বৈশাখী পূর্ণিমা এলো নাকি আহারে, আহারে......
লিয়াকত হোসেন খোকন
অ+ অ-প্রিন্ট
গ্রীস্মের দাবদাহে কাঠফাটা রোদে গাঁয়ের মানুষ আই তাঁই করে আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে বাতাস খায়, গামছা দুলিয়ে, হাতপাখা ঘুরিয়ে, নদী পুকুরে বার বার ডুব দেয়। একটুকু ছায়া খোঁজে গাছতলায় গিয়ে; শয্যা বিছায় বাঁশ বাগানে, বন পথের পাশেই ছায়াতলে। কখনওবা জ্যোøা রাতে ছোটে কোন জ্যোøাময়ী আসরে। বাঁশের মাচানপরে বসে যায়, সবার সংগে মেতে ওঠে নানান গাল- গল্পে। গান বাজনার আসরে যায়, যায় পুঁথি পাঠের বৈঠকে। গ্রীস্মেই ছেলে মেয়েরা বনে বনে ফলমূল সংগ্রহে ছুটে বেড়ায় সেই ভোর রাত থেকেই। আম কুড়ানো, জাম কুড়ানো আরও কত কি। আর নগরীর ধনাঢ্যরা তো গ্রীস্মের তাপদাহে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষেই সময় পার করেন। চলাচল করেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতেই। মধ্যবিত্তরাতো অসহ্য গরমে অস্থির হয়, করে ছটফট।

ষড় ঋতুর এই বাংলাদেশে বৈশাখ- জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস নিয়েই গ্রীস্মকাল। গ্রীস্মের শুরুতেই দেখা দেয় কাল বৈশাখির ঝড়। তাইতো কবি লিখেছেন তাঁরই এক গানে- “ চিত্তে নাচে শ্যামা কাল বৈশাখী ঝড়ে সহসা বরষাতে কাঁদিয়া ভেঙ্গে পড়ে”। বৈশাখের আগমনে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন- “ এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ / তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষূরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক। যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি....” এই গান- আর এই গানতো গাওয়া শুরু হয় রেকর্ডে পংকজ কুমার মল্লিককে  দিয়ে। তারপর যুগে যুগে কত শিল্পী এই গান গেয়েছেন- এখনো গেয়ে চলছেন। তাই চিরদিনের গান হয়ে রইলো - “ এসো, এসো ,এসো হে বৈশাখ....”। বৈশাখ’ কে নিয়ে ‘ শাপমুক্তি’ ছবির জন্য অজয় ভট্্যাচার্য গান লিখলেন- “ বৈশাখে তার উদাস নয়ন আমের ছায়ায় বিছায়ে শয়ন / কালো দিঘি জলে আপন ছায়া সে আনমনে দেখে সাজে / মনের ঠিকানা খুঁজিয়া পায় না ভুল হয় সব কাজে ....”। আর এই গানে কন্ঠ দিয়ে রবীন মজুমদারের সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে রইলেন সুপ্রভা সরকার ও শৈল দেবী। সুর করেছিলেন টাঙ্গাইল জেলার কৃতি সন্তান অনুপম ঘটক।

এই গ্রীস্মেই তো প্রকৃতি রূপ নেয়- “ বউল ঝ’রে ফলেছে আজ থোলো থোলো আম, রসের পীড়ায় টসটসে বুক ঝুরছে গোলাপজাম/কামরাঙারা রাঙল ফের পীড়ন পেতে ঐ মুখের, স্মরণ ঝ’রে চিবুক তোমার, বুকের তোমার ঠাম- জামরুলে রস ফেটে পড়ে, হায় কে দেবে দাম” কিংবা “ আম- মুকুলের গুঁজি- কাঠি দাও কি খোঁপাতে ? ডাবের শীতল জল দিয়ে মুখ মাজ’ কি আর প্রিয়ে? প্রজাপতির ডানা ঝরা সোনার টোপাতে ভাঙা ভুরু দাও কি জোড়া রাতুল শোভাতে” কবিতার এই চরণগুলির মতনই।

গ্রীস্মের গরমে নদী পথ হয়ে কোনো এক খাল ধরে নৌকোয় চড়ে অচেনা গাঁয়ের পথে গেলে কিছুটা হলেও শীতল পরশ যে মিলবে। এমন পথ হলো পিরোজপুরের হুলারহাটের পাশ হয়ে- কৈবর্তখালি, টোনা, দাউদপুর, এগারো আনি, চলিশা, চুংগাপাশা, বাজুকাঠি দেখে দেখে দূর্গাপুরে গেলে। আহা এখানে খালের দুই তীরে কত না গাছ- গাছালি বটবৃক্ষ দেখে শুধু যে ভাববেন- “ সোনা ঝরায় আকাশ আর সোনা ফলায় মাটি / আহা আমার সোনার দেশ.... রূপালী রঙ নদীর জোয়ার প্রাণের সাড়া আনে / তার ঢেউয়ের তালে তালে জীবন জাগে গানে গানে.....” গানের এই কথাগুলিই। দূর্গাপুর গাঁয়ের খালে দেখবেন দুই কূলে- তাল, নারকেল, সুপারি আর কত না গাছের ছড়াছড়ি। যে দিকে তাকাবেন মনে হবে-“ মহুল ফুলে  জমেছে মৌ / হিজল ডালে ডাহুক ডাকে....।” নৌকো ঘাটে লাগিয়ে নেমে পড়ুন সত্যিই দেখবেন মৌমাছি আর ডাহুক। দূর্গাপুর যেনো পাখির গাঁও-ও। খাল পাড়ে সান বাঁধানো ঘাটও চোখে পড়বে বার বার। কিছু দূরে এগিয়ে গিয়ে বাঁশ বাগানের কাছেই বটবৃক্ষ তলে শীতল পাটি বিছিয়ে সেখানে না হয় শুয়ে পড়ুন। গ্রীস্মের তাপদাহে এখানে ক্ষণিকপরে ঝির ঝিরে বাতাস যখন বূকে এসে ঠেকবে তখন মনে হবে, এই ছায়াতলতো  অসহ্য গরম দূর করতে জানে। নদী, খাল, গাছগাছালি-ই চোখে পড়বে, তখন স্মৃতিতে জাগবে পুরনো দিনের কথা, পুরনো কত না গানের কথা। মনের কোনে উঁকি দিবে- “ যখন তাকাই দূরে গাঁয়ের পানে কার জল ভরা চোখ আমায় টানে আমি ভেসে যেন চলেছি হায় কোন অচেনার নায় গো...... কি দোষে ছাড়িলে বন্ধু দিলে বিষম জ্বালা গো ....” গানের কথাগুলি। তখন মনে পড়বে এই গানের অমর কন্ঠ শিল্পী গৌরী কেদার ভট্টাযাচার্যের কথা। তিনিই তো ‘ চন্দ্র শেখর’ ছবিতে সেই ১৯৪৭ সালে এই গান গেয়েছিলেন, তা তো ভোলার নয়।

গ্রীস্ম মানেই তো- ঘাম ঝরে দরদর খাল বিল চৌচির জল নেই পুকুরে। মাঠে ঘাটে লোক নেই খাঁ খাঁ করে রোদ। পিপাসায় অস্থির যাতে না হন এ জন্য সংগে নিয়ে আসা বিশুদ্ধ জল বার বার পান করুন। প্রিয় মানুষটি পাশে থাকলে যদি গাইতে জানেন তাহলে শুনাতে পারেন-“ আমি দূরন্ত বৈশাখী ঝড় তুমি যে বহ্নিশিখা / মরনের ভালে এ’কে যাই মোরা জীবনের জয়টিকা ” গানের দু’ চার লাইন। সারাদিন ক্ষন বৃক্ষের তলে কাটিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসতেই ঘাটে বাঁধা নৌকায় উঠুন। নৌকো এবার ভেসে চলবে দূর্গাপুরের খাল হয়ে হুলারহাটের পানে। ধীরে ধীরে চার দিক অন্ধকার নেমে এলে আকাশ পানে তাকিয়ে তারা গুনতে গুনতে ভাববেন- “ সেই সুন্দর অভিসার লগনে চাঁদ উঠেছিলো বুঝি নীল গগনে তব অন্তর ছিলো প্রেম মগনে ”.... সত্য চৌধুরীর গাওয়া গানের এই কথাগুলি। রাতের আলো আঁধারিতে যে দিকে তাকাবেন মনে হবে, কী বাতাস বইছে আহা দেহ মন যে জুড়িয়ে দিলো। আহা যেখানে আছে ‘দূর্গা’ সেখানে ‘পুর’ সংযোগ হয়ে হলো যে “ দূর্গাপুর। ” যদি হয় সে দিন পূর্ণিমার রাত তাহলে মনে করিয়ে দিবে- রবীন মজুমদারের গাওয়া- বৈশাখী-বৈশাখী পূর্ণিমা এলো নাকি আহারে আহারে কই গেলো সে ঐ পাহাড়ে / ঘুম নয়, ঘুম নয়, নাহি আজ দিপালী ....”  গানের এই কথাগুলি ভাবতে ভাবতে সারারাত জেগে থাকবেন হয়তো বা। নদী আর খালের জলে ভেসে ভেসে পূর্ণিমা উৎসবের কথা মনে করে  ভুলে যাবেন গ্রীস্মের তাপদাহ। গ্রীস্মের এমন দিনের ভ্রমণও হবে আনন্দময়। এই দূর্গাপুর দক্ষিণের জেলা শহর পিরোজপুরেরই এক গাঁও। ছবির মতন এই গাঁওয়ে গ্রীস্মে কী শোভা আর কী শীতল পরশ বুলিয়ে দেয়- এ পথে আসা পথিকের প্রাণে প্রাণে।

০৮ এপ্রিল, ২০১৬ ১০:০৭:১৬