নিষিদ্ধ পল্লীর গল্প!
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
দেহ বিনিময়ের ব্যবসা পৃথিবীর সবথেকে আদি ব্যবসাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বৈধ বা অবৈধ দুই উপায়েই পৃথিবির বিভিন্ন দেশে এই ব্যবসা এখনও টিকে আছে। নিষিদ্ধ পল্লীর পর্দার আড়ালের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাধারণের আগ্রহও অনেক। কেন এই পেশার সাথে কেউ জড়িত হন, এই পেশায় আসার সিদ্ধান্ত কি স্বাধীনভাবে নেওয়া নাকি ভাগ্যের নির্মম পরিণতি; এমন সব প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহ অনেকেরই। সম্প্রতি আল জাজিরার সাথে কথা বলেছেন নেদারল্যান্ডের কয়েকজন যৌন কর্মী ও ব্যবসায়ী। উঠে এসেছে নিষিদ্ধ পল্লীর অনেক অন্ধকার দিক।

ব্যবসায়ী বা দালাল

জন নেদারল্যান্ডের নিষিদ্ধ পল্লীর একজন দালাল বা ব্যবসায়ী। কর্মীদের জন্য খদ্দের জোগাড় করেন তিনি। আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর মুখেই শোনা যাক সেই গল্প। জন বলেন-

“আমার বয়স তখন ১৮ যখন প্রথম কোন মেয়ে আমার জন্য কাজ করে। আমি আজও তাঁর নাম মনে করতে পারি। তাঁর নাম ছিল ক্যারেন”।

“আমার জন্য দালাল হওয়া খুব সহজ ছিল। এই ব্যবসার সবাইকে আমি চিনতাম। আমার নানাও একজন দালাল ছিলেন। আমার মা ছিলেন যৌনকর্মী। তাঁর মা-ও তাই ছিলেন। ছোটবেলায় যখনই আমার আইসক্রীম খেতে ইচ্ছে হতো আমি অপেক্ষা করতাম কখন আমাদের বাসায় একজন খদ্দের আসবেন। আমি আসলে এই নিষিদ্ধ পল্লীতেই বড় হয়েছি”।

“আমার কাছে নারী মানে সবসময় ‘পণ্য’ ছিল। তারা আমার কাছে বস্তু। এই ব্যবসায় আবেগের কোন জায়গা নেই। এখানে আপনাকে ‘শাসন’ করা জানতে হবে। পরিস্থিতির সাথে মোকাবেলা করতে হবে। আপনার যদি কোন ‘আবেগ’ থাকে তাহলে আপনি মেয়েদেরকে দিয়ে কাজ করাতে পারবেন না”।

“এখানে আমরা ঐ নারীদেরকে দিয়ে আয় করি। আবার তাদেরকে এটাই বুঝাই যে, আমরাই তাদের ‘সৃষ্টিকর্তা’। তাদেরকে আমাদের প্রতি অনুগত থাকতে হবে”।

“তবে এটা খুবই বাজে একটা জায়গা। চারদিকে শুধু মিথ্যা আর প্রতারণার জাল। এখানে মেয়েদের ওপর অত্যাচারও করা হয়। কিন্তু আমি নিজেকে এসব অনুভূতির বাইরে রাখতাম। সে কারণেই আমি টিকে থাকতে পেরেছি। অনেকে মনে করেন দেহ ব্যবসা খুবই সহজ। আসলে মোটেই না। যিনি পুরুষদের আনন্দ দিচ্ছেন আর আমরা যারা এই পুরো ব্যবস্থাটি বাস্তবায়ন করি; আমাদের কারো জন্যই তা সহজ নয়”।

“যখন আপনি নতুন, বয়স কুড়ি এর কোঠায়, তক্ষণ আপনার পাঁচজন মেয়ে থাকলেই হয়। কিন্তু দিন যত বাড়বে আপনার প্রতিযোগিতা তত বাড়বে। আমি সবসময়েই চেয়েছি ‘টারজান’ বা ‘র‍্যাম্বো’ এর মতো জীবনযাপন করতে। আমি সেই লক্ষ্যে কাজও করেছি। কিন্তু এটা শুধুই কল্পনা। বাস্তবে এই জীবনের কোন অস্তিত্ব নেই”।

স্বেচ্ছায় যৌন কর্মী

২৬ বছর বয়স্ক জ্যাকি নেদারল্যান্ডের একজন নিয়মিত যৌন কর্মী। ২ সন্তানের জনকও তিনি। দেহ ব্যবসার এই পেশায় স্বেচ্ছায় এসেছেন তিনি। আর তাও এসেছেন বাবা’র সাহায্যে। জ্যাকি বলেন-

“আমি খুব উত্তেজনা পছন্দ করি। বেঁচে থাকতে আমার উত্তেজনা দরকার। আর যৌনতায় আমি সেই উত্তেজনা খুঁজে পাই। একটি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতে করতে আমি হাপিয়ে উঠেছিলাম।”

“তিন বছর আগে আমিই আমার বাবাকে বললাম যে আমি এই ব্যবসায় আসতে চাই। আমার বাবা তখন আমাকে তাঁর এক বন্ধুর কাছে নিয়ে গেলেন। সেই বন্ধু একটি ‘সেক্স-ক্লাব’ চালাতেন”।

“১৭ বছর বয়সে আমি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পরি। এরপর আমার বয়ফ্রেন্ডকে বিয়ে ১৮ বছর বয়সে। সে বছরই আমার প্রথম সন্তান হয়। ১৯ বছর বয়সে আমি দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেই। কিন্তু ২০ বছর বয়সেই আমাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে আমি আর কোন পুরুষের অধীনে না  থাকার সিদ্ধান্ত নেই। বিবাহ বিচ্ছেদের তিন বছর পর এই ব্যবসায় চলে আসি”।

“এটা আসলে একটি খেলা। এখানে আপনি পুরুষদের শাসন করবেন। তারা আমার ইশারায় সবকিছু করবে। তবে কেউ কেউ খুব খারাপ। আমাদের গায়েও হাত তোলে”।

“খুব খারাপ লাগে যখন কাজ শেষে টেবিলে খদ্দের টাকা রাখে। মনে হয় যে, এতক্ষণ যা হয়েছে শুধু বিনিময়। আমাকে কিনে নিয়েছিল সে। নিজেকে পণ্য ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। তবে এটাই বাস্তবতা। এটা আমাদের কাজেরই অংশ। আমাদের এমন পুরুষদের সাথে রাত কাটাতে হয় যাদের সাথে সাধারণ সময়ে দেখা হলে হয়তো কথাও বলতাম না। এই ব্যবসায় আপনি কখনোই কারো কাছ থেকে ভালোবাসা পাবেন না। পাবেন কাজের বিনিময়ে টাকা।”

“আমাদের কাছে যেসব গ্রাহক আসেন তাদের বেশিরভাগেরই বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান আছে। আমার মনে হয় সেইসব পুরুষ সবথেকে নিকৃষ্ট যারা পরিবার থাকতে এই নিষিদ্ধ পল্লীতে আসেন।”

ইচ্ছের বিরুদ্ধে হওয়া যৌনকর্মী

২৩ বছর বয়সী জান্দ্রা শুনিয়েছেন তাঁর গল্প। প্রথমে তাঁর দালাল আর পরে তাঁর বয়ফ্রেন্ডের জোরাজুরিতে দেহ ব্যবসায় নিজের নাম লেখান তিনি। জান্দ্রা বলেন-

“আমার গল্প অনেকটা এমন যে, কেউ যদি আমাকে তা বলত আমি নিজেই তা বিশ্বাস করতাম না। আমার অভিজ্ঞতা বলেই হয়তো আমি তা বিশ্বাস করি”।

“আমি তখন স্কুলে পরতাম। বয়স ১৫। আমাদের স্কুলে একদল বন্ধু ছিল যারা অন্যদের থেকে বিলাসবহুল জীবন যাপন করত। আমিও সেই জীবন চাইতাম। একদিন তাদের সাথে গেলাম। তারা জিম (ছদ্মনাম) নামের এক লোকের সাথে ঘুরতে বের হয়। আমাকেও সাথে নেয়। পরে আমি আবিষ্কার করলাম যে, তিনি আসলে একজন মাদক ব্যবসায়ী। কিছুদিনের মধ্যে আমিও জিমের জন্য মাদক ব্যবসা শুরু করলাম”।

“আমি জানতাম যে, এটা ঠিক হচ্ছে না। তাই জিমকে একদিন বললাম যে, আমি এসব থেকে বের হয়ে যেতে চাই। সে বলল ঠিক আছে। তাঁর জন্য মাদক বিক্রি বন্ধ করলেও অন্য উপায়ে তাঁর জন্য অর্থ উপার্জন করে দিতে হবে”।

“আমি বুঝতে পারছিলাম যে অন্য উপায়টা কী। আমি তা মানতে চাইনি। আমি আমার অসম্মতি জানানোর সাথে সাথে সে আমাকে জোর করে তাঁর গাড়ির পেছনের সিটে নিয়ে ধর্ষণ করল। সে সময় আমি কুমারী ছিলাম”।

“সেই সময় থেকে আমি তাঁর ইচ্ছের পুতুল হয়ে যাই। আমি তাকে অনেক ভয় পেতে শুরু করি। আমার মনে হতো যে, আমি তাঁর কথা মানলে আমাকে সে মেরে ফেলবে। আমি জানতাম যে, এই বলয় থেকে আমি বের হতে পারব না”। 

“সপ্তাহে তিন-চারবার জিম আমাকে ডেকে নিতো। এরপর গাড়িটি একটি নির্জন পার্কিং লটে রাখতে। কিছুক্ষণ পর সেখানে খদ্দেররা আসত। জিমের হাতে টাকা দিত। এরপর পেছনের সিটে যেতে হতো আমাকে। আর এই পুরোটা সময় গাড়ির দরজার বাইরে থেকে পাহারা দিত জিম। আমার পালানোর কোন উপায় ছিল না”।

“প্রায় প্রতি মুহুর্তের ঘটনা ছিল এমনই। জিম যখন আমাকে ডাকত আমি চলে আসতে বাধ্য ছিলাম। নিজেকে তখন সবথেকে অসহায় আর একাকী মনে হতো। যখনই আমার সাথে এই ঘটনাটা ঘটতো আমার মনে হতো যে, এটাই শেষ। আর হবে না আমার সাথে এমনটা। কিন্তু এটা হতেই থাকে”।

“কিছুদিন পর হঠাত জিম গায়েব হয়ে যায়। মনে হয় সে পুলিশের হাতে ধরা পরে। নিজেকে তখন থেকে স্বাধীন মনে হতে থাকে। তবে আনন্দের মুহূর্ত অল্প সময়েই হারিয়ে যেতো। অতীত তাড়া করে ফিরত। তবুও মনে হচ্ছিল যে এখন থেকে সব ভালো হবে। কিন্তু এর থেকেও খারাপ কিছু আমার জন্য অপেক্ষা করছিল”।

“আমার বয়স যখন ১৯ তখন ইন্টারনেটে একটি ছেলের সাথে আমার পরিচয় হয়। তাঁর সাথে আমার কথাগুলো শেয়ার করি। সে আমাকে সহানুভূতি দিত। একদিন সে বলে যে, সে আমাকে ভালোবাসে। আমিও ততদিনে তাঁর প্রতি দূর্বল হয়ে পরি”।

“বছর দেড়েক সব ভালোই ছিল। কিন্তু একদিন সেই মানুষটি আমাকে মাদক গ্রহণের জন্য বলে। আমিও রাজি হই। খুব একটা চিন্তা করিনি। আমার নিজের কিই বা ছিল যে চিন্তা করব? তো সে একটা জায়গায় নিয়ে গেল আমাকে। আমাকে প্রচুর মাদক দ্রব্য খাওয়ানো হয়। আমি যখন বেসামাল অবস্থায় তখন সেখানকার এক লোক বলল যে, সে আমার সাথে টাকার বিনিময়ে ‘আনন্দ’ করতে চায়। আমি নিষেধ করিনি। আমি নিষেধ করার অবস্থায়ই ছিলাম না। জিম আমার সাথে যা করেছে তাঁর পর আমার শরীর নিয়ে খুব একটা চিন্তাও করিনি”।

“এরপর থেকে এটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল। আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে সেখানে প্রায়ই নিয়ে যেতো। আর টাকার বিনিময়ে অন্য পুরুষের হাতে তুলে দিত। এরপরেও আমি তাকে ভালোবেসে গেছি। তাঁর কারণে আমার কোন বন্ধু ছিল না। আমাকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছিল। সে বলতো যে, জিম আমার সাথে যা করেছে তাঁর জন্য আমিই দায়ী। আমিও অবুঝের মতো তাই মেনে নিতাম”।

“একদিন এই সবকিছু থেকে আমি বের হয়ে আসি। তাঁর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে দিই। এরপর সে আমাকে ফিরিয়ে নিতে অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি”।

খদ্দের

৪২ বছর বয়সী রবার্ট এখন নিয়মিতভাবে নিষিদ্ধ পল্লীতে যান। সেখানকার আনন্দের নিয়মিত খদ্দের তিনি। খদ্দের হওয়ার পেছনে রবার্টেরও আছে এক হৃদয়বিদারক কাহিনী। আল-জাজিরাকে রবার্ট জানান-

“আমার একটী মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সে আমার সাথে ‘চিট’ করে। আমি তখন খুবই ভেঙ্গে পড়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমার সব কিছু শেষ। পুরো নারী জাতের প্রতিই আমার ঘৃণা জন্মাতে শুরু করে। সেই ঘৃণা থেকে আমি একটি এসকর্ট এজেন্সীতে ফোন দেই”।

“তাদের একটি ওয়েবসাইট ছিল। সেখানে সব মেয়েদের ছবি ও সময় কাটানোর মূল্য দেওয়া ছিল। সেখান থেকে আমি একটি পূর্ব ইউরোপীয় মেয়ে পছন্দ করি। তাদেরকে পছন্দ জানিয়ে দেওয়ার এক ঘন্টার মধ্যে মেয়েটি আমার বাসায় চলে আসতো। এর পরবর্তী এক ঘন্টা সে আমায় আনন্দ দিত। এই সময়টায় আমার মনে হতো যে আমি সব দুঃখ ভুলে আছি। কিন্তু সে চলে যেতেই আবার সেই বিষণ্ণতা ঘিরে ধরতো আমাকে। এভাবে চলল এক মাস”।

“একদিন এক ইউরোপীয় মেয়ে আসল আমার কাছে। কাজ শেষে সে আমার মোবাইল ফোন দেখল। সে মোবাইল ফোনটি চাইল। মোবাইল ফোনটির দাম ছিল খুবই সামান্য। আমি তাকে চার্জার আর বক্সসহ মোবাইলটি দিয়ে দিলাম। মেয়েটি খুবই খুশি হয়েছিল। সে চার্জার আর বক্স রেখেই মোবাইলটি নিয়ে চলে যায়”।

“আমি প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও পরে বেশ অবাক হই। ভাবি যে, মেয়েটি কেন বক্স আর চার্জার না নিয়েই চলে যাবে। আমি যেটা বুঝলাম তা হল যে, মেয়েটিকে হয়তো জোর করে এই ব্যবসায় নিয়ে আসা হয়েছে। মানব পাচার চক্রের শিকার সে। মোবাইলটি দিয়ে সে হয়তো কারও কাছে সাহায্য চাইবে। আর মোবাইলটি ছোট হওয়ায় সে সেটি লুকিয়ে রাখতে পারবে। বক্স আর চার্জার পারবে না”।

“সে বারই আমি শেষ এসকর্ট এজেন্সী থেকে মেয়ে আনি। এর কিছুদিন পর আমার এমটি মেয়ের সাথে সম্পর্ক হয়। এখনও তাকে নিয়ে সুখেই আছি। এরপর কয়েকবার এসকর্ট এজেন্সীর ওয়েবসাইটে মেয়েটিকে খুঁজেছি আমি। পাইনি। মনে হয় আমার মোবাইলের সাহায্যে সে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যেতে পেরেছে। আমার খুব খারাপ লাগে সেদিনের কথা মনে করলে। আমি হয়তো তাকে আরও বেশি সাহায্য করতে পারতাম। আমার মতো খদ্দেরের জন্যই তাঁর মতো মেয়ে এই পথে আসে”।

 

০২ জুন, ২০১৮ ০০:২৯:০৪