অধিক সন্তান দেশ ও সমাজের জন্য অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ
ডা. জাকির নায়েক
অ+ অ-প্রিন্ট
ডা. জাকির নায়েক
বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবীদ ডা. জাকির নায়েক বলেছেন, অধিক সন্তানগ্রহণ দেশ ও সমাজের জন্য অভিশাপ নয় বরং আশীর্বাদ। পিসটিভির প্রশ্নোত্তর পর্বে ভারতীয় এক মহিলা সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।

এর আগে লক্ষ্মী নামে এক ভারতীয় সাংবাদিক ডা. জাকির নায়েককে প্রশ্ন করে বলেন, ‘আপনারা নাকি পরিবার-পরিকল্পনা সমর্থন করেন না। আমাদের দাদি-নানিদের সময়েও ১০/১৫টি সন্তান নেওয়াকে ভালো এবং খুশির বিষয় মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে আমাদের রাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী পরিবার-পরিকল্পনার বিষয়টি থামানো সম্ভব কি?

উত্তরে ডা. জাকির নায়েক বলেন, আপনার দাদি-নানিদের সময়ে অনেক সন্তান নেওয়াকে ভালো মনে করা হতো। এখন সময় বদলাচ্ছে। পরিবার-পরিকল্পনার মাধ্যমে কম সন্তান নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। এখন জানতে হবে আপনি সঠিক, নাকি আপনার দাদি-নানি সঠিক?

ইসলাম বিশেষজ্ঞরা সর্বসম্মতিক্রমে একমত যে, ইসলামে স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হারাম। গর্ভপাত করাও হারামÑ যদি তা মায়ের জীবন রক্ষার জন্য না হয়ে থাকে। জীবন রক্ষার আশঙ্কা থাকলে যেমন ডাক্তার বললেন, এই মহিলার হার্ডে সমস্যা আছে, তাকে গর্ভপাত করানো হলে সে জীবন হারাতে পারে অথবা কয়েকবার সিজার করে সন্তান জন্মদানের পর নতুন করে সন্তান নিলে জীবননাশের আশঙ্কা আছে। এসব ক্ষেত্রে যে কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। ইসলাম এ অনুমোদন দিয়েছে। কারণ এটা না করলে তার বড় ক্ষতি হতে পারে। আর বড় ক্ষতির বিপরীতে ছোট ক্ষতিকর কিছু করা যায়!

স্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণ বা গর্ভপাত হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোরআনে বলা হয়েছে ‘তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না দারিদ্রতার ভয়ে। আমি তোমাদের রিজিক দিবো এবং তোমাদের সন্তানদেরও। [সুরা আনআম : আয়াত- ১৫১]। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে- ‘তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না দারিদ্রতার ভয়ে। আমি তোমাদের রিজিক দিবো এবং তোমাদের সন্তানদেরও। নিশ্চয় তাদের হত্যা করা বড় অবিচার। [সুরা ইসরা : আয়াত- ৩১]। আয়াতদ্বয় থেকে বুঝা যায় গর্ভপাতের মাধ্যমে সন্তান হত্যা করা নিষেধ।

অস্থায়ী জন্ম বিরতির নামে যারা গর্ভনিরোধের কথা বলেন, তাদের ব্যাপারে ডা. জাকির নায়েক বলেন, আমি নিজে একজন ডাক্তার। তাই বলব, ডাক্তারি পরিভাষায় এটিকে গর্ভনিরোধ বললেও এটি মূলত গর্ভ নষ্ট করা। বিষয়টি একটু অগ্রসর হয়ে চিন্তা করলে আপনিও বুঝতে পারবেন, এটি প্রাথমিক গর্ভপাত। আর ইসলামে তাও নিষিদ্ধ।

তিনি বলেন, অস্থায়ী জন্ম নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ইসলামে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। একবার রাসুল সা. এর কাছে একজন লোক এসে বলল, সে আযল করে। আযল হলো সহবাসে বীর্য বেরুনোর সময় বিশেষ অঙ্গ পৃথক করে নেয়া এবং নারীদেহে বীর্য প্রবেশে বাধা দেয়া। ওই লোকের কথা শোনে নবীজি সা. কিছুই বললেন না। নীবর ছিলেন। এ থেকে বিশেষজ্ঞদের কয়েকজন বলেন, নবীজি যেহেতু তখন নীরব ছিলেন- তাই অনুমতি দিয়েছেন। অন্যরা বলেন, যেহেতু নীরব ছিলেন, তাই অনুমতি দেননি।

সাধারণত দুটি কারণে মানুষ পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। এক. গরিব এবং দারিদ্রতার কারণে অনেকে বেশি সন্তান নিতে চান না। দুই. লোকটি ধনী, কিন্তু কম সন্তান নিলে সুযোগ বেশি। সন্তানদের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে পারবেÑ তাই বেশি সন্তান নিতে চান না।

প্রথম কারণটি অনুযায়ী কেউ যদি গরিব হয়, ইসলাম দারিদ্রতার সমাধান দিয়েছে। আর তা হলো জাকাত। জাকাত ইসলাম ধর্মের একটি অন্যতম স্তম্ভ। প্রত্যেক ধনী মুসলমান, যাদের নিসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছেÑ তারা সম্পদের ২.৫০% প্রতি চন্দ্র মাসের শুরুতে দান করে দিবে। যদি প্রত্যেক ধনী ব্যক্তি জাকাত দেয় তাহলে পৃথিবী থেকে দারিদ্রতা দূর হয়ে যাবে। তখন দেখবেন একজন মানুষও ক্ষুধায় মারা যাবে না। অতএব দারিদ্রতার ভয়ে মানুষ হত্যা করা যাবে না।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে যারা কম সন্তান নেয়ার কথা বলেন, তাদের জন্য আমার কথা হলো আমার পিতা-মাতার ৫ম সন্তান আমি। তারা যদি পরিবার পরিকল্পনা গ্রহন করতেন, তাহলে আমি এখানে আসতেই পারতাম না। আমি একজন মেডিকেল ডাক্তার। আর সমাজে সবচেয়ে’ ভালো পেশা হলো মেডিকেল ডাক্তারি। তাহলে বলুন, আমি সমাজের জন্য আশীর্বাদ? নাকি অভিশাপ?

এখন ডাক্তারি পেশা ছেড়ে তারচেয়ে’ ভালো পেশা তথা সত্য প্রচারের পেশায় এসেছি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তার কথার চেয়ে আর কার কথা উত্তম, যে মানুষকে ডাকে মহান আল্লাহর দিকে। আর বলে আমি তাদেরই একজন যে নিজের ইচ্ছাকে সমপর্ণ করে আল্লাহর কাছে।’

আমি স্বীকার করছি ডাক্তারি অনেক ভালো পেশা। কিন্তু দেহের ডাক্তারের চেয়ে আত্মার ডাক্তার হওয়া আমার কাছে আরও ভালো মনে হয়। দেহের ডাক্তার হলে আমার কথা শোনার জন্য আপনারা ১০ হাজার লোক এখানে আসতেন না। আত্মার কথা শোনার জন্যই আপনারা আমার কাছে এসেছেন। তাহলে আমি কি সমাজের জন্য আশির্বাদ, নাকি অভিশাপ?

অনেকে বলে থাকেন ‘কম সন্তান হলে ভালো শিক্ষা-দীক্ষা দেয়া যাবে!’ তাদের উদ্দেশ্যে বলব, নোবেল বিজয়ীদের দেখেন, তাদের কেউই পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান ছিলেন না। অনেকেই দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম সন্তান ছিলেন। তারা নোবেল বিজয়ী ছিলেন। মেধাবী ছিলেন। সুতরাং এটা ভুল ধারণা।

আমেরিকা জনসংখ্যাকে উৎসাহিত করে। তাদের বাচ্চাদের টিশার্টে লেখা থাকে- ‘আমি আমার বাবার টেক্স কমিয়ে দিচ্ছি।’ যত বেশি সন্তান, তত কম টেক্স। একই রকম কানাডাতে, অস্ট্রেলিয়াতে। কিন্তু ভারত তার বিপরীত। এখানকার স্লোগান হচ্ছে ‘আমরা দুজন, আমাদের দুজন। একটা পর এখন না, দুটোর পর কখনওই না।’  এটা ভারত সরকারের সমস্যা। চীনে সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা। এক্ষেত্রে ভারত দ্বিতীয়। আপনারা জানেন, ভবিষ্যতে সুপার পাওয়ার দেশ হবে কোন দুটি! এক চীন, দুই ভারত। আর এটা হবে জনসংখ্যার কল্যাণে। তাই বলবÑ আপনার দাদি-নানিই সঠিক ছিলেন। জনসংখ্যা যত বেশি হবে, দেশ তত উন্নত হবে।

ভারত চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে সমান তালে। অনেকে বলেন, ভারত পরবর্তী বিশ বছর পর মহাশক্তিধর রাষ্ট্র হবে। এখানে কিন্তু আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া বা কানাডার কথা বলা হয় না। তাই বলল, জনসংখ্যা দেশের জন্য আশির্বাদ, অভিশাপ নয়। আমরা সরকারকে বলতে পারি, ‘আইন পরিবর্তন করে জনসংখ্যাকে কাজে লাগান।’

আরেকটা বিষয় বলি। কিছু সমাজ আছে, যেমন গুজরাটের লোকজন, তারা অল্প বয়সে বিয়ে করে এবং দ্রুত সন্তান নেয়। তাদের বয়স যখন ৩৫ বা ৪০ বছর, তাদের সন্তানরা তখন ১৫/২০ বছর বয়সে বাবার ব্যবসা  দেখা-শোনা করতে পারছে। আর তারা ৪৫ বছরের মধ্যে অবসর নিতে পারে। ৬০ বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। যারা জীবন উপভোগ করতে চান, তাদের বলব, আগে বিয়ে করে দ্রুত সন্তান নিন। তারপর শেষ বয়সে জীবন উপভোগ করুন।

সবশেষে বলি, আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘তারা কৌশল আর ষড়যন্ত্র করে, আল্লাহও কৌশল করেন। আর আল্লাহ হলেন মহা কৌশলী।’ অতএব যদি মনে করেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহ ভালো পরিকল্পনা করতে পারেন, তাহলে তার কাছে সেটা ছেড়ে দিন।

০৫ জানুয়ারি, ২০১৬ ০৭:০৭:৩১