কোনো কাজ করা ঠিক নয়। দরজা-জানালা ব্যবহারের সময়, হাঁটাচলার সময় অতিরিক্ত শব্দ যাতে না হয়, সে ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে। হট্টগোল করা বা উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা যাবে না। পাশের লোকের অসুবিধা হয়, এমন উচ্চৈঃস্বরে কোরআন তেলাওয়াত করাও জায়েজ নেই। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘নামাজি ব্যক্তি তার প্রভুর সঙ্গে গোপনে কথা বলে। তার খেয়াল রাখা উচিত যে, সে কী বলছে। তোমরা কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে একে অন্যের ওপর শব্দ করো না।’ (বায়হাকি : ৪৪৮০)। উচ্চৈঃস্বরে কোরআন তেলাওয়াত করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা কতটা অমার্জনীয় বলাই বাহুল্য।

৭. মসজিদে আগেভাগে গিয়ে প্রথম কাতারে নামাজ পড়ার ব্যাপারে রাসুল (সা.) উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যদি মানুষ জানতে পারত, আজান দেয়া এবং প্রথম কাতারে নামাজ আদায়ের মাঝে কী ফজিলত রয়েছে, আর লটারি ব্যতীত সেটি পাওয়া সম্ভব না হতো, তাহলে অবশ্যই তার জন্য লটারির ব্যবস্থা করত। এবং যদি জানতে পারত মসজিদে আগে আসার মাঝে কী ফজিলত রয়েছে, তাহলে তার জন্য হামাগুড়ি দিয়ে হলেও আগে আসত।’ (বোখারি : ৫৯০)। 

৮. ইমাম ও মুয়াজ্জিন ছাড়া কারও জন্য জায়নামাজ জাতীয় কিছু দিয়ে কোনো জায়গা নির্দিষ্ট করে রাখা সম্পূর্ণ অন্যায়। মসজিদের সীমানায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সবার উচিত নিজেদের আল্লাহর গোলাম হিসেবে সমর্পণে ব্রতী হওয়া এবং সব ভেদাভেদ, আমিত্ব ও অহমিকা ভুলে একই কাতারে দণ্ডায়মান হওয়া। এবং ইমামের দুই দিক থেকে সমান্তরালে কাতার পূরণ করা।

৯. মসজিদে প্রবেশকারী দুই রাকাত তাহিয়াতুল মসজিদ আদায় ব্যতীত বসবে না। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে দুই রাকাত নামাজ আদায় না করে বসবে না।’ (বোখারি : ১১১০)।

১০. মসজিদে বসার নিয়ম হচ্ছে নামাজের ভঙ্গিতে নতজানু হয়ে বসা। দুই হাঁটু ছড়িয়ে বা দুই পা কিবলার দিকে টান টান করে কিংবা হেলান দিয়ে বসা মসজিদের আদব পরিপন্থী।

১১. জামাতে নামাজ আদায়ের সময় কাতার সোজা করে দাঁড়ানো ওয়াজিব। কাতারে জায়গা ফাঁকা রাখা হলে সেখানে শয়তান এসে অবস্থান নেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নামাজের জন্য কাতারবদ্ধ হও, কাঁধের সঙ্গে কাঁধ মেলাও, ফাঁক বন্ধ করো, শয়তানের জন্য জায়গা ফাঁকা রেখো না। আর যে ব্যক্তি কাতার মেলায়, আল্লাহ তাকে নিজের রহমতের সঙ্গে মেলাবেন। আর যে ব্যক্তি কাতারে মাঝে দূরত্ব বজায় রাখে, আল্লাহ তাকে নিজের রহমত থেকেও দূরে রাখবেন।’ (আবু দাউদ : ৬৬৬)।

১২. মুক্তাদির উচিত সর্বদা ইমামের অনুসরণ করা, ইমামের আগে কোনো আমল করা তার জন্য বৈধ নয়। আবার ইমাম থেকে অনেক দেরিতেও করা যাবে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজে ইমামের আগে মাথা ওঠায় তার কি ভয় হয় না যে, আল্লাহ তায়ালা তার মাথাকে গাধার মাথা বানিয়ে দেবেন কিংবা তার আকৃতি গাধার আকৃতিতে পরিবর্তন করে দেবেন।’ (ইবনে মাজাহ : ৯৬১)।

১৩. মসজিদের জিনিসপত্র নিজস্ব কাজে বা মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও ব্যবহার করা জায়েজ নয়।

অতএব মুসল্লিদের দায়িত্ব হলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মসজিদের পবিত্রতা ও আদবগুলো রক্ষা করা এবং মসজিদে আল্লাহর অতিথি হয়ে তার ঘরের সঙ্গে বেয়াদবি করে নিজেদের ক্ষতি সাধন না করা।

১২ জুলাই, ২০১৭ ০৬:০৮:১২