ইউরোপে দীর্ঘ রোজা: প্রথাভঙ্গের সুযোগ কি রয়েছে?
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেনে ইফতারির পসরা
ইউরোপে এবার জুন মাস এবং রমজান মাস একসাথে পড়ে যাওয়ায় গত তেত্রিশ বছরের মধ্যে দীর্ঘতম রোজা চলছে। দেশ ভেদে ১৯ থেকে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত রোজা রাখছেন ইউরোপের মুসলমানরা। ব্রিটেনে এবার রোজার শুরুর দিনেই সেহেরির শেষ সময় থেকে ইফতারের সময় ১৯ ঘণ্টা। ইউরোপের উত্তরের দেশগুলোতে যেমন, সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়েতে এই ব্যবধান আরো বেশি, ২০ থেকে ২১ ঘণ্টা।

ইউরোপে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন কম-বেশি সাড়ে চার কোটি। এই সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু যেসব দেশ থেকে তারা এসেছেন, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সেসব দেশের তুলনায় ইউরোপে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মধ্যে ব্যবধান অর্থাৎ দিন-রাতের সময় অনেকটাই আলাদা।

সে কারণে গরমের রোজা ১৯-২০-২১ ঘণ্টা। আবার শীতের রোজা ৬-৭-৮ ঘণ্টা, এমনকি নরওয়ের একদম উত্তরে এক ঘণ্টা বা তারও কম হতে পারে। ইউরোপে রোজার সময়কে সামঞ্জস্য করার কোনো রাস্তা আছে কিনা, এ নিয়ে ধর্মের ব্যাখ্যা কি – এসব নিয়ে ইউরোপের মুসলিমদের কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে প্রশ্ন করেন।

"১৮ ঘণ্টার বেশি রোজা রাখা শারিয়া বিরোধী"

কিন্তু বছর দুয়ের ধরে প্রকাশ্যে কথা বলছেন ব্রিটেনের বিতর্কিত এক ইসলামি চিন্তাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড: উসামা হাসান। তার কথা- ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত না খেয়ে থাকার প্রথা মানার প্রয়োজন ইউরোপে নেই। বরঞ্চ মক্কা-মদিনার মানুষ যত ঘণ্টা রোজা রাখেন, ইউরোপে সে মতই রোজা হতে পারে। তাতে ইসলামের বিধান ভঙ্গ হবেনা, বরঞ্চ সেটাই ইসলামের বিধান।

ড. হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘‘দেখুন আমি যা বলছি, মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি মোহাম্মদ আবদো একশ বছর আগে সেরকম ফতোয়া দিয়েছিলেন। ২০১০ সালে আল আজহার সেই ফতোয়া আবার স্মরণ করে দিয়েছে।“

ড. হাসান বলেন, মিশরের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি এবং আল আজহারের ফতোয়ার মোদ্দা কথা ছিলো ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার মুসলমানরা মক্কা এবং মদিনার না-খেয়ে থাকার সময় অর্থাৎ ঋতু ভেদে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা রোজা রাখতে পারে। “১৮ ঘণ্টার ওপর রোজা ইসলামি শারিয়া অনুযায়ী নিষিদ্ধ।“

পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত ড. উসামা হাসান কুইলিয়াম নামে একটি ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। কুইলিয়াম ইউরোপের উদার ভাবধারার সাথে মুসলমানদের ব্যবধান কমানোর কথা বলে, ইসলামি বিধানের উদার ব্যাখ্যা করে। ফলে বহু মুসলিম তাদের সন্দেহের চোখে দেখে।

গরমে দীর্ঘ রোজা এবং তা নিয়ে ড. ওসামা হাসানের কথিত ফতোয়া নিয়ে কি ভাবছেন ইউরোপের সাধারণ মুসলমানরা এবং মুসলিম ধর্মীয় নেতারা?

রোজার দ্বিতীয় দিন। ইংল্যান্ডের পোর্টসমথ শহরের আবিদুর রহমান চৌধুরী, স্ত্রী স্বপ্না রহমান এবং স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া দুই ছেলে সেহেরির ১৯ ঘণ্টা পর ইফতার করতে বসেছেন। রাত সোয়া নটা তখন।

স্বপ্না রহমান বিবিসিকে বলেন, গরমে দীর্ঘ রোজার কথা মাথায় রেখে তিনি রহমান বাৎসরিক ছুটি এই রোজার মাসে নিয়ে রেখেছেন। বললেন, ১৯ ঘণ্টা রোজা কষ্টের কিন্তু কোনো অভিযোগ নেই।

ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখার প্রচলিত বিধানের বদলে মক্কা-মদিনার মানুষ যতক্ষণ রোজা রাখেন ততক্ষণ রোজা রাখার যে কথা ড উসামা হাসান বলছেন – সে প্রসঙ্গ তুলতে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে স্বামীর দিকে তাকালেন স্বপ্না রহমান।

দ্রুত ভেবে নিয়ে আবিদুর চৌধুরী বললেন, “কোরানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। হবেও না। যত কষ্টটাই হোক না কেন কোরানের নির্দেশ আমাদের মেনে চলতে হবে...যুগ যুগ ধরে এটা চলে আসছে, এখন আমরা যদি নতুন কিছু সৃষ্টি করি সেটা আল্লার-রসুলের বিপরীতে চলে যেতে পারে।"

কিন্তু ইসলামের উৎপত্তি যেখানে সেই সৌদি আরবেই মানুষ যেখানে ১৩-১৪ ঘণ্টা রোজা রাখছে, ইউরোপের মুসলমানরা ১৯-২০ ঘণ্টা রোজা করছে - এটাকে কিভাবে দেখেন তিনি? "শীতের রোজাতে আবার ইউরোপের মুসলমানরা অনেক কম সময় রোজা রাখে।" ইউরোপের গরমে দীর্ঘ রোজা আবিদুর পরিবারের কাছে কোনো ইস্যুই নয়।

 

২৩ জুন, ২০১৬ ১৯:৪১:২১