শুদ্ধসঙ্গীতে অলৌকিক অবগাহন
ইকবাল হাসান, ঢাকা থেকে
অ+ অ-প্রিন্ট
গানের প্রতি ভালোবাসা থাকলেও, প্রথমেই কবুল করে নিচ্ছি, আমাদের বংশে কোনো গায়ক নেই। তবে ছোটবেলায় মায়ের আশেপাশে কারণে-অকারণে ঘুরঘুর করা বাবাকে দেখতাম গুনগুন করে গান গাইতে। 'শাপমোচন', 'পৃথিবী আমারে চায়', 'সবার উপরে'_ এমন কোনো ছায়াছবির গান হবে হয়তো। এমন পরিবারের কেউ শুধু উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শোনার জন্য কানাডার টরন্টো থেকে আকাশপথে সাড়ে ১২ হাজার মাইল উড়ে যাবে! শুনে একজন সোজাসাপ্টা বললেন, 'আপনার মাথায় ছিট আছে'।  

আর আমি ভাবি, জীবনের জন্য, বেঁচে থাকা আর স্বপ্ন দেখার জন্য, প্রায়শ না হলেও কখনও কখনও এক-আধটু উদভ্রান্ত হওয়া জরুরি। কতটা জরুরি, স্কয়ার নিবেদিত বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবে না এলে বোঝা যেত না। এ যেন শুদ্ধ সঙ্গীতে অলৌকিক অবগাহন। অনির্বচনীয় ধ্রুপদ সিঁড়ি বেয়ে আনন্দলোক আর মঙ্গলালোকের দিকে যাত্রার এক আশ্চর্য মোহনীয় অভিজ্ঞতা। 

উচ্চাঙ্গসঙ্গীত সর্বার্থে এক জটিল শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। এই শুদ্ধ সঙ্গীতই সব সঙ্গীতের মূল ভিত্তি। আর এই ভিত্তিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের নাড়ির যোগ। উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের 'গুরুজন' 'গুরুজি'দের অধিকাংশের জন্মস্থান আজকের বাংলাদেশ। জটিল বলেই উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের শ্রোতা সীমিত। এর সঙ্গে আঁকশির মতো জড়িয়ে আছে মননশীল রুচির প্রশ্নটিও। এক সময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ছিল 'এলিট ক্লাস'-এর একটি অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে প্রচলিত এসব ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিলেন শিল্পঅন্তপ্রাণ আবুল খায়ের লিটুর বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। আর্মি স্টেডিয়ামে পাঁচ দিনব্যাপী আয়োজিত বিশ্বের সর্ববৃহৎ উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের চতুর্থ এই আয়োজনে উপস্থিত ৫০-৬০ হাজার সঙ্গীতপ্রেমীর টানা ১০ ঘণ্টা সুরের মূর্ছনায় নির্ঘুম রাত্রি যাপন প্রমাণ করে এই শুদ্ধ ধারাটির প্রতি সর্বস্তরের মানুষের হার্দিক উষ্ণ ভালোবাসা। তবে উপস্থিত সবাই যে এর বোদ্ধা শ্রোতা এমন নয়। উদ্বোধনী ভাষণের এক পর্যায়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর স্বভাবসুলভ সাদামাটা বক্তব্যে বিষয়টিকে তুলে এনেছেন এভাবে, '... এখানে যারা এসেছেন তাদের সবাই উচ্চাঙ্গসঙ্গীত বোঝেন না, আমিও বুঝি না। আসি, ভালো লাগে বলে। ভালো লাগাটাই জরুরি। গান, নৃত্য, কবিতা, ছবি ও লোকসংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নিজেদের রুচিকে উন্নত করে আমরা পৃথিবীর সামনে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চাই'।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত দুর্বোধ্য_ সন্দেহ নেই, তবে এর মর্মমূলে পেঁৗছাতে প্রয়োজন ধৈর্য, রুচি ও আগ্রহ। পুরোটা বোঝা না গেলেও একটু ধৈর্য ধরে শুরুটা হজম করে নিতে পারলে সুর শব্দ ছন্দ তাল লয় রাগ বেরাগ-এর ব্যাকরণিক মেলবন্ধন আপনাকে কখন যে উড়িয়ে নিয়ে যাবে প্রশান্তির সীমানায় টেরও পাবেন না। 

২.

প্রথম দিনে মিনু বিল্লার পরিচালনায় ভরতনাট্যম দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা। এর পর পরিবেশিত বেঙ্গল পরম্পরার নবীন শিল্পীদের তবলা কীর্তন বিশেষ করে দুই শিশুশিল্পী ফাহমিদা নাজনীন ও নুশরাত-ই-জাহানের বাজনা প্রাণ ছুঁয়ে যায় শ্রোতা-দর্শকদের। উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ১০টার পর কর্ণাটকি বাঁশির সুর, সন্তুর আর রাগ মালকোষের ইন্দ্রজালে সম্মোহিত হলেন হাজার হাজার সঙ্গীতপ্রেমী। বিশেষ করে জয়াপ্রদা রামমূর্তির কর্ণাটকি বাঁশির সম্মোহনী জাদুতে আলোড়িত হলো পুরো স্টেডিয়াম। ঢাকার শ্রোতা-দর্শকদের জন্য একজন মহিলা বাঁশরিয়া হিসেবে জয়াপ্রদা নতুন এক বিস্ময় বটে। কর্ণাটকী ঘরানার এই বাঁশরিয়ার বেহাগ রাগে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর, রাগ হিন্দোলম, দক্ষিণী রাগ ভাগ্যদা লক্ষ্মী ও দেশ রাগে রবীন্দ্রসঙ্গীত 'এসো শ্যামল সুন্দর' ছিল প্রাণস্পর্শী। 

সন্তুরের জগতে রাহুল শর্মা আন্তর্জাতিকভাবে এক অতি পরিচিত নাম। পিতা পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা, যার হাতে জম্মু-কাশ্মীরের আঞ্চলিক বাদ্যযন্ত্র একশ' তারের 'সন্তুর' পরিচিতি লাভ করেছে বিশ্বব্যাপী। ১৫ বছর আগে এই শিল্পীদ্বয়ের যুগলবন্দি দেখেছিলাম কানাডার টরন্টো শহরে। আদ্যোপান্ত নিমগ্ন আর একাগ্র না হলে সন্তুরে সুর তোলা কঠিন; বলতে গেলে প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। সন্তুর শিল্পী রাহুল শর্মার কুশলী আঙুলের ছোঁয়া যেন সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলল। অসাধারণ বাজালেন। শ্রোতা-দর্শকদের যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন সন্তুরের জাদুকরী সুরের মূর্ছনায়।

বাইরে তখন হালকা কুয়াশা, শব্দহীন শিশির পতন আর মরা জ্যোৎস্নার মতো ফিকে চাঁদের আলো। অতঃপর মঞ্চে এলেন কৌশিকী চক্রবর্তী। রাগ সঙ্গীতের আর এক স্টার। পিতা সর্বজনশ্রদ্ধেয় পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী। মাঠভর্তি শ্রোতা-দর্শকের বিপুল করতালি দেখে মনে হলো, এতক্ষণ তারা যেন এই শিল্পীর আগমন প্রতীক্ষায় ছিলেন। এক অনন্যসাধারণ গায়কী ভঙ্গিতে কৌশিকী পরিবেশন করলেন রাগ মালকোষ।

৩.

দ্বিতীয় দিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর খেয়াল পরিবেশনা। বৈরাগী দিয়ে শুরু করেন তিনি। পিনপতন নিস্তব্ধতার ভেতর তিনি শোনালেন 'যামিনী হ'ল যে ভোর, বাঁশি বাজে যোগী আয়'। এর আগে পৃথকভাবে ধ্রুপদ পরিবেশন করেন বেঙ্গল পরম্পরার অভিজিৎ কুণ্ডু ও পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকার। তবলায় পণ্ডিত সুরেশ তালওয়ালকারের একক পরিবেশনা 'ঝাঁপতাল' মনে রাখার মতো। শুভায়ু সেন মজুমদারের এস্রাজের পাশাপাশি দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড নমিনি পণ্ডিত রনু মজুদারের বাঁশি। তিনি প্রথমবার উৎসবে আসা প্রবীণতম খ্যাতিমান কর্ণাটকি শিল্পী ড. বালমুরালী কৃষ্ণার সঙ্গে পরিবেশন করেন 'যুগলবন্দি'।

৪.

৩০ নভেম্বর ছিল একটি বিষণ্নময় বেদনাবিধুর দিন। এ দেশের খ্যাতনামা চিত্রকর কাইয়ুম চৌধুরী উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব মঞ্চে এদিন প্রাণত্যাগ করেন। মাঠজুড়ে ছিল বিষণ্নতার ছোঁয়া।

রোববার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শুরু হয় মণিপুরি নাচ দিয়ে। রাতের প্রথম প্রহরে সরোদে রাগ কিরওয়ানী বাজিয়ে শোনান ইউসুফ খান। আর মধ্যরাতে কন্যা সঙ্গীতা ও দুই নাতনি রাগিণী ও নন্দিনী নিয়ে বেহালায় সুর তুলতে মঞ্চে আসেন ড. এন রাজম। তিন প্রজন্মের চার শিল্পীর বেহালায় বিদ্রোহী কবি নজরুলের 'ব্রজগোপী খেলে হোলি' গানটি ছিল অসাধারণ একটি পরিবেশনা। বিদূষী শ্রুতি সাদোলিকার খেয়াল গেয়ে শোনান রাতের শেষ প্রহরে। 

৫. 

দর্শকদের কাছে নিখাদ মনোযোগ আর একাগ্রতার দাবি নিয়ে অনুষ্ঠানে এলেন শততারে বাঁধা সন্তুরের একনিষ্ঠ সাধক পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই শিল্পীর কাছে সন্তুর শুধু একটি বাদ্যযন্ত্রই নয়, এর চর্চা তার কাছে আরাধনার মতো। শিবকুমার শর্মার সঙ্গে চতুর্থ দিনে মঞ্চ আলোকিত করলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের খ্যাতিমান পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, পণ্ডিত উলহাস কুশলকর ও ওস্তাদ জাকির হোসেন। সুপারস্টারদের কারণেই এদিন ছিল চোখে পড়ার মতো উপচেপড়া ভিড়।

৬.

দরবারি কানাড়া আর সুরবাহার পরিবেশন করে উৎসবের শেষ রাতে মঞ্চ মাতালেন খ্যাতনামা সেতারবাদক ওস্তাদ বিলায়েত খাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র কানাডা প্রবাসী ইরশাদ খান। আর পুত্র ওস্তাদ সুজাত খানের সেতার ও ওস্তাদ রাশিদ খানের খেয়াল পরিবেশন বেদনা বিষাদের পরিবর্তে শেষ রাত্রির মুহূর্তগুলোকে করে তোলে প্রাণময়। 

অনুষ্ঠানের শেষ দিনের শেষ প্রহরে মঞ্চে যেন আপন শক্তিতে জ্বলে উঠলেন বাঁশির জাদুকর পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া। তখনও আলো ফোটেনি। বাঁশি হাতে নিয়ে তিনি যেন প্রভাতকেই জানালেন মুগ্ধ আমন্ত্রণ। বললেন, সকাল বেলা আমি আপনাদের মিথ্যা বলব না। এ রকম দর্শক আমি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি। বাংলাদেশ বাঁশির দেশ। ... আমি চাই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হাতে একটি বাঁশি থাকুক। 

শুরু করলেন 'রাগ কিরওয়ানি' দিয়ে, আর শেষটা করলেন এ দেশের চিরচেনা একটি ভাটিয়ালি সুর বাজিয়ে। টানা প্রায় দু'ঘণ্টা বাঁশির জাদুমন্ত্রে যে অপার্থিব সুর তিনি উপহার দিয়ে গেলেন তা এদেশের মানুষের হৃদয় মন ও মননে ঝংকার তুলবে নিরন্তর।

 

 

০৪ ডিসেম্বর, ২০১৫ ২২:৩৮:১৫