পর্যটনকন্যা পঞ্চগড়
ঘুরে আসুন মধ্যযুগের প্রাচীন দুর্গনগরী ভিতরগড়
এস.কে.দোয়েল, ভিতরগড় ঘুরে এসে
অ+ অ-প্রিন্ট
উত্তরের আকাশচুম্বীা হিমালয়, কাঞ্চনজঙ্ঘা, দার্জিলিং, চাবাগান, পাথর, পাথর উত্তোলনসহ অপরূপ সৌন্দর্য্যরে সাথে দেখে আসতে পারেন প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ মধ্যযুগের প্রাচীন দুর্গনগরী ভিতরগড়। ২৫ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে এই দূর্গনগরীটি পঞ্চগড় জেলার শহর হতে ১৬ কিলোমিটার দূরে ভিতরগড় এলাকায় অবস্থিত। ১৭৪৭ সালে দেশভাগের পর বর্তমান এ দুর্গনগরীর কিছু অংশ ভারতের মধ্যে পড়েছে। বলা হচ্ছে এটি হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ প্রত্মতাত্ত্বিক সম্পদ এবং প্রাচীন দূর্গনগরী। ২০১১ সালে পূরাকীর্তি সংরক্ষণ আইনের আওতায় মধ্যযুগের এই দুর্গনগরীর ঢিবি, বেষ্টনী দেয়াল, মোড়েল রাজার গড়, মোহনা ভিটাসহ বিস্তীর্ন এলাকা সংরক্ষিত স্থান ঘোষণা করা হয়। 

ভিতরগড় দুর্গ নগরীতে দুটি প্রাচীন মন্দির আবিস্কার করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের সহযোগী অধ্যাপক প্রতœতত্ত্ববিদ ড. শাহনাজ হুসনে জাহান লীনা। তার নেতৃত্বে মাটি খনন করে ওই দুটি মন্দির আবিস্কার করা হয়। আবিষ্কৃত একটি মন্দিরের অবয়ব বের হয়েছে গড়ের দ্বিতীয় আবেষ্টনীর দেওয়ালের বাইরে খালপাড়া নামক গ্রামে। অপর মন্দিরটি গড়ের দ্বিতীয় আবেষ্টনী দেওয়ালের বাইরে ঢিবরী ডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত। এছাড়াও ওই এলাকার মাটি খুড়ে পাওয়া গেছে বহু মূল্যবান প্রতœতাত্তিক নিদর্শন। আবিস্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ ও মন্দির। ভিতরগড়ের রাজবাড়ির পাশে কাচারি বলে পরিচিত উঁচু ঢিবি খননকালে একটি মন্দির আবিস্কৃত হয়। তবে এখন পর্যন্ত স্মৃতিসৌধ ও মন্দিরের অংশ বিশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় গোরস্থানের নীচের দিকে খননকাজ চালিয়ে একটি মন্দিরের বিলুপ্তপ্রায় অবকাঠামো এবং মনুমেন্টের পশ্চিমে ইটের গাঁথুনির ১৬টি স্তম্ভ পাওয়া গেছে।ঘুরে আসুন মধ্যযুগের প্রাচীন দুর্গনগরী ভিতরগড়

২০০৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ভিতরগড়ে সুপরিকল্পিত প্রত্নতাত্তিক সমীক্ষা, উৎখনন ও গবেষণা পরিচালনা করে এখানে ইট ও মাটি দ্বারা নির্মিত ৪টি বেষ্টনী (একটি অপরটির ভিতর অবস্থিত), বেষ্টনীসমূহ পরিবেষ্টিত পরিখা এবং ৬ থেকে ১২ শতকের মধ্যে নির্মিত ৮টি প্রাচীন স্থাপনার ভিত্তি কাঠামো আবিস্কৃত হয়। প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. শাহনাজ হুসনে জাহান লীনা এ বিষয়ে জানান, নির্মাণ পদ্ধতি দেখে এগুলোকে গুপ্ত যুগের পরে সপ্তম শতক বা ১৪ শ বছর আগের তৈরি বলে অনুমান করা যায়। এছাড়া এসব স্থাপনা বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের বলেও আমাদের ধারণা। 

তিনি আরও জানান, ২০০৭-০৮ সালে ৩৪ জন শিক্ষার্থীর সহযোগিতায় কয়েকদফা খনন কাজ চালিয়ে স্তূপ ও মন্দির আবিস্কার করি। এলাকাটিকে স্বয়ং সম্পূর্ণ রাজ্য বলা যায়। কারণ এখানে প্রাচীন বসতি ও রাজ্যের নিজস্ব রাজা প্রজা এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র, ধর্মীয় ইমারত, দূর্গের দেয়াল ছিল। চারটি দেয়াল দিয়ে এই নগরীকে সুরক্ষিত করা হয়। এর মধ্যে বাইরের দুটি গড় বা দেয়াল মাটি দিয়ে তৈরি। দেশে যেসব দুর্গনগরী চিহ্নিত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে ভিতরগড় দুর্গনগরীর বিস্তৃতি অনেক বেশি। এ কারণে একে দেশের সর্ববৃহৎ দুর্গনগরী বলা যেতে পারে।

ঐতিহাসিকদের মতে, ভিতরগড় পূর্ণ নির্মাণ করেন প্রাচীন কামরুনের শুদ্রবংশীয় রাজা দেবেশরের বংশজাত পৃথু রাজা। স¤্রাট হর্ষবর্ধনের সময় পৃথু রাজার অভ্যুলয় ঘটে। তিনি কামরুপে পরাজিত হয়ে ভিতরগড় এলাকায় গমন করেন এবং নির্মাণ করেন এই ভিতরগড়। যা পৃথু রাজার রাজধানী। স্থানীয় আধিবাসীদের নিকট তিনি মহারাজা হিসাবে পরিচিত। 

১৮০৯ সালে ফ্রান্সিস বুকানন ভিতরগড় জরিপ করেন। তাঁর মতে, পৃথু রাজার রাজত্ব তৎকালীন বৈকণ্ঠপুর পরগণার অর্ধেক ও বোদা চাকলার অর্ধেক অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। ছয় শতকের শেষদিকে এক পৃথুরাজা কামরূপে পরাজিত হয়ে ভিতরগড়ে রাজ্য স্থাপন করেন। আবার তেরো শতকের কামরূপের ইতিহাসে এক রাজার নাম পৃথু। কেউ কেউ মনে করেন পৃথু রাজা ও রাজা তৃতীয় জল্পেশ অভিন্ন ব্যক্তি এবং আনুমানিক প্রথম শতকে তিনি ভিতরগড়ে রাজধানী স্থাপন করে এ অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন। 

আবার অনেকে জলপাইগুড়ির জল্পেশে নয় শতকে নির্মিত শিবমন্দিরের নির্মাতা জল্পেশ্বর বা রাজা তৃতীয় ল্পেশকে নয় শতকের শাসক মনে করেন। বুকানন ভিতরগড় জরিপকালে একজন স্থানীয় বৃদ্ধের নিকট হতে জানতে পারেন যে, ধর্মপালের রাজত্বের আগে পৃথুরাজা এ অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন। কোটালীপাড়ায় প্রাপ্ত স্বর্ণমুদ্রা হতে আমরা জানতে পারি আরেক জন রাজার নাম পৃথুবালা। এই পৃথুবালা সম্ভবত সাত শতকের শেষার্ধে অথবা আট শতকের শুরুতেই সমতটের শাসক ছিলেন। 

অপর একটি সুত্র অনুযায়ী, নয় বা দশ শতকে কম্বোজ বা তিববতীয়গণের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য পালবংশীয় রাজাগণ ভিতরগড় দুর্গটি নির্মাণ করেন। পুরাতন হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশীয় সমতল ভূমিতে তরাই অঞ্চলে অবস্থিত ভিতরগড়ের উপরিভাগে রয়েছে গাঢ় ধূসর বা কালো রঙের বেলে দোআশ মাটি- যা তরাই কালো মাটি হিসেবে পরিচিত। ভারতের জলপাইগুড়ির হতে উৎপন্ন তালমা ও কুড়–ুম নদী দুটিই ছিল ভিতরগড়ে পানি সরবরাহের প্রধান উৎস। 

প্রতœতাত্বিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের আলোকে অনুমান করা যায় যে, ভিতরগড় একটি স্বাধীন রাজ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সারা বছর চাষাবাদের জন্য সেচ ব্যবস্থা এবং নদীর পানি নিয়ন্ত্রনে নৈপুণ্য কৌশলের অধিকারী ছিল ভিতরগড়ের প্রাচীন জনপদ। ড.লীনা তার উৎখননের ফলে প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের আলোকে অনুমান করে বলেছেন, ছয় শতকের শেষে কিংবা সাত শতকের শুরুতে ভিতরগড় একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রাচীন বাণিজ্য সড়ক ও নদীপথের উপর অবস্থিত হওয়ায় ভিতরগড় এলাকার অধিবাসী সম্ভবত নেপাল, ভুটান, সিকিম, আসাম, কোচবিহার তিববত, চীন, বিহার এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিল।ঘুরে আসুন মধ্যযুগের প্রাচীন দুর্গনগরী ভিতরগড়

ভিতরগড়ের দুর্গনগরীতে পৃথু রাজা নির্মাণ করেন এক বিশালাকার একটি দীঘি। যার পাড়সহ এর আয়তন প্রায় ৮শ থেকে ৪শ গজ। পাড়ের উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। জলভাগের আয়তন প্রায় চারশ ও দুইশ গজ। পানির গভীরতা প্রায় ৪০ ফুট বলে স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস। পানি অতি স্বচ্ছ। দিঘীতে রয়েছে মোট ১০টি ঘাট। নিম্নবর্ণের কিচক সম্প্রদায় দ্বারা আক্রান্ত হলে রাজা তার পবিত্রতা রক্ষার জন্য পরিবার পরিজন ও সৈন্য-সামন্তসহ দীঘির জলে প্রাণ বিসর্জন করেন।’ সেই থেকে দীঘিটির নামকরণ হয় মহারাজা দীঘি। এর ভিতরে মন্দির, প্রসাদ ও ইমারতের এবং সাবশেসে এবং বাইরে পরিখা ও মানীর প্রাচীর এখনো দেখা যায়।

ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ কর্তৃক গবেষণায় এটি সুষ্পষ্ট যে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্তিক নিদর্শনের সমাহার এই ভিতরগড় পরিবেশবান্ধব উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্তিক স্থান। ভিতরগড় দুর্গনগরীকে আগামী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে এবং এর ইতিহাস ও গুরুত্ব সর্বসাধারণের অনুধাবনের জন্য ভিতরগড় প্রমোশনাল সোসাইটির উদ্যোগে ২০১৬ সালে ১৯ মার্চ ভিতরগড় দিবস ঘোষণা করেন  সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর। প্রতিবছর মার্চ মাসের প্রথম শনিবার ভিতরগড় দিবস হিসেবে পালিত হয়। দেশের সর্বোত্তরের প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের লীলাভূমি ভিতরগড়ের প্রতœতাত্ত্বিক নির্দশন আর প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্য্যমন্ডিত হিমালয়কন্যা পঞ্চগড়কে উপভোগ করতে চাইলে ভ্রমন সহযোগিতা নিতে পারেন তেঁতুলিয়া ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজমের। প্রতিষ্ঠানটি পর্যটকদের ঘুরা-ফেরা, থাকা-খাওয়া বিশেষ ট্যুরিস্ট গাইড দিয়ে সহযোগিতা করে থাকে পর্যটকদের। ফোন-০১৭৫৫৪৯০৮৯৪।

 

২৭ নভেম্বর, ২০১৭ ০৯:০৭:৩৪