লিভার সিরোসিসের লক্ষণ ও চিকিৎসা
ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল
অ+ অ-প্রিন্ট
লিভার সিরোসিস-আৎকে ওঠার মতো একটি রোগের নাম । সিরোসিস শুনলেই যেন মনে আসে আরেকটি আরো ভয়াবহ রোগের নাম, ‘লিভার ক্যান্সার’। সিরোসিস আর ক্যান্সার সাধারণ মানুষের কাছে একে অপরের সমার্থক। অথচ ব্যাপারটি কিন্তু ঠিক তা নয় । 

সিরোসিস কি?

সিরোসিস লিভারের একটি  ক্রনিক রোগ যাতে লিভারের সাধারণ আর্কিটেকচার নষ্ট হয়ে যায় । ফলে লিভার হারায় তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা। অনেক ক্ষেত্রেই লিভার সিরোসিস থেকে লিভারে ক্যান্সারও দেখা দিতে পারে। তবে এসব কোন কিছুই হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোকের মতো সহসা ঘটে না। সিরোসিস আক্রান্ত রোগী বহু বছর পর্যন্ত কোনো রকম রোগের লক্ষণ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন । ব্যাপারটা অনেকটা এরকম- ধরা যাক আমাদের লিভারটা একটা আধুনিক এপার্টমেন্ট যাতে সব আধুনিক সুযোগ সুবিধাই বিদ্যমান। এই এপার্টমেন্টের একটি কল নষ্ট থাকতে পারে কিংবা নষ্ট থাকতে পারে পুরো পানির সাপ্লাই লাইন অথবা আরো বেশী কিছু। ঠিক একইভাবে সিরোসিসেও লিভারে সামান্য কোন সমস্যা দেখা দিতে পারে কিংবা সমস্যাটি হতে পারে অনেক বড় কিছু । একটা পানির কল নষ্ট হলে যেমন এপার্টমেন্টের অধিবাসীদের কোন সমস্যা হয় না তেমনি কম্পেনসেটেড বা আর্লি সিরোসিসেও রোগাক্রান্ত ব্যক্তির কোন অসুবিধা হয় না বললেই চলে। রোগের লক্ষণ আর কষ্টগুলো দেখা দেয় ডিকম্পেনসেটেড বা এ্যডভান্সড সিরোসিসে যখন ঐ এপার্টমেন্টটির নষ্ট পানি সরবারহ লাইটির মতো লিভারেও বড় ধরনের গোলযোগ দেখা দেয় । 

সিরোসিসের লক্ষণ কি?

আগেই যেমনটি বলেছি কম্পেনসেটেড সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তির তেমন কোন লক্ষণ থাকে না বললেই চলে। অনেক সময় রোগীরা দুর্বলতা, সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, দাতের মাড়ি বা নাক থেকে রক্ত পড়া, পেটের ডান পাশে ব্যাথা, জ্বর-জ্বর ভাব, ঘন-ঘন পেট খারাপ হওয়া ইত্যাদি সমস্যা অনুভব করতে পারেন । এডভান্সড সিরোসিসে চিত্রটি কিন্তু একদম বদলে যায়। এসময় পায়ে-পেটে পানি আসে, জন্ডিস হয় এবং রোগী এমনকি অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারেন। রক্তবমি ও পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া, ফুসফুসে পানি আসা, কিডনি ফেইলিউর, শরীরের যে কোন জায়গা থেকে আনকন্ট্রোলড বিøডিং ইত্যাদি দেখা দিতে পারে । আর সব চেয়ে যা ভয়াবহ তা হলো, লিভারে দেখা দিতে পারে ক্যান্সার। 

সিরোসিস কেন হয়?

এই তালিকাটি অনেক বড় এবং দেশভেদে সিরোসিসের কারণগুলোও বিভিন্ন। ইউরোপ ও আমেরিকায় সিরোসিসের প্রধান কারণ এ্যালকোহল আর হেপাটাইটিস সি ভাইরাস। বাংলাদেশে প্রায় আড়াই হাজার রোগীর উপর জরীপ চালিয়ে আমরা দেখতে পেয়েছি যে, এদেশে লিভার সিরোসিসের প্রধাণ কারণ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, আর এর ঠিক পরেই রয়েছে ফ্যাটি লিভার। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস ও এ্যালকোহলের স্থান বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ও ফ্যাটি লিভারের অনেক পরে।

ফ্যাটি লিভার নানা করাণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিস, ডিজলিপিডেমিয়া (রক্তে চর্বি বেশী থাকা ), ওবেসিটি (মেদ-ভুড়ি), উচ্চরক্ত চাপ আর হাইপোথাইরয়ডিজম ফ্যাটি লিভারের প্রধাণ কারণ। পাশ্চাত্যে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত প্রায় ৩০ শতাংশ রোগী পরবর্তীতে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন। এদেশেও আমরা ফ্যাটি লিভার জনিত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের রোগী পেয়ে থাকি। অতএব সাবধান!

সিরোসিস হলে কি  করবেন?

সিরোসিসে আক্রান্ত যে কোন ব্যাক্তির উচিত দ্রæত লিভার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নেয়া ও নিয়মিত ফলোআপে থাকা। এতে দীর্ঘদিন ভালো থাকা যায়। পাশাপাশি সিরোসিসের কারণ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা করা গেলে লিভারের খারাপের দিকে যাওয়ার ঝুকিও অনেক কমে যায়। লিভার সিরোসিস ও এর কারণগুলোর আধুনিকতম চিকিৎসা আজ এদেশেই সম্ভব। দেশেই তৈরী হচ্ছে অধিকাংশ ওষুধও। এদেশে যা নেই তা হলো লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের ব্যবস্থা। প্রতিবেশী দু-একটি দেশে এ সুযোগ থাকলেও তা খুবই ব্যয়বহুল আর সঙ্গত কারণেই আমাদের সিংহভাগ রোগীর সাধ্যের অতীত। সেদিন হয়তো আর বেশী দুরে নয় যেদি এদেশেই অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন সম্ভব হবে।

শেষ কথা

রাজনীতির মতো লিভার সিরোসিসেও শেষ কথা বলে কিছু নেই। প্রয়োজন প্রাথমিক পর্যায়ে সিরোসিসের রোগীকে শনাক্ত করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। যেহেতু আর্লি সিরোসিসে তেমন কোন লক্ষণ থাকে না বললেই চলে, তাই রোগী আর চিকিৎসক উভয়ের সচেতনতাটা এক্ষেত্রে খুবই জরুরী।  

 লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হেপাটোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

২১ জুলাই, ২০১৮ ১২:৫৯:১৩