চাংপাদের জীবনযাপন
লিয়াকত হোসেন খোকন
অ+ অ-প্রিন্ট
চাংপাদের মূল জীবিকা পশুপালন। পশু বলতে ছাগল, ভেড়া, ইয়াক আর ঘোড়া। বিশেষ করে পশমিনা জাতের ছাগল পালে এরা। পলাবেই না কেন, পশমিনা ছাগলের লেম থেকে যে তৈরি হয় মহার্ঘ পশমিনা শাল। চাংপাদের কাজ অবশ্য ছাগলের লোম কেটে নিকটবর্তী শহরে বা গ্রামে বেচে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পশমিনা ছাগলের প্রধান খাদ্য ঘাস। ১৫ হাজার ফুট উচ্চতায় যে ঘাস জন্মায় তা পশমিনা ছাগলের পক্ষে অতন্ত পুষ্টিকর এবং সেই ঘাস খেলে ছাগলের লোম থেকে উচ্চমানের উল পাওয়া যায়। তাই ভালো ঘাসের সন্ধানে পাহাড়ের অভ্যন্তরে বছরে অন্তত পাঁচ-ছয়বার জায়গা পরিবর্তন করে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হয় যাযাবর চাংপাদের। স্থান পরিবর্তনের সময় মালপত্র পরিবহনের কাজে লাগে ইয়াক আর ঘোড়ার দল।

লাদাখের লে শহর থেকে ২১৫ কিলোমিটার দূরে সোমোরিরি হ্রদের ধারে কোরজোক গ্রাম। এখানেই বসবাস করে চাংপারা। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৫ হাজার ফুট উঁচুতে বরফের টোপর পরা রুক্ষ পাহাড়ের কালো, নীল জলের হ্রদ, হ্রদের পশ্চিমে ছবির মতো সুন্দর চাংপাদের গ্রাম এ কোরজোক। এখানে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা বরফগলা জলে নালা বেয়ে নিচে সোমোরিরি হ্রদে গিয়ে পড়ছে। শুধু কী তাই, দু’পাশে খাড়াই পাহাড়। রাস্তার ধারের নুড়ি পাথরের জমিতে সবুজ ঘাসের আস্তরণ। সেখানে মেঠো ইঁদুর, নানা অচেনা পাখিরা খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত থাকে। ন্যাংড়া পাহাড়ঘেরা এক বিশাল উপত্যকা এ জায়গা। কিছুটা রুক্ষ পাথুরে জমি আর কিছুটা ঘন সবুজ ঘাসে মোড়া এ উপত্যকা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দূরে দূরে অনেক তাঁবু। মাঝে একটা জায়গায় ছোট ছোট পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে শিরা-উপশিরার মতো বরফগলা স্বচ্ছ জলের অনেকগুলো অগভীর ধারা এভাবে একটা জলাভূমি তৈরি করেছে। যেমন ঠাণ্ডা তেমনই খরস্রোতে এ পাহাড়ি ঝোরাগুলো। এর আশেপাশে চাংপাদের তাঁবুগুলোÑ এগুলোর ধরন-ধারণ আলাদা। চাংপাদের তাঁবুর কাছেপিঠে আছে শহুরে পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য দিতে আধুনিক ব্যবস্থাসহ বায়ু নিরোধক কাপড়ে বানানো তাঁবু। এখানে যাযাবরদের অস্থায়ী গ্রামে দু চারটে শহুরে তাঁবু যে নেই তা নয়, বাকি সব তাঁবুই ইয়াকের লোম দিয়ে বানানো। এ তাঁবুগুলো যেন অনেকটা ঝুপড়ির মতো। এগুলোর স্থানীয় নাম রেবো। প্রতিটি তাঁবুর পাশে একটা লাঠির মাথায় একগুচ্ছ ইয়াকের লোম আটকানো আছে। এর কারণ হলো অপদেবতা তাড়ানোর জন্য এভাবে লোম আটকানো থাকে। এখানের সব তাঁবুর মুখ থাকে পূর্ব দিকে। চাংপারা ফরসা হয়, তবে মুখের চামড়া রোদে পুড়ে লালচে কালো রং হয়ে যায়। প্রকৃতির রুক্ষতার সঙ্গে লড়াই করে জীবিকার্জনই এর কারণ। পুরুষদের পরনে থাকে ফুলপ্যান্টের ওপর খয়েরি রঙের লংকোট বা জোব্বা। মাথায় থাকে উলের টুপি। আর এরা পায়ে দেয় বুটজুতা। কারও সঙ্গে দেখা হতেই এ চাংপারা প্রথমে বলেন ‘জুলে’। লাদাখের মানুষজনের সঙ্গে প্রথম দর্শনে এটাই রেওয়াজ।

চাংপাদের ভাষাও আলাদা। চাংপাদের তাঁবুর সামনে থাকে তাদের পোষা কুকুর। নতুন কোনো লোক দেখলে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। এ কুকুরগুলো খুব হিংস্র হয়। চাংপা দলের প্রত্যেক পরিবারের একটা করে এ রকম কুকুর আছে। রাতে এরা ছাড়া থাকে। তুষারচিতার হাত থেকে এরা ছাগল ও ভেড়াগুলোকে রক্ষা করে। প্রত্যেক কুকুরের গলায় শক্ত আর চওড়া কাঁটা লাগানো বেল্ট থাকে, যাতে তুষারচিতার এদের গলা কামড়ে ধরে মেরে না ফেলতে পারে। চাংপাদের তাঁবুর ভেতর ঢোকার পথ একদিকে, এরই উল্টোদিকে একটা উঁচু জায়গায় ওদের উপাস্য দেবতার ছবি। সকাল-সন্ধ্যায় সেখানে প্রদীপ জ্বালানো হয়। এরা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। চাংপা গৃহকর্তা আর গৃহকর্ত্রীদের  পরনে থাকে কম্বলের জোব্বা। তবে গৃহকত্রীদের পোশাকের ঝুল বেশি। এদের চেহারা যত না বয়স্ক তার চেয়েও বেশি বয়স্ক দেখায়। চাংপাদের চা বানানোর পদ্ধতিটা ভিন্ন। এরা গরম দুধে তিব্বতি চা ফুটিয়ে তাতে নুন আর মাখন দেয়। এ ধরনের চা এরা পান করে। চা পান করার পর চাংপারা খায় সাম্বা ছাতু। এটা হলো বার্লির গুঁড়া। কখনোও বা এরা এটাই চা দিয়ে গুলে বা মেখে, তার ওপর ইযাকের দুধ থেকে নিজেদের তৈরি চিজের গুঁড়া ছড়িয়ে ওদের তিনবেলার খাবার হয়ে যায়।

খাবারটার নাম চাসুল। চাংপারা কদাচিৎ ডালভাত খায়। এছাড়া ইয়াক, ছাগল, ভেড়ার দুধ ও মাংস ওদের খাদ্য।

 

০৯ মে, ২০১৬ ১৫:৪৪:৫২