যেসব খাবার ক্যান্সারের প্রবণতা বাড়ায়
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
শরীরের অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন সংক্রান্ত রোগগুলোর সমষ্টি হলো ক্যান্সার। যা বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী মরণব্যাধি হিসেবেই পরিচিতি। মানবদেহে বিভিন্ন ধরনের শ'খানেকের বেশি ক্যান্সার হতে পারে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এসব ক্যান্সারের চিকিৎসা পদ্ধতিও আলাদা। ঠিক কি কারণে ক্যান্সার হয় তা এখনও নিশ্চিত করে বলা না গেলেও সাধারণ কিছ‍ু কারণ খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা। এরমধ্যে বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

১। মাইক্রোওয়েভ পপকর্ন: ভুট্টার তৈরি খই পপকর্ন যে কখনও মরণব্যাধি ক্যান্সারের কারণ হতে পারে তা কোনোদিন হয়তো কল্পনাই করেননি কেউ। কিন্তু সত্য হলো এই পপকর্ন স্বাস্থ্যের জন্য বেশ বিপজ্জনক হতে পারে। প্রথমে বলা যেতে পারে পপকর্ন রাখা প্যাকেট বা ব্যাগের কথা। এই ব্যাগে থাকা বিষাক্ত পারফ্লোরো অক্টানয়িক অ্যাসিড মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

২। নন-অর্গ্যানিক ফল: বিভিন্ন ধরনের নন-অর্গ্যানিক ফল-ফলাদিতে বিশেষ করে ‍অ্যার্টাজিন, থায়োডিকার্ব এবং অর্গানাপসফেটসে উচ্চ নাইট্রোজেন থাকে। কীটনাশক বা রাসায়নিক সার হিসেবে ব্যবহার হওয়া ইউরিয়াও খাদ্যে প্রয়োগ করা হয়। যেগুলো ক্যান্সারের মতো রোগের কারণ হতে পারে। এছাড়া নীরব ঘাতক নন-অর্গানিক বা অজৈব ফল প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে ফেলে।

৩। রেডিমেড খাবার: বাস্তবিক অর্থে বেশির ভাগ টিনজাত খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি হতে পারে। এসব খাদ্য বিশপেনল-এ বা বিপিএ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। রেডিমেড টমেটো বা টিনজাত বা প্যাকেটজাত টমেটোও এর আওতায় রয়েছে। ২০১৩ সালে জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমির এক গবেষণায় দেখা যায়, বিপিএ শরীরে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। যা ব্রেনেও প্রভাব ফেলে। টমেটোর অধিক অম্লতাও খুব বিপজ্জনক!

৪। প্রক্রিয়াজাতকরণ মাংস: মাংস প্রক্রিয়াকরণে কী থাকে? দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থ মেশানো হয়ে থাকে মাংসে। এরমধ্যে হট ডগ, বেকনসহ বিভিন্ন ধরনের লাঞ্চের মাংস রয়েছে। যা কেমিক্যাল মিশ্রিত থাকে। এসব খাদ্য ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করতে পারে।

৫। চাষ করা স্যামন: মাছ স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। কিন্তু যতটা সম্ভব এই মাছটি ত্যাগ করা উচিত। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ ভাগেরও বেশি চাষের স্যামনের ভোক্তা রয়েছে।চাষের এই মাছকে কৃত্রিম খাদ্য ও রাসায়নিক, জীবাণুমুক্ত, কীটনাশক এবং অন্যান্য খাদ্য দেওয়া হয়। যা ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। যদিও এই মাছে স্বাস্থ্য ও মস্তিস্কের জন্য উপকারী ওমেগা-৩ রয়েছে, তবু চাষের ক্ষেত্রে তা পরিপূর্ণ থাকে না।

৬। পটেটো চিপস: হ্যাঁ, পটেটো চিপস খুবই রুচিকর একটি খাদ্য। মজাদার, সস্তা, জলখাবার হিসেবে এর জুড়ি নেই। তবে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এই জলখাবার নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পটেটো চিপসে থাকা উচ্চ ক্যালরি শরীরের ওজন বৃদ্ধি করে। ইংল্যান্ডের চিকিৎসা জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওজন বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি আলুর চিপস যথেষ্ঠ। এছাড়া রক্তচাপ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এটা দায়ী।

৭। হাইড্রোজেনেটেড অয়েল: প্রথমে উদ্ভিজ্জ তেল দিয়েই শুরু করা যাক। উদ্ভিজ তেল তার উৎসের কেমিক্যাল বাদ দিতে পারে না। যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। সব ধরনের উদ্ভিজ্জ তেলেই উচ্চ মাত্রার ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড থাকে। ওমেগা-৬ স্বাস্থ্যের জন্য নানা-সমস্যা ও রোগসহ নানা ধরনের ক্যান্সার বাড়ায়। বিশেষ করে ত্বক ক্যান্সার সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। এই তেল শরীরের সেল গঠনে প্রভাব ফেলে, যা ক্যান্সারের সাথে সম্পৃক্ত।

৮। খাদ্যে উচ্চ লবণাক্ততা বা স্মোকিং ফুড: খাদ্য সংরক্ষণে নাইট্রেট বা নাইট্রেস ব্যবহার করা হয়। এছাড়া মাংসের রঙের ক্ষেত্রেও এটি ব্যবহৃত হয়। তবে এটা ক্যান্সারের কারণ হয় না। ধূমপান ও নন-নাইটেসো সমৃদ্ধ খাবারের কেমিক্যাল ক্যান্সারে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পুড়িয়ে অথবা ভেজে তৈরি করা খাবার মাংসের কাবাব কিংবা বাদাম স্মোকিং ফুড হিসেবে পরিচিত। মাংসের তৈরি খাবার যেমন বেকন, সস, বোলোগনা এবং সালামিতে প্রচুর চর্বি ও লবণ থাকে। আচারেও অধিক পরিমাণে লবণ রয়েছে। এসব খাবার কলোরেক্টাল ক্যান্সার এবং পেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

৯। প্রক্রিয়াজাত সাদা আটা: অ‍াটা শর্করা জাতীয় খাবার। যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ সাদা আটা খুবই অপকারী। রিফাইনের ফলে এই আটা তার সাধারণ পুষ্টিগুণাগুণ হারিয়ে ফেলে। আটার মিলগুলো তা সংরক্ষণের জন্য বর্তমানে কেমিক্যাল ব্যবহার করছে যা খুব ক্ষতিকর।

১০। পরিশোধিত চিনি: পরিশোধিত চিনির ঝুঁকি বিস্তর। এই চিনি স্থূলতার জন্য দায়ী। যুক্তরাজ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন সমস্যায় ভুগছে। পরিশোধিত চিনি নানা ধরনের স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছাড়াও এর দ্বারা নানা খাদ্য ক্যান্সার সেলের জন্ম দিচ্ছে। চিনির তৈরি বিভিন্ন পানীয়ও শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

১১। কৃত্রিম চিনি: অনেকে ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগী খাবারে চিনির বিকল্প হিসেবে আর্টিফিসিয়াল সুইটেনার্স বা কৃত্রিম চিনি খান। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, এই কৃত্রিম চিনি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় সোডা ও কফি সুইটেনার্স। বাস্তবিক অর্থে এ কৃত্রিম চিনি রক্তে সুগার নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব ফেলে। এতে ডায়েবেটিস বৃদ্ধিসহ ক্যান্সারও হতে পারে।

১২। অ্যালকোহল: অতিমাত্রায় মদ্যপানের কারণে মানুষের ত্বকের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। যুক্তরাজ্যের এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানান, মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন করলে শরীরে এমন এক ধরনের প্রবণতা সৃষ্টি হয়, যা মানবদেহ সূর্যের সংস্পর্শে এলে ত্বকের ওপর অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

তারা বলেন, ইথানল মানবদেহে প্রবেশ করে এক ধরনের তেজষ্ক্রিয়তা বা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে যা ত্বককে অতিবেগুনি রশ্মির প্রতি আরো সংবেদনশীল করে তোলে।

আর এই সময় মদ্যপায়ীরা সূর্যের আলোর কাছাকাছি গেলে এবং সানস্ক্রিনের মতো দেহকে সূর্য থেকে রক্ষার কোনো ব্যবস্থা না নিলে কয়েকগুণ বেশি মাত্রায় অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতির শিকার হয়। অ্যালকোহলের মাত্রা বেশি হলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।

১৩। রেড মিট: মাংস অনেকেরই প্রিয়। কিন্তু লাল মাংস স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। হতে পারে প্রাণঘাতী ক্যান্সারও। তাই বিজ্ঞানীরা বলছেন, অধিক পরিমাণে লাল মাংস ভোজন ত্যাগ করতে হবে। এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, লাল মাংসে এন-নিট্রোসোডিয়েথিলামিন নামে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ থাকে। এ‌ পদার্থের মাত্র দশমিক ০০০০৭৫ শতাংশ গ্রামই শরীরে ক্যান্সার উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট। এছাড়া লাল মাংসে থাকা উচ্চমাত্রার ক্ষতিকর কোলেস্টরল অন্ত্র ও পাকস্থলীর ক্যান্সার সংক্রমণেই কাজ করে না, এটি ভয়ংকরভাবে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ক্যান্সার ছড়িয়ে দেয়। তাই এই মাংস ভক্ষণে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

 

০৩ আগস্ট, ২০১৫ ০৯:৩৩:০৭