এ যুগের বন্ধুত্ব
লিয়াকত হোসেন খোকন
অ+ অ-প্রিন্ট
গত ১২ মে ২০১৬ ইং তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশ, ঢাকার মিরপুর-১ এর ধানক্ষেত মোড়ে ক্রিকেট খেলছিল এসএসসি পরীক্ষার্থী হৃদয়। ক্রিকেট খেলায় আউট হওয়া নিয়ে হাতাহাতি হয়। এক পর্যায়ে বন্ধু বিধান স্টাম্প দিয়ে হৃদয়ের মাথায় আঘাত করলে হৃদয় মারা যায়।  বন্ধুকে বন্ধু হত্যা করে এই কী এ যুগের বন্ধুত্ব। উল্লেখ্য, ১১ মে এসএসসির ফল প্রকাশে হৃদয় জিপিএ-৫ পায়। স্কুল - কলেজ জীবনে আজকাল বন্ধুত্ব করা; বন্ধুর সাথে ঘোরাফিরা; বন্ধুর বাড়ি যাওয়া নিরাপদ তো নয়-ই বরং সর্বনাশ ঘটার সম্ভাবনা-ই বেশি। প্রায়-ই ঘটছে- বন্ধুরা তার বন্ধুকে খুন করছে। অল্প বয়সী ছেলেদের মধ্যে এর বিস্তৃতিটা সব চাইতে বেশি। মেমোরি কার্ড মোবাইল, ফেইসবুক, ল্যাপটপ, টাকাপয়সা, খেলাধুলা ইত্যাদি নিয়ে বন্ধু কতৃর্ক বন্ধু খুন হচ্ছে।

বন্ধুত্বতো আমরাও করেছিলাম একদা সেই স্কুল জীবনে (১৯৬০-৬৮); কলেজ জীবনে (১৯৬৯-৭১); বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে (১৯৭২-৭৮) এবং এরও পরে ১৯৯০ পর্যন্ত। চেনা নাই জানা নাই ১৯৭২-৭৩ সালে লঞ্চ- স্টিমারে উঠে অচেনা- অজানা ছেলের সাথে পরিচয় হতেই ক্ষনিক পরে বন্ধুত্ব হওয়া অতঃপর বন্ধ’ুর গাঁয়ের বাড়িতে বেড়ানো-  গাঁয়ের হাটে ঘুরে বেড়ানো- কত না অচেনার সংগে পরিচয়, অতঃপর আন্তরিকতা। অচেনা বন্ধু’কে গানের ভাষায় এ-ও শুনাতাম:  “ এই বন ছায়া ওই বাঁকা পথ এরা শুধু হায় জানে সেদিন আমায় কি বলেছো তুমি গানে”............. রবীন মজুমদারের গাওয়া গানের এই কথাগুলি। এটা ওটা খাওয়ায়ে অজ্ঞান করে সব কিছু লুটপাট করে চম্পট করার দিনতো তখন ছিলোনা। আজ অজানা- অচেনা লোকের সাথে পরিচয় হওয়া মানেই এটা ওটা খাওয়ায়ে সব কিছু নিয়ে চম্পট দেয়ার ঘটনাই হরহামেশা ঘটছে। বন্ধুত্ব হলেই তো স্বার্থের জন্য দু’দিন বাদেই বন্ধু বন্ধুকে খুন করে ফেলছে। এ- ও মনে আছে, পত্র মিতালী অর্থাৎ চিঠি পত্র লিখতে লিখতে বন্ধুত্ব, তারপর অচেনা- অজানা বন্ধু’র নিমন্ত্রণে ছুটে গিয়েছি সুদূর- সুনামগঞ্জ, দিনাজপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট, সিলেট, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, পাবনা, রাঙামাটি, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম আর কতনা জায়গায়। ১৯৬৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ছিলো ১০ হাজার পত্রমিতা, ওদের অনেকের সংগেই ঘনিষ্টতা, কতই না বন্ধুত্ব- এরা কেউ তো আমাকে খুন করলোনা। এ- ও শুনিনি, সেই যুগের কেউতো খুন ও হয়নি বন্ধু কর্র্তৃক। তখনতো কেউ-ই বন্ধু’ কে খুন করা, বন্ধু’র সর্বনাশ করার কথা ভুলেও কখনও ভাবতে পারেনি। বরং বন্ধু যেনো বন্ধুকে বুকে আগলে রেখে মনের আনন্দে গাইতো, “তুমি আর আমি দু’জনাতে রচি গান। এ গান দোলায় সারা নিখিলের প্রাণ।”

বন্ধু’র ডাকে পাহাড়িয়া রাঙামাটিতে বেড়াতে গিয়ে (১৯৭২ সালে) মনের কোনে উঁকি দিয়ে ছিলো ১৯৪৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নীলাঙ্গুরীয় ছবিতে অনিমা দাশ গুপ্তার গাওয়া নায়িকা যমুনা দেবীর লিপে -“ এই রাঙামাটির দেশে এই গাঁয়ের পথের ধারে আমার মনের মানুষ এলো কী তাই আজ মন ভোলাবে..........” গানের এই কথাগুলি। আমাদের যুগে বন্ধুত্ব এমনই নিবিড় ছিলো যে বন্ধু বিদায় নেয়ার ক্ষনে হৃদয়ে তোলপাড় খেতো বলেই- “ দূর কোন পরবাসে তুমি চলে যাইবারে বন্ধু কবে আইবারে” গানের এই কথাগুলি। শচীন দেব বর্মনের গাওয়া এই গান যখন এই ৬৩ বছর বয়সে শুনি তখন মনে পড়ে কত না বন্ধু বান্ধবীর কথা। একদা এক বন্ধু আরেক বন্ধু’ কে দুষ্টামির ছলে এ - ও বলতাম গানের ভাষায় ঃ“ ও বন্ধু রঙিলা রঙিলারে ....... তুমি হও চান্দরে বন্ধু আমি গাঙের পানি জোয়ারে ভাটাতে হবে নিতুই জানাজানিরে বন্ধু নিতুই জানাজানি......।” বন্ধু- বন্ধু কত মিল, কত ভালোবাসা ছিলো সেই অতীত যুগে। নদীতে- খালে- বিলে নাও ভাসায়ে দূরে বহুদূরে চলে যেতাম কোনো এক নির্জন প্রান্তরে। কখনওবা বন্ধু না এলে গুণ গুণ করে কেউবা গাইতো-“ভাসিয়ে দিলেম মালা..... তুমি যদি আসিবে না এ মালা নিবে না গলে......”। আহা কতই না মধুময় ছিলো বন্ধুত্বের দিনগুলি। বন্ধু-বন্ধু মিলে- কানন দেবী, সুরাইয়া, নিন্মি, সুচিত্রা সেনের ছবি দেখা। গভীর রাতে হাতে হাত রেখে-” অজানার ডাক এলো ভাবনার বনছায়ে ওই শুনি বানী তার দক্ষিন বায়ে .......” গাইতে গাইতে নিজ নিজ ঘরে ফেরা। কখনো বা একত্রে ঘুমিয়ে পড়া। গান গেয়ে গেয়ে বন্ধু আরেক বন্ধু’ কে শুনাতো: “ কি ও বন্ধু কাজল ভোমরারে কোনদিন আসিবেন বন্ধু কয়া যাও কয়া যাওরে.......।” একদা নদীর ঘাটে কলসী কাঁখে বসে কেউ কেউ বন্ধু খুুঁজতো - নৌকো বেয়ে যায় নিত্য দিন চেনা নাই জানা নাই এমন একজনকে হঠাৎ তার ভালও লেগে যায়। সেই ক্ষণে বন্ধুত্ব করার আশায় ভাল লাগা মানুষটির উদ্দেশ্যে গাইতো-“ ওরে ও বিদেশি বন্ধু ও তুই গাঙের ক’লে / ও যে সাঁঝের বেলায় রোজ বেয়ে যাস তরী / আমি একলা ঘাটে বসে যে ভাবি ভাসায়ে ঘাঘড়ি/ ভাটির টানে সাথে সাথে তোর ভাটিয়াল সুরে / সাধের কাজল যায় ধুয়ে গো নয়ন আমার ঝুড়ে ... বলি তুই যদি গাঙ হোসরে বঁধূ তাইতে ডুবে মরি ...“। ১৯৩৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সোনার সংসার ছবিতে কমলা ঝরিয়ার গাওয়া গানে এই কথা গুলি মনে হলে ভাবি আর ভাবি, অমন গান আর কী হবে-হবেও না কোনোদিন। আজ এমনটি কী ভাবা যায় ।  ইস্ সেদিন ছিলো বন্ধু’র প্রতি বন্ধু’র কত দরদ কত মায়া মমতা। “ বন্ধুরে তুমি বিহনে বন্ধু মনোব্যথা কাহারে জানাই”- ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গাওয়া  এই গান যখন শুনতাম তখন বন্ধু’র জন্য মন পুড়তো, বিপদে বন্ধু’র পাশে দাঁড়াতাম। মায়া মমতা জড়ানো দরদী গান এখন আর হয়না বলেই এ জমানার উঠতি বয়সীরা কেমন জানি পাষান হতে চলেছে। আহা সেই দিন কী আর ফিরবে- বন্ধু বন্ধু ছিলো কত না মিল- মোহাব্বত। সেকালের বন্ধুত্ব যেনো ছিলো ঃ “সাগরের বুকে মোরা যে ঢেউ এর সাথী পাগল হাওয়ায় আমরা দু’জনে মাতি........” এই গানেরই কথার প্রতিচ্ছবি। অতীত ছিলো বন্ধুত্বের স্বর্ণযুগ- সেই যুগ, সেই মায়া জড়ানো দিন গুলি আর কোনো দিন ফিরবে না........। ফিরবে না বলেইতো প্রায়শঃ ঘটছে বন্ধু’র হাতে  বন্ধু খুন।

মায়াজড়ানো বন্ধু’র আজ বড়ই অভাব বলেইতো এমনটি ঘটছে  একের পর এক। এই যদি হয়, এই যুগে বন্ধুত্বের নমুনা, বাস্তব চিত্র তাহলে অভিভাবকরা কেনইবা হচ্ছেন না কঠোর আর হচ্ছেন না সতর্ক। এ যুগে আঠারো বয়সের নীচের ছেলে মেয়েরা বন্ধুত্বে জড়িয়ে পড়া মানেই নিজেকে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে যাওয়া। প্রিয় সন্তানটি কে আগলে না রাখলে দিন চলে গেলে সবই যে হারাতে হয় অভিভাবকদেরকে। আজ যার সন্তান বন্ধু’র দ্বারা খুন হচ্ছে- তারাই বোঝেন তাদের মর্মব্যথা। আর কেহ কী বুঝবেন- বুঝবেন না। বুঝবেন না বলেইতো প্রিয় সন্তানটি এক সময় বন্ধু দ্বারা খুন হচ্ছে। তাই এখনই উপলদ্ধি করতে হবে- এ কালের বন্ধুত্ব বড়ই ভয়ংকর। এ কথা সবাইকে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে যে হবেই।  নচেৎ দুর্ঘটনা ঘটার পরে দু’ চোখের জল মুছলে কি  আর প্রিয় সন্তানটিকে ফিরে তো পাওয়া যায় না ।

 

১৫ মে, ২০১৬ ১৬:৪০:০৫