সীমান্তের পর্যটনকন্যা তেঁতুলিয়া
শরৎ-হেমন্তে দৃষ্টি কাড়বে সুদৃশ্য হিমালয়, দার্জিলিং ও কাঞ্চনজঙ্ঘা
এস কে দোয়েল, তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়)
অ+ অ-প্রিন্ট
তেঁতুলিয়া সীমান্ত থেকে স্পষ্ট দেখা যায় হিমালয় পর্বত


মধ্য আগস্টের পর হতেই প্রকৃতি জুড়ে শরতের শুভ্রতা। নীল আকাশে ভাসমান খন্ডখন্ড মেঘ। মেঘ কেটে রোদের ঝিলিক মারে সাদা কাশবনের উপর। হাওয়ায় হাওয়ায় দোল খায় কাশবন। এও যেন আরেক মনোমুগ্ধকর আবেগঘন দৃশ্য। মন কেড়ে নেয় যেকোন প্রকৃতি প্রেমিকের। আশ্বিনের ছিটেফোটা বৃষ্টি কাটলেই কার্তিক। মধ্য অক্টোবরেই হাজির হয় স্বর্ণঋতু হেমন্ত। মাঠে মাঠে দোলা খায় সোনালি ধান। হেমন্তের মিষ্টি রোদে নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মেতে উঠে দেশের উত্তরের হিমালয় পাদদেশে অবস্থিত প্রকৃতির মায়াকন্যা তেঁতুলিয়া। নিবিড় শান্ত প্রকৃতির উত্তরের এ জনপদ প্রতিবছর শরৎ-হেমন্ত-শীত ঋতুতে সৌন্দর্যের পসরা নিয়ে হাজির হয় দর্শনার্থীদের সামনে।

তিন দিকে প্রতিবেশী ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার সীমান্তবেষ্টিত তেঁতুলিয়ায় হেমন্ত জুড়ে খুব কাছে দেখা  যায় নেপালের আকাশচুম্বী হিমালয় পর্বত; ভারতের পাহাড়কন্যা দার্জিলিং আর মনোমুগ্ধকর কাঞ্চনজঙ্ঘা। এই নান্দনিক গিরি-সৌন্দর্যের সঙ্গে আছে তেঁতুলিয়ার নিজস্ব ঐতিহ্যিক স্থাপত্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর, জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, পিকনিক কর্নার, রওশনপুর জেমকন গ্রুপের শিশুপার্ক ও আনন্দধারা পার্ক, সীমান্তবেষ্টিত ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার সার্চলাইট, নদী মহানন্দা, সবজি গ্রাম, পাথর ও চা-শিল্প।

গগণচুম্বী হিমালয়

হেমন্তের এই সময় নির্মল আকাশে দেখা মিলছে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয়। আকাশচুম্বি হিমালয় দেখে চোখ জুড়াতে অনেক পর্যটক ছুটে আসেন তেঁতুলিয়ায়। এখান থেকে খুব কাছে স্পষ্ট দেখা যায় হিমালয় পর্বত। ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানের গিলগিটে সিন্ধু নদী থেকে শুরু করে ভারত, তিব্বত, নেপাল, পূর্ব ভারত ও ভুটান হয়ে দণিপূর্ব তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের দণিাঞ্চলীয় বাঁক পর্যন্ত বিপুল স্থলভাগ জুড়ে অবস্থান হিমালয় পর্বতের। সমভূমি থেকে সারিবদ্ধ অনুচ্চ পাহাড়ের ভিত ধরে উচ্চ থেকে আরও উচ্চে উঠে গেছে হিমালয়ের শ্রেণি আর তার অভ্রবেদী চূড়াশৃঙ্গ, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে সুবিখ্যাত মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮ মিটার), মাউন্ট কে-টু  (৮,৬১০ মিটার) ও কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮৫৮৫ মিটার)।

হিমালয়ের হিমবাহে উত্তরের শীত

হিমালয় পর্বতের পাদদেশে বলে দেশের এই উত্তর জনপদে শীত হয়ে ওঠে মাত্রাতিরিক্ত। তীব্র শীত পড়ে এখানে। কুয়াশায় ঢেকে যায় পুরো অঞ্চল। ভোরের সোনালি রোদে শিশির হয়ে ওঠে মুক্তোদানা। বিশাল এই উপমহাদেশে তুষার-হিমবাহের একটিই আস্তানা- হিমালয়। এর গগণস্পর্শী সুউচ্চ চূড়াগুলো স্থায়ীভাবে জমাট বরফের বিস্তীর্ণ আস্তরণে ঢাকা;  সেখান থেকে নেমে আসছে অসংখ্য ছোট-বড় হিমেল রসনা (ঃড়হমঁবং ড়ভ রপব), যা হিমবাহ (মষধপরবৎ) নামে পরিচিত। বাংলাদেশের সীমান্তের কাছে চিত্তাকর্ষক কয়েকটি হিমবাহ হচ্ছে ২৬ কিমি দীর্ঘ জেমু (সিকিম) ও কাঞ্চনজঙ্ঘা (দৈর্ঘ্য ১৬ কিমি)। তা ছাড়া উত্তর-পূর্বে আসামের পর্বতমালা, উত্তরে মেঘালয় মালভূমি ও অধিকতর উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা থাকার এখানে শীতের তীব্রতার অন্যতম কারণ।

স্বপ্নপূরী দার্জিলিং

হিমালয়ের কোল ঘেঁষে ছবির মতো দাঁড়িয়ে আছে অনাবিল সুন্দর স্বপ্নপুরী দার্জিলিং। দার্জিলিং হলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার একটি বাণিজ্যিক শহর এবং পর্যটন নগরী। পৃথিবীর বিখ্যাত প্রার্থনা স্থান ঘুম মোনাস্ট্রি রয়েছে এই দার্জিলিংয়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা মেলে অপূর্ব সুন্দর সূর্যোদয়। শহরটি নিম্ন হিমালয়ের মহাভারত শৈলশ্রেণিতে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৭,১০০ ফুট (২,১৬৪.১ মিটার) উচ্চতায় হওয়ায় হিমালয়ের সঙ্গে জড়াজড়িভাবেই তেঁতুলিয়া থেকে দেখা যায় মেঘের দেশ ও পাহাড়ে ঘেরা অপূর্ব চিরহরিৎ ভূমি দার্জিলিং।

 মেঘকন্যা কাঞ্চনজঙ্ঘা

হিমালয় পর্বতমালার পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট ও কে-টুর পরের অবস্থানে রয়েছে অনুপম সৌন্দর্যের গিরিবধূ কাঞ্চনজঙ্ঘা। এটি পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ, যার উচ্চতা ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট। ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার রয়েছে চমকপ্রদ এক ইতিহাস! কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপম সৌন্দর্য এবং টাইগার হিলের চিত্তাকর্ষক সূর্যোদয় দেখার জন্য প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ভিড় করেন। কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব সৌন্দর্য তেঁতুলিয়ায় বসে দেখা যায় অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। মেঘমুক্ত আকাশে স্পষ্ট দেখা যায় বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া। রাতে দেখা যায় শিলিগুড়ির উজ্জ্বল আলো। পাহাড়েরই অপর ঢালে স্বপ্নপুরী দার্জিলিং। বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর দিনের প্রথম সূর্যোদয়ের সূর্যকিরণের ঝিকিমিকি দৃশ্য সত্যিই মুগ্ধতার মোহ ছড়ায়।

উত্তরের পর্যটনকন্যা তেঁতুলিয়া

হেমন্তের রোদে একদিকে দৃশ্যমান নেপালের আকাশছোঁয়া হিমালয় পর্বত, ভারতের স্বপ্নপুরী দার্জিলিং আর অপরূপা কাঞ্চনজঙ্ঘা, অন্যদিকে রয়েছে তেঁতুলিয়ার অপরূপ সৌন্দর্য। বিশেষ করে সীমান্তের তীর ঘেঁষা ভারত-বাংলাদেশের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া মহানন্দা নদীর তীর থেকে চোখ জুড়িয়ে দর্শন করা যায় আকাশছোঁয়া হিমালয় পর্বত, পর্বতশৃঙ্গকে জড়িয়ে থাকা নান্দনিক সৌন্দর্যকন্যা দার্জিলিং ও কাঞ্চনজঙ্গা। উত্তরের বাংলাবান্ধা জিরোপয়েন্ট এবং দেশের অন্যতম স্থলবন্দর। এ বন্দর থেকেও চোখ মেলে দেখা যায় দৃশ্যমান আকাশছোঁয়া হিমালয়, দার্জিলিং ও কাঞ্চনজঙ্ঘা।

 


৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২০:২৯:৪১