রমজানে ডায়াবেটিস রোগীর সতর্কতা
ডা. তানজিনা হোসেন
অ+ অ-প্রিন্ট
বিশ্বে প্রায় ৫০ মিলিয়নের বেশি ডায়াবেটিস রোগী প্রতিবছর রমজান মাসে রোজা করে থাকেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে বছরে এই এক মাস সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপোস করা একটি পবিত্র আবশ্যিক কাজ। কিন্তু নতুন পুরাতন ডায়াবেটিস রোগীরা এই রোজা পালন করতে গিয়ে নানা বিভ্রান্তি ও প্রশ্নের সম্মুখীন হন। যেমন_ এক. ডায়াবেটিস রোগীরা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকতে পারবেন কিনা, দুই. রোজার দিনে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন কিভাবে দেয়া যাবে, তিন. রোজার সময় গ্লুকোমিটার যন্ত্র দিয়ে রক্তের শর্করা মাপলে রোজা ভেঙে যাবে কিনা, চার, রোজা রেখে ব্যায়াম করা যাবে কিনা ইত্যাদি নানা প্রশ্ন ওঠে এই সময়। আজ আমরা সেসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব।

রোজা কি ঝুঁকিপূর্ণ?

বড় ধরনের সমস্যা বা ঝুঁকি না থাকলে একজন ডায়াবেটিস রোগী আর সবার মতোই রোজা করতে পারবেন। গবেষকরা কয়েক ধরনের ডায়াবেটিস রোগীর জন্য রোজা রাখা 'অতি ঝুঁকিপূর্ণ' বলে বিবেচনা করে থাকেন। এরা হলেন_ টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগী, গর্ভবতী ডায়াবেটিস, যারা দিনে তিন বা চারবার ইনসুলিন গ্রহণ করেন, যাদের সাম্প্রতিক সময়ে মারাত্মক হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে শর্করা স্বল্পতা) বা মারাত্মক হাইপারগ্লাইসেমিয়া কোমা (রক্তে শর্করা আধিক্যজনিত কোমা) হয়েছে, যারা হাইপোগ্লাইসেমিয়া সম্পর্কে সচেতন নন, ডায়াবেটিসের সঙ্গে অন্যান্য জটিলতা যেমন কিডনি, যকৃত, হৃদযন্ত্রের জটিলতা রয়েছে বা ডায়ালাইসিস করছেন ইত্যাদি। এছাড়া ইনসুলিন ও সালফোনিলইউরিয়া ওষুধ ব্যবহারকারীরা ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় পড়েন। তবে 'অতি ঝুঁকিপূর্ণ' বাদে বাকিরা সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বন করলে রমজান মাসে রোজা রেখেও ভালো থাকতে পারেন।

খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামে পরিবর্তন

রমজান মাসে আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও খাবার সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। যেহেতু ডায়াবেটিস রোগীরা একটি সুনিয়ন্ত্রিত ও সঠিক সময়সূচির খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেন, তাই তাদের এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের বেলায় যে যে বিষয়গুলো লক্ষ্য করা উচিত তা হলো-

১. দৈনন্দিন ক্যালরির পরিমাপ আগের মতোই থাকবে, কেবল সময়সূচি বা উপাদান পরিবর্তিত হতে পারে।

২. শেষরাতে সেহরি খাওয়া আবশ্যিক ও তা গ্রহণ করতে হবে যথাসম্ভব দেরি করে। সেহরিতে জটিল শর্করাসহ সব ধরনের উপাদান রাখতে হবে কেননা এই খাবারই দিনভর শক্তি জোগাবে।

৩. ইফতারে একসঙ্গে প্রচুর খাবার না খেয়ে ধাপে ধাপে খান। মিষ্টি জাতীয় ও ভাজা-পোড়া তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন। যেমন কাঁচা বা সেদ্ধ ছোলার সঙ্গে শশা টমেটোর সালাদ, চিঁড়া-টকদই, ঘুগনি বা চটপটি, স্যুপ, ফল ইত্যাদি। শরবতের বদলে ডাবের পানি বা লেবুর পানি। একটি কি দুটি খেজুর খাওয়া যেতে পারে। 

৪. ইফতার ও সেহরির মধ্যে নৈশভোজে রুটি বা অল্প ভাত খাওয়া যেতে পারে।

রমজান মাসে রোজা রেখে দিনের বেলা বেশি ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম না করাই ভালো। সন্ধ্যের পর চাইলে কেউ হাটাহাটি করতে পারেন। তারাবির নামাজ পড়লে অতিরিক্ত ব্যায়াম না করলেও চলে।

কী কী সমস্যা হতে পারে?

রোজা রাখার কারণে কমপক্ষে চার ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে একজন ডায়াবেটিস রোগীর। ১. রক্তে হঠাৎ শর্করাস্বল্পতা বা হাইপোগ্লাইসেমিয়া, ২. রক্তে শর্করা আধিক্য বা হাইপারগ্লাইসেমিয়া, ৩. কিটোনিউরিয়া বা প্রস্রাবের সঙ্গে কিটোন নির্গত হওয়া এবং ৪. পানিশূন্যতা। এই ঝুঁকিগুলো এড়াতে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে:

-রোজা রেখে মাঝেমধ্যে বিশেষ করে প্রথম কয়েক দিন দিনের বেলা গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তের শর্করা পরিমাপ করুন। বিশ্বের বড় বড় আলেমরা ফতোয়া দিয়েছেন যে গ্লুকোমিটারে রক্ত পরীক্ষায় রোজা ভাঙে না। ইফতারের এক ঘণ্টা আগে ও দুই ঘণ্টা পর এবং মাঝেমধ্যে দুপুরবেলা রক্তে শর্করা দেখুন। দিনের বেলা কখনো রক্তে শর্করা ৪ মিলিমোলের কম বা ১৬.৭ মিলিমোলের বেশি হয়ে গেলে রোজা ভাঙতে হবে।

-সন্ধ্যার পর একসঙ্গে অনেক খাবার ও সহজ শর্করা বা চিনি মিষ্টি জাতীয় খাবার খাবেন না। এতে হঠাৎ করে শর্করা বেড়ে যেতে পারে।

-পানিশূন্যতা এড়াতে সন্ধ্যার পর বেশি করে পানি, ডাবের পানি, জলীয় অংশ বেশি এমন খাবার গ্রহণ করুন।

-রমজানে আপনার ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা ও সময়সূচি সম্পর্কে রোজার আগেই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।

ওষুধ বা ইনসুলিন

রোজার মাসে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিনের মাত্রা ও সময়সূচিতেও পরিবর্তন আসবে। নতুন খাদ্যসূচির সঙ্গে মিলিয়ে এই পরিবর্তন করা হয়। 

-যারা মেটফরমিন, গি্লনাইড, ডিপিপি ৪ ইনহিবিটর গোত্রের ওষুধ খান, তাদের তেমন কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। কেবল ওষুধের সময়টাকে পাল্টে নিন।

-যারা সালফোনিল ইউরিয়া গোত্রের ওষুধ যেমন গ্লিক্লাজাইড, গ্লিবেনক্লেমাইড, গি্লমেপেরোইড ইত্যাদি ওষুধ খান তারা সকালের ডোজ পূর্ণমাত্রায় ইফতারে এবং রাতের ডোজ অর্ধেক মাত্রায় শেষ রাতে গ্রহণ করতে পারেন। 

-যারা দুইবেলা ইনসুলিন নেন, তারাও সকালের ডোজ পূর্ণমাত্রায় ইফতারে এবং রাতের ডোজ অর্ধেক মাত্রায় সেহরিতে গ্রহণ করতে পারেন। 

-যারা আধুনিক বেসাল-বোলাস ইনসুলিন গ্রহণ করেন, তারা বেসাল বা দীর্ঘ সময় কার্যকর ইনসুলিন আগের মাত্রায় আগের সময়ে (যেমন রাত ১০টায়) গ্রহণ করবেন। আর বোলাস বা দ্রুত কার্যকর ইনসুলিন গ্রহণ করবেন ইফতারে, নৈশভোজে ও অর্ধেক মাত্রায় সেহরিতে। নৈশভোজ গ্রহণ না করলে ওই সময় ইনসুলিন না নিলেও চলবে।

-চিরায়ত বা কনভেনশনাল ইনসুলিনের তুলনায় আধুনিক অ্যানালগ ইনসুলিন যেমন_ ডেটেমির, ডেগলুডেক, গ্লারজিন, লিসপ্রো, অ্যাসপার্ট বা গ্লুলাইসিন জাতীয় ইনসুলিনে শর্করা স্বল্পতা হওয়ার ঝুঁকি কম। তাই সম্ভব হলে পুরাতন ইনসুলিন পাল্টে আধুনিক ইনসুলিন গ্রহণ করুন।

-ওষুধের মাত্রার এই পরিবর্তন অনেকটাই রমজানে আপনার রক্তে শর্করার পরিমাণ ওঠা-নামার ওপর নির্ভর করবে। তাই মাঝেমধ্যে রক্তে শর্করা পরিমাপ করুন ও চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিন।

ডা. তানজিনা হোসেন

হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ 

বারডেম হাসপাতাল 

চেম্বার-গ্রিনলাইফ হসপিটাল লিঃ 

৩২ বীর উত্তম কেএম সফি উল্লাহ সড়ক (গ্রিন রোড)

২৯ মে, ২০১৭ ১০:১৯:৪৯