পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি ও সীমারেখা
শাহীন হাসনাত
অ+ অ-প্রিন্ট
ইসলাম এক পরিপূর্ণ সামষ্টিক শক্তির নাম। এর কার্যকারিতা যতখানি বাহ্যিক ততখানি অভ্যন্তরীণ। যেমন সূরা হুজরাতের ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, 'মুমিনরা পরস্পরের ভাই।' এই আয়াতই হলো মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি। তাই তো দেখা যায়, মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্কে এক ধরনের স্থিতি, গভীরতা ও ব্যাপকতা বিদ্যমান। 

আমরা জানি, ইসলামের বিধিবিধান ও শরিয়ত নির্দেশনার সর্বক্ষেত্রেই আবেগ ও বাস্তবতার পূর্ণ মিলন ঘটেছে। যার পরিণতি স্বস্তি ও প্রশান্তির কারণ হয়ে থাকে। দেখুন, মুমিন মুসলমানদের সম্পর্ক কাদের ঘিরে তৈরি হবে তার নির্দেশনা কোরআনে কারিমে এভাবে এসেছে_ 'তোমাদের বন্ধু তো সত্যিকার অর্থে আল্লাহ, তার রাসূল এবং ওইসব ইমানদার, যারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং খোদার সামনে মাথা অবনতকারী।'

বর্ণিত আয়াতের ভিত্তিতে এভাবেই ইমানদাররা প্রকৃত বন্ধু বাছাই করবে, বন্ধুত্বের এ সম্পর্কে কোনো বাহ্যিক সম্পর্ক নয়। দুনিয়ার লেনদেন, আদান-প্রদানে সীমাবদ্ধ নয়। এই সম্পর্ক আদর্শিক। তাই তার ধরনও ভিন্ন, অনেক মজবুত এবং আল্লাহর রহমত দ্বারা পরিপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে- 'তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং কখনও পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তোমরা একে অপরের দুশমন ছিলে, অতঃপর আল্লাহতায়ালা (তার দ্বীনের বন্ধন দিয়ে) তোমাদের একের জন্য অপরের অন্তরে ভালোবাসা সঞ্চার করে দিলেন। অতঃপর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহে 'ভাই ভাই' হয়ে গেলে। অথচ তোমরা ছিলে অগি্নকুণ্ডের প্রান্ত সীমানায়। অতঃপর সেখান থেকে আল্লাহতায়ালা তোমাদের উদ্ধার করলেন, আল্লাহতায়ালা এভাবেই তার নিদর্শনগুলো তোমাদের কাছে স্পষ্ট করেন, যাতে তোমরা সঠিক পথের সন্ধান পাও।' -সূরা আল ইমরান :১০৩

এই আদর্শিক সম্পর্ক ছাড়াও পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক মুমিনদের রক্ষা করতে হয়। মূলত ইসলামে পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব এর সৌন্দর্য ও সীমার মধ্যে নিহিত। সেগুলোর মাঝে রয়েছে- 

শুধু সম্পর্ক রক্ষা করা নয় বরং পূর্ণ ইনসাফ সহকারে সম্পর্ক রক্ষা করা জরুরি। পিতা-মাতা ও সন্তানের প্রতি সুবিচার, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যে অন্যায়ের কাছে না যাওয়া। বিষয়টি অনেকটা এমন- মানুষ কিছু কিনতে গেলে যেমন সঠিক পরিমাপ করে আনে, তেমনি পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্র ইনসাফের ঠিক ঠিক পরিমাপ করাকে ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। পারস্পরিক ভালোবাসা যেমন থাকতে হবে, ইনসাফও থাকতে হবে। এ ছাড়া সম্পর্ক রক্ষায় মানবিকতার বিকাশ জরুরি। পারস্পরিক মতবিরোধের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা, কথা না বলা, রাগের বশে অধীনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। বর্ণিত অবস্থায় ইসলাম সবাইকে মানবিক অবস্থান ও আচরণ শিক্ষা দেয়। এভাবেই ইসলাম পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশাল পরিবর্তন ঘটায়; যা অন্য কোনো পদ্ধতি বা সচেতনমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের ভুল হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। অযথা অনুমান, হিংসা, অহঙ্কার, রাগ ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে এটা হওয়ার আশঙ্ক থাকে। এ বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। আসলে পারস্পরিক মর্যাদা সংরক্ষণ ও প্রয়োজন পূরণ জীবনবোধের একটি অসাধারণ দিক। সামষ্টিক কোনো তৎপরতায় এটা এতটাই জরুরি যে, অনেক সুন্দর লক্ষ্য, উপযুক্ত কর্মসূচি ও প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণ থাকলেও এর অভাবে তা ভেঙে পড়ে। আবার একটি সামাজিক পরিবেশও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে এর অভাবে। এর প্রতি ইসলামের নির্দেশনা খুবই সচেতনমূলক ও গুরুত্ব বহনকারী। 

ইসলামে অন্যের প্রয়োজন পূরণ ও মর্যাদা সংরক্ষণ বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। কারও দুর্বলতা প্রকাশ না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আমাদের কোনো কথা বা আচরণ দ্বারা যেন কেউ কষ্ট না পায়। কারও ভুলত্রুটি প্রকাশ পেয়ে গেলেও নমনীয় থাকা। তবে ইসলামে মৌলিক বিধানে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। কারও তুলনায় কাউকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে- এমন কিছু যেন আচরণে প্রকাশ না পায়। প্রত্যেকের মতামত ও চিন্তা আমার কাছে গুরুত্ব পাবে যদিও তার সবসময় সবটা গ্রহণ না করা সম্ভব হয়। অন্যের প্রতি সহনশীলতা বজায় রাখা এমনকি বিতর্কের ক্ষেত্রেও। পারস্পরিক প্রয়োজন বুঝতে পারলে এবং মর্যাদা সংরক্ষণ করতে পারলে অনেক ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিও সংশোধন হয়ে যেতে পারে। এটা সামাজিক রুচিবোধের প্রকাশ।

মনে রাখতে হবে, মুমিনদের সম্পর্ক কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়। প্রতিটি সম্পর্ক আল্লাহর জন্য। তাই তা সংরক্ষণে আল্লাহর নির্দেশ মানতে হবে।

 

১৩ মে, ২০১৬ ১২:০৮:২১