কলা গাছের যে ভেলায় ৩ হাজার মানুষ ভাসতে পারে
মাওলা বক্স, খুলনা
অ+ অ-প্রিন্ট
আদিগন্ত জলরাশি চলনবিলের অকৃত্রিম সৌন্দর্যের অংশ। সেই সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে একটি ভেলা। ভেলাটি দেখতে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী আসছেন। এটুকু পড়ে পাঠক হয়তো ভ্রু কুঁচকে ভাবছেন, একটি ভেলা দেখতে মানুষের এত আগ্রহ! পুরো বিষয়টি জানলে আপনার মধ্যেও কৌতূহল দানা বাঁধতে পারে। ভেলাটি তৈরি হয়েছে কলাগাছ দিয়ে। এ জন্য ৪,৬০০ কলাগাছ ব্যবহার করা হয়েছে। এই বিশালাকৃতির ভেলায় একত্রে প্রায় ৩ হাজার মানুষ বসতে পারে। এটিই এলাকাবাসীর কৌতূহলের কারণ।  

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যতো দূর চোখ যায় শুধুই জলরাশি। বিরাট বিরাট ঢেউ আছড়ে পড়ছে দুই পাড়ে। দিগন্ত রেখায় সবুজ গ্রাম। এক অপরূপ প্রাকৃতিক নিসর্গের অনুপম দৃশ্য যেন। লোকজন আসছেন, কেউ একা, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে হুল্লোড় তুলে। প্রত্যেকের চোখেমুখে আনন্দের ঢেউ। চলনবিলের এই জায়গাটির এলাকাবাসী নতুন নাম দিয়েছে- ‘সোনালি সৈকত’। 

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পার ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন এবং ফরিদপুর উপজেলার হাদল ইউনিয়নের কিছু অংশজুড়ে অবস্থিত বড় বিল। এখানেই ভেলা ভাসানো হয়েছে। এটি চলনবিলের দক্ষিণাংশে অবস্থিত। এখন বর্ষা মৌসুম। বিলে অথৈ জলরাশি। মনোমুগ্ধকর প্রাকৃদিক দৃশ্য দেখতে অনেকেই আসেন। সেই দল এখন ভারি হয়েছে এই ভেলার কারণে। অনেকে দূর থেকে মটর সাইকেল, মাইক্রোবাস নিয়েও আসছেন। বিলের মাঝ দিয়ে চলে গেছে পাবনা থেকে গয়েশপুর হয়ে ভেড়ামারা পাকা সড়ক। সেই সড়কের হাটগ্রাম স্থানটিই এখন ‘সোনালি সৈকত’ নামে সুপরিচিতি লাভ করেছে। 

ফরিদপুর উপজেলার ভেড়ামারা থেকে ১০ মিনিটের পথ পেরিয়ে হাটগ্রামে পৌঁছুতে এখন অনেক বেগ পেতে হয়। মাইক্রোবাস, সিএনজিচালিত অটো রিকশা, ভ্যানগাড়িতে গোটা সড়কে জ্যাম এখন লেগেই থাকে। সবার গন্তব্য সোনালি সৈকত। সড়কের দুই পাশে রকমারি দোকানপাটও বসেছে। বেড়াতে এসে অনেকে পছন্দের জিনিস কিনে বাড়ি ফেরেন। তবে ফেরার আগে অনেকের মুখেই শোনা গেছে এ কথা- দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র সৈকত দেখে এলাম! 

সোনালি সৈকতে মানুষের ভিড় 

সৈকতে আসা বিশেষ ব্যক্তিদের জন্যই বানানো হয়েছে এই ভেলা। ভেলাটি তৈরি করতে কলাগাছের পাশাপাশি প্রায় ২ হাজার বাঁশ, কয়েক হাজার ছোট-বড় পেরেক এবং প্রায় ৩ মণ দড়ি লেগেছে। কলা গাছগুলো বেশ বড়। প্রতিটি কলা গাছ ৫০ টাকা করে কিনতে হয়েছে। এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে চলনবিলের আশপাশের ৪টি উপজেলা থেকে। প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা লেগেছে বাঁশ কিনতে। সেই বাঁশ কেটে ফালি করে মাচা তৈরি করতে হয়েছে। এ জন্যও অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ টাকা। ভেলা তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় একমাস। ছয়শ দিনমজুর এ কাজে শ্রম দিয়েছেন।  

পার ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম মধু প্রথম এ বিষয়ে ভাবেন। তাকে সহযোগিতা করেন ইউপি সদস্যগণ এবং ফরিদপুর উপজেলার হাদল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সেলিম রেজা। এলাকাবাসী তাদের সাধ্যমতো চাঁদা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীর আলম মধু বলেন, ‘এটি মানুষের ভালোবাসার ভেলা। আমরা চেষ্টা করছি জায়গাটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার। এ জন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।’ 

বিলে সপ্তাহে দুদিন শুক্রবার এবং সোমবার নৌকা বাইচ হচ্ছে। নৌকা বাইচ দেখতে আসছে হাজার হাজার মানুষ। গত ৭ সেপ্টেম্বর নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল হয়েছে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর হবে ফাইনাল। প্রথম পুরস্কার মোটর সাইকেল। দ্বিতীয় পুরস্কার টেলিভিশন। মোট আড়াই লাখ টাকার পুরস্কার তুলে দেয়া হবে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে।  

পাবনা জেলার এই এলাকা এক সময় দুর্গম ছিল। সড়ক ছিল না। মাত্র ৫ থেকে ৬ বছর আগেও এই অঞ্চল ছিল চরমপন্থীদের অভয়ারণ্য। রাত দূরে থাক দিনেও কেউ এই রাস্তায় হাঁটতেন না। এখন সব বদলে গেছে। এলাকাবাসী যেন দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তাদের মুক্তির আনন্দে যুক্ত হয়েছে এই ভেলা।

 

০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ১৮:৪৫:২১