কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর
লিয়াকত হোসেন খোকন
অ+ অ-প্রিন্ট
কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরে ডাল লেক
ঝিলামের নদীতীর ধরে গড়ে ওঠা শ্রীনগর কাশ্মীরের রাজধানী। ঝিলাম নদীর ওপর গড়ে ওঠা প্রায় ডজনখানেক সাঁকো শহরের নানা অংশে জুড়েছে এপার-ওপারের পথ। কাশ্মীরি কথায় ‘কাদাল’ হলো সাঁকো। আবদুল্লা কাদাল, হাব্বা কাদাল, নাওয়া কাদাল বা আমিরা কাদাল পেরতে পেরতে এক পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে সাঁকোর ওপর দু’দণ্ড দাঁড়িয়ে পড়লে বশ করবে ঝিলাম। নদীর ওপর ভেসে বেড়ানো নৌকাগুলো দেখতে দেখতে আর ফিরতে চাইবে না মন।

১,৫৩০ মিটার উচ্চতার এই শহর ঘিরে ডাল লেকে আর নাগিন লেকের টলটলে জলে সারবাঁধা হাউসবোট বা নৌকাবাড়ি। বারান্দায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে একের পর এক শিকারায় চলমান বাজার এসে পড়বে হাতের মুঠোয়। ফল, ফুল, সবজি, গয়না, পেপারমেশের কারুকার্য করা ফুলদানি, কাঠের আসবাব, এমনকি লন্ড্রি।

চা-বিলাসী বাঙালির কাছে শুধু শ্রীনগর নয়, গোটা কাশ্মীর উপত্যকা স্বর্গরাজ্য। চেখে দেখবেন সামান্য নুন, খাবার সোডা আর চা-পাতা দিয়ে বানানো ‘নমক চায়’। সব চাইতে মন কাড়ে সুন্দর চীনামাটির বাটিতে সুগন্ধি ‘কেওয়া চায়’। বাঙালির চা কাশ্মীরিদের ‘চায়’, আমাদের ভাত ওদের ‘বাত’।

নৌকাবাড়িতে থেকে ওখান থেকে শিকারায় লেক পেরিয়ে গাড়ি নিয়ে একদিন ঘুরে বেড়ানো যায় শ্রীনগরের দেখার জায়গাগুলোতে। আর একদিন বর্ণিল শিকারার সওয়ার হয়ে চার চীনার ছুঁয়ে জলভ্রমণ। চার চীনারের মোগল আমলের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো চারটে প্রাচীন চীনার গাছ দেখতে দেখতে কয়েকশো বছর পিছিয়ে যাওয়া। দূর থেকে ভাসতে ভাসতে প্রায় শ চারেক বছর আগে সুন্দরের পূজারী মোগল সম্রাটদের বানানো একের পর এক ‘মোগল গার্ডেন’ দেখতে নিশাতবাগ পেরিয়ে শালিমারের উদ্যানে আসুন। চাইলে যে কোনো ঘাটে শিকারা ভিড়িয়ে উদ্যানের রূপে-রসে, বর্ণে-গন্ধে ডুব দিন।

শুধু হাউসবোট নয়, শহরের লালচক এলাকায় পর্যটকদের থাকবার জন্য রয়েছে নানা মানের, নানা দামের কয়েকশো হোটেল। এখন কয়েকটা হোটেল গড়ে উঠেছে ডাল লেকের উল্টোদিকের পিচরাস্তার ওপারে। তবে হোটেলে থাকলে লালচকের আশপাশের হোটেলে থাকাই ভালো। ভালো করে শ্রীনগর ঘুরে দেখতে দু-তিনটে দিন হাতে রাখুন। সফর খুব স্বল্পমেয়াদি হলে একদিনে হয় গাড়ি অথবা শিকারায় বেড়াতে পারেন।

তিনটে মোগল গার্ডেন, চারচীনার, পরিমহল, নেহরু গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন ছাড়াও রয়েছে ডাল লেকের উল্টোদিকে টিলার মাথায় শঙ্করাচার্যের মন্দির। রয়েছে হরি পর্বত নামের পাহাড়ের মাথায় মুঘল ফোর্ট। অপূর্ব স্থাপত্যের জুমা মসজিদ। খানিক রাস্তা পেরিয়ে হজরতবাল। ডাল লেকের পশ্চিমে বিশাল এই মসজিদ শুধু স্থাপত্য নয়, প্রকৃতির কোলে এক শান্তির ঠিকানা। হজরতবালের প্রশস্ত চত্বর জুড়ে দেখা মেলে হাজারটা পায়রার ডানা ঝাপটানো, উড়তে উড়তে বসে পড়া। সংলগ্ন বাজারে হালুয়া আর পেল্লাই সাইজের পরোটার জিভে জল আনা স্বাদ। চাইলে এখানকার হোটেলে মিলবে অতি সুস্বাদু কাবাব, রিস্তা, গরম রুটি, ভাতও।

আজকের শ্রীনগর থেকে হেঁটে বা গাড়িতে কয়েক কিলোমিটার গেলেই ‘ওল্ড সিটি’। প্রাচীন এই জনপদ আজও সমৃদ্ধ কারুশিল্প, কার্পেটশিল্প আর বয়নশিল্পের চারুকলায়। এখানে-ওখানে উঁচু উঁচু বাড়ি, শাল আর কার্পেটের কারখানা, চীনার কাঠের আসবাবে বৃদ্ধ কারুশিল্পীদের চলমান হাতের জাদু বেশ লাগবে পুরনো শ্রীনগরের অলিতে-গলিতে হারিয়ে যেতে।

তিনটি মুঘল গার্ডেন শ্রীনগরের অন্যতম দ্রষ্টব্য। ডাল লেকের পাড়ে ডাল গেট থেকে মসৃণ পিচের পথে চশমাশাহি (৭ কিলোমিটার) পার হয়ে নিশাতবাগ (১১ কিলোমিটার)। আরও এগোলে (১৫ কিলোমিটার) শালিমারবাগ। শেষ এই উদ্যানটি সম্রাট জাহাঙ্গির সপ্তদশ শতাব্দীতে তৈরি করান নূরজাহানের জন্য। ১৬৩৩ সালে নূরজাহানের ভাই আসফ খানের হাতে গড়া নিশাতবাগ। তিনটে উদ্যানই পাহাড়ের কোলে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া সবুজ ঘাস, রাজকীয় দ্বিনার আর টিউলিপ সহ রঙবেরঙের অজস্র ফুলে সাজানো। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে, দু'চোখ ভরে দেখতে দেখতে মন ভরে ওঠে কানায় কানায়।

চশমাশাহি শব্দের অর্থ রাজকীয় ফোয়ারা। সেই ফোয়ারার জল ওপর থেকে নিচে নেমে আসে তিরতির করে বইতে বইতে। মন্দস্রোতা সেই জলের পাশে বসে থাকতে থাকতে ঘোর লাগে দু’চোখে। মুগ্ধ করে নিশাতবাগ, চশমাশাহি আর শালিমারের পাথরের তৈরি মহলগুলোর আশ্চর্য স্থাপত্য। মন কেড়ে নেয় এখনো টিকে থাকা মুঘল আমলের খিলানগুলোর অপূর্ব অঙ্কনশৈলী। তিনটে বাগানই যথেষ্ট যতেœ থাকে, মালি ফুল এগিয়ে দেয় অতিথির হাতে। নিতে ভুলবেন না। শ্রীনগরের আরেক অবশ্য দ্রষ্টব্য শাহজাদা দারাশিকোর তৈরি পরিমহল। চারপাশে অনুপম বাগান দিয়ে ঘেরা পুরোপুরি পাথর দিয়ে গড়া এই মহলের টঙে ওঠা যায় সিঁড়ি ভেঙে। পরিমহলের ওপর থেকে ডাল লেকের দৃশ্য অপূর্ব।

বোটানিক্যাল গার্ডেন পরিমহলের পথে। কাশ্মীর উপত্যকার অসংখ্য বনস্পতি, লতাগুল্ম আর পাখি দেখতে চাইলে কয়েকটা ঘণ্টা কাটাতে হবে এই পাহাড়ি উদ্ভিদ উদ্যানে। মন চাইলে হেঁটে চড়াইপথে চলে যাওয়া যায় পাহাড়ের ওপরকার শঙ্করাচার্যের মন্দির দেখতে।

কলকাতা থেকে ট্রেনে জম্মু হয়ে শ্রীনগর চলে আসা যায়। কলকাতা টার্মিনাল থেকে ১৩১৫১ জম্মু তাওয়াই এক্সপ্রেস ট্রেনটি বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে তৃতীয় দিন সকাল সাড়ে ৮টায় জম্মু-তাওয়াই পৌঁছায়। হাওড়া থেকে ১২৩৩১ হিমগিরি এক্সপ্রেস (মঙ্গল, শত্র“, শনি) রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে ছেড়ে তৃতীয় দিন দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে জম্মু-তাওয়াই পৌঁছায়। জম্মু থেকে শ্রীনগর যেতে বাস বা ভাড়া গাড়ি পেয়ে যাবেন। শেয়ার জিপও চলছে এই পথে। জম্মু থেকে শ্রীনগরের দূরত্ব ২৯৮ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে বিমানে দিল্লি হয়েও শ্রীনগর আসতে পারেন।

কোথায় থাকবেন

শ্রীনগরে থাকার জন্য রয়েছে জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজমের হোটেল হিমল, ভাড়া ৩,৫০০ টাকা। কঙ্গপোস, ভাড়া ২,৫০০ টাকা। লালারুখ, ভাড়া ১,৮০০-২,০০০ টাকা। কাশ্মীর রেসিডেন্সি, ভাড়া ১,০০০-৩,৫০০ টাকা। বুকিং : ০১৯৪-২৪৫৭৯২৭।

জম্মু-কাশ্মীর পর্যটনের হোটেলের জন্য  যোগাযোগ।

ডিরেক্টর

জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজম, শ্রীনগর, ১৯০-০০১ ফোন : (০১৯৪) ২৪৭২৪৪৯, ২৪৫২৬৯১।

ওয়েবসাইট : www.jktourism.org

ভিড়ের সময় দাম বাড়ে।

প্রাইভেট হোটেল : হোটেল হায়াৎ।

(২৪৫১৬৮০), ভাড়া ১,২০০-২,০০০ টাকা। ইম্পিরিয়াল (ফোন : ২৪৫২৮০৫), ভাড়া ৪,৫০০ টাকা। সুইস হোটেল (ফোন : ২৪৭৭৬৪০), ভাড়া ১,৫০০-৩,২০০ টাকা। সাহারা হোটেল (ফোন : ২৪৭৪৫৭৮), ভাড়া ১০০০-১,৫০০ টাকা। হোটেল বসেরা (২৪৫৩৬৩৭), ভাড়া ৬,০০০ টাকা। হোটেল বাটারফ্লাই, ভাড়া ১,০০০-১,২০০ টাকা। ভিক্টোরিয়া প্যালেস, ভাড়া ১,২০০-১,৮০০ টাকা।

বুকিং ফোন : ২২১২-৭৭১৫।

হোটেল কবীর, ভাড়া ১,৪০০-১,৮০০ টাকা। হোটেল সিজন প্যালেস, ভাড়া ১,৫০০-১,৮০০ টাকা। বুকিং ফোন : ৯৮৩০৩-০৮৭০৫। হোটেল আল-হাম-জা, ভাড়া ১,০০০-১,৫০০ টাকা। হোটেল শাহ আব্বাস, ডালভিউ ভাড়া ২,০০০-২,৫০০ টাকা। বুকিং ফোন : ২৩৬০-৭২৯৩।

৩১ মে, ২০১৬ ২১:৫৪:৫০