রোজায় ডায়াবেটিস রোগীদের করণীয়
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রত্যেক মুসলমান রোজা রাখবেন এটাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে অনেকেই আছেন যারা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। ডায়াবেটিস হলে রোগী রোজা রাখতে পারবেন না একথা মোটেই ঠিক নয়। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও ইসলামী আলেমগণ রোজা রাখার পক্ষেই মত দিয়েছেন। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিত্সকের সাথে পরামর্শ করে রোজা রাখতে হবে।

ডায়াবেটিস রোগে অনেক ধরনের জটিলতা হতে পারে। যেহেতু একজন রোজাদারকে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকতে হয়, তাই তাদের জটিলতার আশঙ্কা আরো বেশি। রোজার সময় ডায়াবেটিস রোগীদের যে সমস্ত জটিলতা হতে পারে তা হল— রক্তের সুগার অতিরিক্ত কমে যাওয়া (হাইপোগ্লাইসিমিয়া), সুগার অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া (হাইপারগ্লাইসিমিয়া), পানি শূন্যতা এবং ডায়াবেটিক কিটো এসিডোসিস।

অনেকক্ষণ খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকলে রক্তে সুগারের মাত্রা কমে যেতে পারে, তাকে বলে হাইপোগ্লাইসিমিয়া। বিশেষ করে যারা সালফোনাইলইউরিয়া জাতীয় ওষুধ খান, ইনসুলিন নেন, সেহেরী খান না বা খুব কম খান অথবা রোজা রেখে অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন তাদের এই ঝুঁকিটা বেশি। হাইপোগ্লাইসেমিয়া বোঝার উপায় হল- বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ঘাম দেয়া, মাথা ঘোরা, শরীর কাঁপা, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি। এতে রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে সম্ভব হলে সাথে সাথে রক্তের সুগারের পরিমাণ পরীক্ষা করে দেখা উচিত। সুগারের পরিমাণ ৩ বা এর নিচে হলে রোজা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। সাথে সাথে গ্লুকোজ বা চিনির সরবত বা যেকোন খাবার খেয়ে নিতে হবে।

রক্তের সুগার কখনও কখনও অতিরিক্ত বেড়ে যেতে পারে, তাকে বলে হাইপারগ্লাইসিমিয়া। এর লক্ষণ হল জিহবা শুকিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, পানি শূন্যতা, দুর্বলতা, ঝিমুনি, বমি ইত্যাদি। এক্ষেত্রে সাথে সাথে রক্তের সুগার পরীক্ষা করতে হবে এবং এর পরিমাণ বেশি হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন নিতে হবে। রোজা অবস্থায় ইনসুলিন ইনজেকশন নিলে রোজা নষ্ট হবে না বলে অনেক ইসলামী চিন্তাবিদের অভিমত। 

শরীরের পানি শূন্যতা দূর করার উপায় হল রাতের বেলা পানি বেশি বেশি পান করা। তারপরও যদি রোজা রাখা অবস্থায় পানি শূন্যতা বেশি হয়, যেমন জিহবা অতিরিক্ত শুষ্ক হওয়া, বেশি বেশি মাথা ঘোরানো, প্রস্রাবের পরিমাণ অতিরিক্ত কম ইত্যাদি কোন লক্ষণ দেখা যায়, সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে রোজা ভাঙ্গতে হবে।

যারা শুধুমাত্র খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তাদের জন্য রোজা হল সুবর্ণ সুযোগ। রোজা তাদের জন্য কোন জটিলতা সৃষ্টি করে না বরং রোগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। রোজায় দিনের বেলা খাওয়া থেকে বিরত থাকা ও ইফতার এবং সেহেরিতে সময় পরিমিত আহারের অভ্যাস যে কোন ডায়াবেটিস রোগীকে সংযম ও শৃংখলার শিক্ষা দেয়, যা ডায়াবেটিস চিকিত্সার মূল উপাদান। এর মাধ্যমে রোগী তার রক্তের সুগার এবং চর্বির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারেন, বাড়তি ওজন ঝেড়ে ফেলতে পারেন।

অনেকে রোজার সময় অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করেন, অনেকে আবার খুবই অল্প খাবার খান। মনে রাখতে হবে, ডায়াবেটিস রোগীর জন্য দুটিই ক্ষতিকর। এক্ষেত্রে নিচের পরামর্শসমূহ মেনে চলা যেতে পারে: সেহেরীর খাবার সেহেরীর শেষ সময়ে খাওয়া। ইফতারের সময় বেশি বেশি চর্বিযুক্ত বা মিষ্টি জাতীয় খাবার না খাওয়া। ভাজা-পোড়া খাবার অল্প পরিমাণে খাওয়া। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও অন্যান্য তরল গ্রহণ করা। খাদ্যের ক্যালরি ঠিক রাখা এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং ইফতারে অতিভোজন ও সেহেরীতে অল্প আহার পরিহার করা।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে মুখে ওষুধ খাবার প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে যারা মেটফরমিন, গ্লিটাজোন অথবা ইনক্রিটিন জাতীয় ওষুধ খেয়ে থাকেন, তাদের হাইপোগ্লাইসেমিয়া হবার ঝুঁকি অনেক কম। তবে সালফোনাইলইউরিয়া জাতীয় ওষুধ অথবা ইনসুলিন রক্তের সুগারের মাত্রা অতিরিক্ত কমিয়ে দিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া করতে পারে। তাই এসব ওষুধ গ্রহণকারী রোগীর উচিত রমজানের পূর্বেই চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রাখা।

রোজায় ডায়াবেটিক রোগীর ওষুধের কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। সাধারণত যেসব পরিবর্তন করা হয় তা হল যারা তিনবার ওষুধ খান তাদের বেলায় বেশি মাত্রা ইফতারের সময় খাবেন এবং কম মাত্রাটুকু সেহেরীর সময় খাবেন। যদি দিনে দুইবার খেতে হয় তবে সকালের মাত্রাটি ইফতারের শুরুতে এবং রাতের মাত্রাটি অর্ধেক পরিমাণে সেহেরীর সময় খাবেন। যারা ইনসুলিন গ্রহণ করেন তারা রোজায় দীর্ঘ মেয়াদি ইনসুলিন ব্যবহার করতে পারেন, এতে হাইপোগ্লাইসিমিয়ার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত কম। এই ইনসুলিন ইফতারের সময় নিতে হবে এবং প্রয়োজনে শেষ রাতে অল্প মাত্রায় নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞ ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমদের মতামত অনুযায়ী রোজা রাখা অবস্থায় রক্ত পরীক্ষা করা, এমনকি প্রয়োজনে ইনসুলিন ইনজেকশন নেয়া যাবে, এতে রোজার কোন সমস্যা হবে না। তাই সম্ভাব্য জটিলতা এড়ানোর জন্য ডায়াবেটিস রোগীর উচিত সেহেরীর ২ ঘন্টা পর এবং ইফতারের ১ ঘন্টা আগে রক্তের সুগার পরীক্ষা করা। এছাড়া দিনের বেলায় অধিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকা উচিত। ইফতার বা রাতের খাবারের ১ ঘন্টা পর ব্যায়াম করা যেতে পারে।

২৬ মে, ২০১৮ ০০:৪৩:২৫