বিলুপ্তির পথে কালোমুখো হনুমান
জাহিদ আবেদীন বাবু, কেশবপুর (যশোর) থেকে
অ+ অ-প্রিন্ট
কেশবপুরে আদিকাল থেকে দল বেঁধে বসবাস করছে বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান। মহাভারতের রাম ভক্ত হনুমান দলকে ঘিরে যশোরের কেশবপুর উপজেলা পৃথিবীর বুকে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার বদৌলতে আজ সুপরিচিত জনপদ। কিন্তু যে হনুমান কেন্দ্র করে আজকের এ পরিচিতি সেই কালোমুখো হনুমান আজ ভালো নেই। খাদ্য, গর্ভকালীন নিরাপত্তা, বনাঞ্চলের অভাব ও কভার বিহীন বিদ্যুতের তারে ষ্পৃষ্ট হয়ে খাদ্য প্রায়ই হনুমানের মৃত্যু হওয়ায় কালোমুখো হনুমান আজ বিলুপ্ত হতে চলেছে।

জানা গেছে, মহাভারতের রাম ভক্ত হনুমান কবে কখন কিভাবে কেশবপুরে আগমন করে তার সঠিক কোন ধারনা পাওয়া যায়নি। তবে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় হনুমান ব্যাপক প্রচার পাওয়ার বদৌলতে কেশবপুর উপজেলা পৃথিবীর বুকে আজ সুপরিচিত জনপদ। কেশবপুর সাহা পাড়ার অধিকাংশ প্রবীন ব্যক্তিদের মতে এক সময় খরস্রোত হরিহর নদী বিধৌত কেশবপুর বাজার সংলগ্ন গ্রামাঞ্চল ফলজ, বনজ বৃক্ষে পরিপুর্ন ছিলো। ৩৫/৪০ বছর আগেও নদী বিধৌত কেশবপুর অঞ্চলে কুমির, বাঘড্যাড়া, বুনো শুকোরসহ বিভিন্ন প্রানীর পাশা পাশি অসংখ্যক হনুমান দল বেঁধে বসবাস করত। ভূমিদস্যুরা ক্রমান্বয়ে হরিহর নদী দখল করে ঘরবাড়ি, দোকান পাট গড়ে তুলায় বনাঞ্চল উজাড় হয়ে গেছে । ফলে পর্যাপ্ত খাদ্য ও বনাঞ্চলের অভাবে হনুমানদের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে । ফলে প্রচন্ড খাদ্য সংকটে হনুমান ৩৫/৪০ বছর ধরে লোকালয়ে চলে এসেছে । খাদ্য অন্বেষণ করতে গিয়ে গত ০৬/০৭ বছরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, সড়ক দূর্ঘটনা, কুকুরে আক্রমন, কীটনাশক ছিটানো ফলমুল খেয়ে প্রায় ৭৫টি হনুমানের অকাল মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কভারবিহীন বিদ্যুতের তারে স্পৃষ্ট প্রায় অর্ধশত হনুমান মারা গেছে । এছাড়া ক্ষুধার্থ হনুমান সুযোগ পেলে খাদ্যের জন্য কলা, আম, পেঁপেসহ বিভিন্ন ফলমুল বোঝাই ট্রাক, পিকআপ গাড়ীতে উঠে নামতে না পেরে অসংখ্যক হনুমান দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে খুলনা, চুকনগর, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পাইকগাছা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, মাগুরাসহ বিভিন্ন স্থানে কালমুখো হনুমান দেখা যাওয়ার স্বচিত্র সংবাদ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এ ভাবে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, সড়ক দুর্ঘটনায় হনুমান মারা যাওয়াসহ প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় হনুমানের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে ।

কেশবপুরে অন্তত সাড়ে ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ হনুমান রয়েছে। এ সব হনুমান ১০/১২ টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিচরন করে থাকে। দলের প্রধান পুরুষ হনুমান অত্যন্ত বদমেজাজি। দলের ভিতর যদি কোন হনুমান পুরুষ বাচ্চা প্রসব করলে দলনেতা পুরুষ হনুমানটি কর্তৃত্ব হারোনোর আশংকায় পুরুষ বাচ্চাটিকে মেরে ফেলার সর্বাত্বক চেষ্টা চালায়। প্রাণী বিজ্ঞানীদের মতে, এ প্রজাতি সাধারণত ৫ বছর বয়স থেকে ৬ মাস অন্তর বাচ্চা প্রসব করে। এদের গড় আয়ু ২০ থেকে ২৫ বছর। এক একটি হনুমানের ওজন ৫ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। হাত ও পায়ের পাতা মুখের মতোই কালো। পেটের দিকটা কিছুটা সাদা ও লালচে বর্নের । শরীর ধূসর বর্ণের লোম দ্বারা আচ্ছাদিত। চলাফেরা করার সময় এরা লেজ উচুঁ করে চলে থাকে। কেশবপুর উপজেলা পরিষদ, পশুসম্পদ কার্যালয়, খাদ্যগুদাম এলাকা, কলেজ পাড়া, রামচন্দ্রপুর, ব্রম্মকাঠি, বালিয়াডাঙ্গা, মধ্যকুল, কেশবপুরের সাহাপাড়া, মুজগুন্নি, ভোগতি গ্রামসহ বিভিন্ন লোকালয়ে একটি পুরুষ হনুমানের নেতৃত্বে ১০/১৫ টি হনুমান দলঁেবধে বিচরন করে। ক্ষুধার্ত হনুমান দোকানে ঝুলিয়ে রাখা বিস্কুট, কলা, পাউরুটি নিয়ে যায় ও মাঝে মধ্যে বসতবাড়ি, দোকান-পাটসহ মানুষের উপর হামলা চালালেও কেশবপুরের মানুষ আক্রমনাত্বক হয় না। ফলে ২০০৫ সালে জীববৈচিত্র রক্ষা প্রকল্পে কেশবপুরের হনুমান স্থান পেলে সরকারি ভাবে প্রতিদিন খাদ্য হিসাবে কলা, বাদাম, বেগুন, বিস্কুট সরবরাহ করা হয়।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরীফ রায়হান কবির জানান, হনুমানের জন্য প্রতিদিন ২১০৮ টাকা বরাদ্ধ করা হয়েছে।  যা দিয়ে প্রতিদিন কলা, পাউরুটি ও বাদাম সরবরাহ করা হচ্ছে। উপজেলা বন কর্মকর্তা হাবিুজ্জামান জানান, বর্তমানে হনুমানের খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন ৪০কেজি কলা, ২ কেজি পাউরুটি ও ২.৫০ কেজি করে বাদাম সরবরাহ করা হচ্ছে । কিন্তু এ সরবরাহ করা খাদ্য প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

এদিকে কভার বিহীন বিদ্যুতের তার স্পৃষ্ট হয়ে একের পর এক কালোমুখো হনুমানের মৃত্যুর ঘটনায়  কেশবপুর প্রেসক্লাবের উদ্দ্যোগে হনুমান রক্ষায় কভার যুক্ত বিদ্যুতের তার ব্যাবহারের দাবিতে মানব বন্ধণসহ নানা কর্মসুচি পালন করলেও কভারযুক্ত বিদ্যুতের তারের ব্যবস্থা আজও হয়নি । যা নিয়ে কেশবপুর বাসির মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে ।

কেশবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান এইচ এম আমির হোসেন, পৌর সভার মেয়র আব্দুস সামাদ বিশ্বাস, কেশবপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলাউদ্দিনসহ সুশীল সমাজ কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় বনাঞ্চল সৃষ্টি, পর্যাপ্ত খাদ্যসরবরাহ, কভার যুক্ত বিদ্যুতের তার ব্যাবহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।         

১৭ জুন, ২০১৫ ০০:০৭:০০