বৃদ্ধের কিশোরীকে বিয়ে নিয়ে আলোচনায় চাপে মালয়েশিয়া
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আরেকটি শিশু মেয়ের এক বৃদ্ধের সঙ্গ বিয়ে হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসার পর বাল্য বিয়ে বন্ধের জন্য মালয়েশিয়া সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের চাপ বেড়েছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত কেলানতান প্রদেশে ৪৪ বছরের এক মুসলমানের দ্বিতীয় বিয়েতে ১৫ বছরের এক কিশোরী কন্যা হওয়ার খবর দিয়েছে নিউ স্ট্রেইটস টাইমস পত্রিকা৷ তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, দারিদ্র্যের কারণে মেয়েটির বাবা-মা সম্মতি দেওয়ার পর গত জুলাইয়ে ইসলামি শরিয়া আদালতে এই বিয়ে অনুমোদিত হয়৷ কেলানতান প্রদেশেই এক রাবার ব্যবসায়ী তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে ১১ বছরের একটি মেয়েকে বিয়ে করেছেন যে মাসে, সেই মাসেই বিতর্কিত এই বিয়ে হয়েছে৷ তবে ঘটনাটি প্রকাশ পেয়েছে চলতি সপ্তাহে৷ মালয়েশিয়ায় শরিয়া আদালত ও অভিভাবকের সম্মতিতে বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছরের কম বয়সি মেয়েদেরও বিয়ের বৈধতা রয়েছে৷ আর মুসলমানরা চারটি পর্যন্ত বিয়ে করতে পারে৷

অসম বিয়ের নতুন খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা গ্রুপগুলো আবারও সোচ্চার হয়েছে৷ ইউনিসেফ এক বিবৃতিতে এই বিয়েকে ‘অগ্রহণযোগ্য' আখ্যায়িত করে এ ধরনের বিয়ে বন্ধে আইনি পরিবর্তন আনতে মালয়েশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে৷ মালয়েশিয়ায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি মারিয়ানে ক্লার্ক-হাটিং বলেন, ‘‘বাল্য বিয়ে নিয়ে নতুন আইন করতে হবে, যাতে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রবেশ বাধ্যতামূলক, প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও দারিদ্র্য বিমোচনের মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে৷'' মেয়েটির বাবা-মার বরাত দিয়ে নিউ স্ট্রেইটস টাইমস লিখেছে, ১৩ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ও লেখাপড়া বন্ধ হওয়া মেয়ের ‘ভালো ভবিষ্যতের' জন্য তারা এই বিয়ে দিয়েছেন৷

একইভাবে কেলানতানে বাবা-মার সঙ্গে থাকা ১১ বছরের ওই থাই মেয়েটিরও লেখাপড়া বন্ধ হয়েছিল, তার পরিবারও দরিদ্র৷ দুই বউ এবং ৫ থেকে ১৮ বছর বয়সি ছয় সন্তানের বাবা ৪১ বছর বয়সি রাবার ব্যবসায়ী থাইল্যান্ডে গিয়ে গোপনে মেয়েটিকে বিয়ে করেন৷ তার এক বউ বিষয়টি নিয়ে পুলিশে অভিযোগ করলে এই বিয়ের খবর প্রকাশ হয়৷ পরে অনুমতি না নেওয়ার জন্য ওই ব্যক্তিকে জরিমানা করে শরিয়া আদালত৷ তবে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে বিয়ে করার জন্য তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি৷

তিনি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, পাঁচ বছর পর তার নতুন স্ত্রীর বয়স ১৬ বছর হলে বিয়ের সনদের আবেদনের মাধ্যমে তিনি এই বিয়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করবেন৷ ওই মেয়েটিকে থাইল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং তাকে একটি সেবাকেন্দ্রে রাখা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে৷ মালয়েশিয়ার উপ প্রধানমন্ত্রী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল বলেছেন, সর্বশেষ প্রকাশিত ঘটনাটি তারা তদন্ত করে দেখছেন৷ তবে এই বিয়ে শরিয়া আদালতে অনুমোদিত হওয়ায় তাদের হাত-পা বাঁধা৷ 

তিনি বলেন, মুসলিম মেয়েদের ন্যূনতম বিয়ের বয়স বাড়িয়ে ১৮ বছর করতে চাইছে সরকার৷ মালয়েশিয়ায় দুই ধরনের বিচার ব্যবস্থা রয়েছে৷ দেশটির তিন কোটি ১০ লাখ নাগরিকের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মুসলিম, যাদের পারিবারিক, বিয়ে ও ব্যক্তিগত নানা বিষয়ের ফায়সালা ইসলামি আদালতের মাধ্যমে হয়ে থাকে৷

মানবাধিকার সংগঠন লইয়ারস ফর লিবার্টি সর্বশেষ ঘটনায় ৪৪ বছরের ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মেয়েটিকে ‘যৌনতায় প্ররোচিত' করার ঘটনা ঘটেছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে৷ বিয়ের কয়েক মাস আগে থেকে মেয়েটি তার পরিচিত থাকার বিষয়টি জানতে পেরে এই সন্দেহ করছে তারা৷

সংগঠনটি বলছে, শিশুকে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থেকে বাঁচতে এখন এ ধরনের বিয়ের সুযোগকে কাজে লাগানো হচ্ছে৷ সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক লাথিফা কোয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘‘এটা দেশের শিশুদের, বিশেষ করে মুসলিম শিশুদের যৌন বিকৃতিমনা ও শিশু নিপীড়কদের কাছে অসহায় করে তুলছে,''

মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কমিশন বলছে, আইনের সুযোগ নিয়ে অভিভাবকরা এখন বিয়ের ছদ্মবেশে তাদের শিশু সন্তানকে ‘বিক্রি করতে পারছে'-বিষয়টি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন৷  কমিশনের চেয়ারম্যান রাজালি ইসমাইল বলেন, ‘‘এখন দেখা যাচ্ছে, শরিয়া আদালতের কাছে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে বিয়ের অনুমতির ক্ষেত্রে দারিদ্র্যও একটি কারণ হিসেবে গৃহীত হচ্ছে৷ এখানে শিশুদের একটি পণ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে৷''

দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সামাজিক সুরক্ষার পাশাপাশি আইন করে বাল্য বিয়ে বন্ধের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি৷ সরকারি ভাষ্যমতে, গত ১০ বছরে দেশে ১৫ হাজার বাল্য বিয়ে হয়েছে, যার দুই তৃতীয়াংশই হয়েছে মুসলমানদের মধ্যে৷ -ডয়েচেভেলে

 

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০৬:৩০:৪৫