আখেরি চাহার শোম্বা এবং নবীজীর গোসল
মুহাম্মদ ফরহাদ হোসেন
অ+ অ-প্রিন্ট
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আরবি সফর মাসের শেষ বুধবারকে আখেরি চাহার শোম্বা হিসেবে স্মরণ করা হয়। বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) এ দিন রোগ থেকে মুক্তিলাভ করেন এবং গোসল করেন। এ দিনের পর তিনি আর গোসল করেননি। এরপর তাঁর রোগ বৃদ্ধি পায় অতঃপর ১২ রবিউল আউয়াল ওফাত লাভ করেন। এ দিন মুসলমানরা গোসল করে, নতুন পোশাক পরিধান করে এবং খোশবু লাগায়। তৎকালীন দিল্লির বাদশাহী কেল্লায় এ উৎসব উপলক্ষে বিশেষ দরবার বসত। এতে শাহজাদা ও আমিররা শরিক হতেন (ফারহাঙ্গ-ই-আসফিয়া, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১২৬)। মুসলমানরা মূলত রাসূল (সা.) যে গোসল করেছিলেন তাই উদযাপন করে থাকে। ইসলামী শরিয়তে এ গোসলের তাৎপর্য ও ফজিলত আলোচনার অবকাশ থেকে যায়।

আখেরি চাহার শোম্বা এমন একটি দিন যে দিনের সকালে ছিল আনন্দ আর বিকালে ছিল বিষাদের ছায়া। নবী করিম (সা.) ওই দিন সকালে সুস্থতা বোধ করে গোসল করেন আর দুপুরে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। সহিহ হাদিসে তাঁর অসুস্থতা, অসুস্থকালীন অবস্থা, কর্মোপদেশ এবং তাঁর ইন্তেকালের অবস্থা সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় হিজরি সনের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনু ইসহাক (১৫১ হি./৭৬৮ খ্রি.) বলেন, রাসূল (সা.) যে অসুস্থতায় ইন্তেকাল করেন সে অসুস্থতা শুরু হয়েছিল সফর মাসের কয়েক রাত বাকি থাকতে। (আস সিরাহ আন নববীয়্যাহ : ইবনু হিশাম)। বোখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে রাসূল (সা.) ১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের তারিখ সম্পর্কে মতভেদ থাকলেও ১২ রবিউল আউয়াল মতটিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। হজরত আলী (রা.) সূত্রে ইন্তেকালের এ তারিখটি বর্ণিত হয়েছে। আলা হজরত ইমাম আহমদ রেজা বেরলভী (রহ.) এটিকেই শুদ্ধতম রেওয়ায়েত বলে ফতোয়া দিয়েছেন। কারণ হজরত আলী (রা.) নবী পরিবারের এমন এক সদস্য যিনি অসুস্থতাকালীন, অসুস্থ অবস্থায় মসজিদে যাতায়াতকালীন, ইন্তেকাল পরবর্তী গোসলকালীন এমনকি কবরে শায়িত করার সময়ও রাসূল (সা.)-এর সোহবতে ছিলেন। কাজেই আলী (রা.)-এর কথাই অগ্রগণ্য।

সফর মাসের শেষ বুধবার। সকাল বেলায় রাসূলেপাক (সা.) আয়েশা (রা.)-কে ডেকে বললেন, আয়েশা! আমার জ্বর কমে গেছে, আমাকে গোসল করিয়ে দাও। সে মতে হুজুরকে (সা.) গোসল করানো হল। আসাহহূস সিয়ারের বর্ণনায় বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) বলেছিলেন, ‘আমার ওপর সাত মশক পানি বইয়ে দাও, যার রিবাত যেন ঢিলা না হয়- অর্থাৎ মশক যেন পূর্ণ হয়, এমন যেন না হয় তা থেকে কিছু পানি পড়ে গেছে। রাহমাতুল্লিল আলামিন গ্রন্থে আছে, রাসূল (সা.) পাথরের জলাধারে বসে সাতটি কুয়ার সাত মশক পানি নিজের মাথায় ঢালিয়ে নেন। এটিই ছিল হুজুরের দুনিয়ার শেষ গোসল। অতঃপর তিনি সুস্থবোধ করলেন।

গোসল সেরে নবী করিম (সা.) বিবি ফাতেমা ও নাতিদ্বয়কে ডেকে এনে সবাইকে নিয়ে সকালের নাস্তা করলেন। হজরত বেলাল (রা.) এবং সুফফাবাসী সাহাবিরা এ সংবাদ বিদ্যুতের গতিতে মদিনার ঘরে ঘরে পৌঁছিয়ে দিলেন। স্রোতের মতো সাহাবিরা হুজুরের দর্শনের জন্য ভিড় জমাতে লাগল। মদিনার অলিতে-গলিতে আনন্দের ঢেউ লেগে গেল। ঘরে ঘরে শুরু হল সদকা, খয়রাত, দান-সাখাওয়াত ও শুকরিয়া জ্ঞাপন। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) খুশিতে ৫০০০ দিরহাম ফকির-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন। হজরত ওমর ফারুক (রা.) দান করলেন ৭০০০ দিরহাম, হজরত আলী (রা.) দান করলেন ৩০০০ দিরহাম। মদিনার ধনাঢ্য মুহাজির সাহাবি হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) খুশিতে আল্লাহর রাস্তায় ১০০ উট দান করে দিলেন। হুজুরের একটু আরামের বিনিময়ে সাহাবায়ে কেরামের জানমাল কোরবানি দেয়ার বিষয়টি আজ আমাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়।

আমাদের দেশে এদিন অনেক মুসলমানই বিশেষ দোয়া চুবানো পানি দিয়ে গোসল করেন এবং আয়াতে শিফা তথা কোরআনুল করিমের ‘সালাম’ সম্বোধিত সাত আয়াত লিখে সেগুলো পানীয় জলে চুবিয়ে পান করেন। অনেকে সূর্যোদয়ের আগে গোসল করেন এবং সূর্যোদয়ের পর দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে নেন। আমলটি আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। কেউ কেউ একে বেদায়াত ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন। মাওলানা আবদুল হাই লক্ষেèৗভী তার মাজমুয়ায়ে ফতোয়া কিতাবে ওই পদ্ধতিতে গোসলের মাধ্যমে রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এক্ষেত্রে আয়শা সিদ্দিকার (রা.) একটি হাদিস স্মরণযোগ্য। মা আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন. ইন্তেকালের আগে যখন তাঁর রোগ যন্ত্রণা বৃদ্ধি পায় তখন আমি সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে তাঁর দু’হাতে ফুঁক দিতাম। অতঃপর তিনি নিজে তা সর্বাঙ্গে বুলিয়ে নিতেন। আমার হাত তাঁর পবিত্র হাতের বিকল্প হতে পারত না। তাই আমি এরকম করতাম (ইবনে কাসির)। তাছাড়া কোরআনুল করিম মুমিনদের জন্য শিফা উল্লেখ করে কোরআনুল করিমে বলা হয়েছে, ওয়ানুনাজজিলু মিনাল কুরআনি মা হূয়া শিফাউ ওয়ারাহমাতুল লিল মু’মিনীন।

২৪ নভেম্বর, ২০১৬ ০৫:৩৮:১৪