সুুন্দরবনে বাঘ কমেছে
মাওলা বক্স,(কয়রা) খুলনা
অ+ অ-প্রিন্ট
সুন্দরবনের বাঘ বর্তমান জরিপে অর্ধেকের চেয়ে কমে গেছে। বাঘের সংখ্যা নিধারনে দুই বছর ধরে চলেছে বাঘ গণনা। বনবিভাগ ক্যামেরা ট্র্যাপিং বা ক্যামেরা ফাঁদ পেতে বাঘের ছবি সংগ্রহ করে এই গণনা শেষ পর্য্যায়ে, শুধু কাগজ কলমে প্রকাশ হতে বাকি। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি থাকলেও সংশ্লিষ্ট গণনা কাজে নিয়োজিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে,বর্তমান জরিপে দু’ শতর বেশী হবেনা। অথচ বিগত জরিপে ৪৪০ টি বাঘের সংখ্যা নিধারণ করা হয়েছিল। ২০০৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ওই জরিপে বাঘের পায়ের চিহ্ন বা মাটিতে পায়ের দাগ দেখে গননা করা হয়। বর্তমান জরিপে ২৪০টি বাঘের হদিস মিলছেনা। বনবিভাগ বলছে জরিপটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। যে কারণে বাঘের সংখ্যা বেশী হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে অতিরিক্ত ২৪০টি বাঘ গেল কোথায়?

 ২০১৩ সালের জুন মাস থেকে বিশ্ব ব্যাংককের অর্থায়নে বন বিভগের সহায়তায় ক্যামেরা ট্রাপিং পদ্ধতিতে জরিপ কাজ শুরু হয় তা শেষ  এখন শেষ পর্য্যায়ে পৌঁছেছে। চূড়ান্ত সংখ্যা  চলতি জুন মাসের শেষ নাগাদ প্রকাশ করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

২০১০ সালে  রাশিয়ায় প্রথম গ্লোবাল টাইগার সামিট অনুষ্ঠিত হয়, বাংলা দেশের প্রধানমন্ত্রী সহ বিশ্বের পাঁচটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগন ওই সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলনে ১৩টি দেশ বাঘ রক্ষায় গ্লোবাল টাইগার ইনিশিয়েটিভ কমিটি গঠন করা হয়। বৈঠকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশে বাঘের সংখ্যা বাড়লেও  বাংলা দেশে বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে গেছে। কমে যাওয়ার কারণ হিসাবে বনবিভগের দাবী করছে চোরা শিকারী ও বনের অভ্যন্তরে অবস্থান কারী বনদস্যু বাহিনীগুলো মূলত দায়ী। সুন্দরবন বিষয়ক গবেষক ড, হারুন অর রশীদ জানান, চোরা শিকারীদের  যে তৎপরতার কথা বলা হয়েছে, বিষয়টি আমাদের গবেষনা ও পর্যবেক্ষণও দেখা গেছে। বাঘ কমে যাওয়ার হারকে আশঙ্কাজনক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, বাঘ কমে গেলে বা বিলুপ্ত হলে সুন্দরবনকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।  বনসংরক্ষক খুলনা সার্কেল সুনিল কুন্ডু জানান, প্রথম ধাপে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৪ সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ –পূর্ব ব্লকে ৭০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্যামেরা ট্যাপিং’এর মাধ্যমে বাঘ গণনা করা হয়েছে। একই নিয়মে ২০১৪ সালের ১১ নভেম্বর থেকে দক্ষিণ ব্লকে ৬৪০ বর্গকিলো মিটার গণনার কাজ হয়। চলতি মাসে মাসেই এর বাকি কাজ শেষ হবে। এর পর ক্যামেরা সহ ট্যাকনিশিয়ানদের তুলে আনা হবে। দুই ধাপে পাওয়া তথ্য- উপাত্ত নিধারণ করে সুন্দরবনের বাংলাদেশের অংশের বাঘের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

বাঘ বিলুপ্তির বিষয় অনুসন্ধানে সূত্র জানিয়েছে, সুন্দরবনে বাঘ পাচারকারী চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কয়েক বছর  ধরে এই সব চক্র সুন্দরবন থেকে অসংখ্য বাঘ শিকার করে তার চামড়া ও মূল্যবান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আন্তজাতিক  পাচারকারী চক্রের সাথে যোগাযোগ করে তাদের কাছে তুলে দিয়েছে। বর্তমানে একটি জীবিত বাঘের মূল্য কোটি টাকার বেশী। যে কারনে চোরা শিকারীদের কাছে জীবিত ও শিকার করা মৃত বাঘের চাহিদা বেশী। বাঘ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সিডর ও আইলার আঘাত  এবং সুমদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারনে বাঘ যতটা না হুমকির সম্মুখীন তার চেয়ে বড় হুমকী মানুষের বাঘ শিকারের তৎপরতা এবং বনবিভাগের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যার্থতা। বনবিভাগের দাবী  সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চালু হওয়া নৌরুট দিয়ে যাতয়াত করা জাহাজ, কার্গো ও ইঞ্জিন চালিত শক্তিসম্পন্ন ট্রলার গুলোতে করে বাঘসহ বন্যপ্রণী জীবিত অবস্থায় চোরাশিকারীদের  সহায়তায় পাচার হয়ে বিদেশে যাচ্ছে।

সুত্রে আরও জানা গেছে, গত ১০ বছরে  সুন্দরবনে ৫২টি বাঘ মারা গেছে এর ভেতর স্থানীয় মানুষেরা ২৪টি বাঘ পিটিয়ে এবং চো শিকারীর দ্বারা ১৭টি বাঘ হত্যা এবং বাকী ১১টি বাঘের স্বাভাবিক ভাবে মৃত্যু হয়েছে।

জীববৈচিত্র বিশেষজ্ঞ ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বাঘ চোরাচালানকারী আন্তজাতিক চক্র সুন্দরবনসহ সারা বিশ্বের বেশীর ভাগ বনে সক্রিয় রয়েছে। ওই সব চক্রের তৎপরতার কারনে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার বিষয়টি চিহ্নত  হয়েছে।

১৮ জুন, ২০১৫ ১৬:০৪:৪০