ইসলামে মা হিসেবে নারীর মর্যাদা
মাহমুদ আহমদ
অ+ অ-প্রিন্ট
ইসলামের আগে তৎকালীন সমাজে নারীর অধিকার বলেতে কোনো কিছুই ছিল না। উত্তরাধিকার, দেনমোহরের অধিকার কিংবা বিবাহ-তালাক, কোনো কিছুতে মতামত প্রদানেরও যেমন তাদের কোনো সুযোগ ছিল না, তদ্রƒপ তাদের কোনো অধিকারও স্বীকৃত হতো না। মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াত-পূর্ব জাহেলি সমাজে নারীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। এমনকি লোকজন তাদের কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দিত। এ প্রসঙ্গে গত পর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) একজন নারীকে মা হিসেবে যে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন, তার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া ইসলামে মা হিসেবে নারীকে যে উঁচু-মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া হয়েছে, অপর কোনো সম্মানের সঙ্গে তার তুলনাও হতে পারে না। নবী করিম (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘বেহেশত মায়ের পায়ের তলে অবস্থিত।’ অর্থাৎ মাকে যথাযোগ্য সম্মান দিলে, তার উপযুক্ত খিদমত করলে এবং তার হক আদায় করলে সন্তান বেহেশত লাভ করতে পারে। অন্য কথায়, সন্তানদের বেহেশত লাভ মায়ের খেদমতের ওপর নির্ভরশীল। মায়ের খেদমত না করলে কিংবা মায়ের প্রতি কোনোরূপ খারাপ ব্যবহার করলে, মাকে কষ্ট ও দুঃখ দিলে সন্তান যত ইবাদত-বন্দেগি আর নেক কাজই করুক না কেন, তার পক্ষে বেহেশত লাভ করা সম্ভবপর হবে না। 

শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পবিত্র কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী নারীদের মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দিয়েছেন। আল্লাহপাকের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কোরআনে বলা হচ্ছে, ‘পুরুষরা যা অর্জন করেছে, এতে তাদের অংশ রয়েছে। আর নারীরা যা অর্জন করেছে এতে তাদের অংশ রয়েছে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ চাও। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে পুরোপুরি অবগত’ (সুরা আন নেসা, আয়াত : ৩৩)। কর্মের ফলাফলের দিক থেকেও নারী-পুরুষের সমতাকে পবিত্র কোরআনের উল্লেখিত আয়াতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখানে কাউকে কম-বেশি বলে উল্লেখ করা হয়নি।  

পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের কোনো কর্মনিষ্ঠ ব্যক্তির কর্মকে বিনষ্ট করব না, তা সে পুরুষ হোক বা নারীই হোক। তোমরা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৯৬)। আবার বলা হয়েছে, ‘আর অবশ্যই আমি আদম সন্তানকে সম্মানে ভূষিত করেছি’ (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭১)। এ সম্মানে নারী-পুরুষ সমান অংশীদার। নারী-পুরুষে বা মানুষে-মানুষে সম্মানের পার্থক্যের কল্যাণ একমাত্র তাকওয়া বা আল্লাহকে মেনে চলা। যদি নারী পুরুষ অপেক্ষা অধিক মুত্তাকি হয়, তবে সে আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত। পুরুষ বলেই কেউ নারী থেকে অধিক সম্মানিত হয় না। সব আদম সন্তানকে আল্লাহতাআলা সমভাবে সম্মানিত করেছেন এবং কোনো বিশেষ জাতি বা গোত্রের প্রতি পক্ষপাতমূলক ব্যবহার করেননি। উপরোক্ত আয়াত ধর্ম, বর্ণ, বংশ সব ভেদাভেদ শেষ করে দিয়েছে।

ইসলামি শরিয়ত নারী-পুরুষ উভয়কেই সমান সামাজিক-মর্যাদা এবং অধিকার দিয়েছে। কোনো নারী যদি আশ্রয়হীন বা অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে, তাহলে সে তার জীবন-জীবিকার প্রয়োজন পূরণ এবং স্বীয় সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে হালাল উপায়ে কামাই-রোজগার করতে পারে। এ জন্য সব রকম বিধিসম্মত উপায়ও সে অবলম্বন করতে পারে। নারী পর্দা করে ব্যবসায়-বাণিজ্য এবং সম্পদ-সম্পত্তি থাকলে সেসবের ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও তদারকির জন্যও বাইরে যেতে পারে। 

ইসলাম নারীকে তার পিতা-মাতা, স্বামী ও অন্যান্য আত্মীয়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি লাভের অধিকারও দিয়েছে। নারী তার স্বামীর কাছ থেকে নির্ধারিত ও সম্মানসূচক অতিরিক্ত আর্থিক নিশ্চয়তাস্বরূপ মোহরানার অধিকারী। নারী বিয়ের আগে অভিভাবক ও বিয়ের পরে স্বামীর কাছ থেকে নিশ্চিতভাবে ভরণপোষণের অধিকারী। ব্যবসায়ে নিয়োজিত অর্থ, নিজ পরিশ্রমের অর্থ ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সব সম্পদে নারীর আইনগত মালিকানা স্বীকৃত। তালাকের ব্যাপারে স্বামীর যতটুকু অধিকার রয়েছে, স্ত্রীরও ঠিক ততটুকু অধিকার রয়েছে। স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে সব সময়ই বৈবাহিক-অধিকার দাবি করতে পারে। 

ইসলাম পুরুষের মতো নারীকেও সমানভাবে আধ্যাত্মিক উন্নতি-উৎকর্ষ সাধনের অধিকার দিয়েছে। ইসলামের বিধিবিধান পালন করা যেমন পুরুষের কর্তব্য, তেমনি নারীও যদি এ বিধিবিধান মেনে চলে, তবে ফল লাভের অধিকার সমান। আধ্যাত্মিক মর্যাদার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে কোনোরূপ পার্থক্য করা হয়নি। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা কি জান না, নারীরা পুরুষের চেয়ে অধিকতর পুরস্কৃত হওয়ার অধিকারী, কারণ নিশ্চয়ই সর্বশক্তিমান আল্লাহ সে পুরুষদের জন্য বেহেশত নসিব করবেন, যাদের স্ত্রীরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট ও তাদের জন্য দোয়া করে’ (সিয়াসিত্তা)।

পবিত্র কোরআন এবং মহানবী (সা.)-এর অসংখ্য হাদিস থেকে প্রমাণিত যে, নারী ও পুরুষ এক ও অভিন্ন জীবনসত্তা থেকে সৃষ্ট। সৃষ্টিগত দৃষ্টিকোণে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ বা বৈষম্য নেই। আবার ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশস্বরূপ। যেমনÑ মহান আল্লাহতাআলা বলেন, ‘তারা হলো তোমাদের পোশাক এবং তোমরা হলে তাদের পোশাকস্বরূপ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)। এই একটি আয়াতের মাধ্যমেই কতই না চমৎকারভাবে একটি মাত্র বাক্যে কোরআন স্ত্রী-লোকের অধিকার ও মর্যাদা বর্ণনা করেছে। বিভিন্ন সমাজ ও ধর্মে নারীর অবস্থানদৃষ্টে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো সভ্যতা ও ধর্মে নারীকে এরূপ সম্মান ও মর্যাদার আসনে সমাসীন করা হয়নি। তাই আসুন না, আমরাও নারীকে তাদের প্রাপ্য অধিকার প্রদান করি এবং তাদের সম্মানের দৃষ্টিতে দেখি।

 

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামনিস্ট

 

০৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ১২:২৩:৩৭