‘টাকার জন্য এত নীচে নামলি! এ-ও শুনতে হয়েছে আমাকে’
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
অভিনেত্রী কুবরা সেট
কুকু। রূপান্তরকামী এক বার ডান্সার, যাঁর অঙ্গুলিহেলনে মুম্বই টালমাটাল হয়ে যেত এক সময়ে। নেটফ্লিক্সের প্রথম ভারতীয় সিরিজ 'সেক্রেড গেমস'-এ সেই কুকু-র চরিত্রে অভিনয় করে হই হই ফেলে দিয়েছেন অভিনেত্রী কুবরা সেট। একে তো রূপান্তরকামীর চরিত্র তার উপর অনস্ক্রিন নগ্ন হয়েছেন বলে নিজের বন্ধুদের কাছ থেকেই কটুকথা শুনতে হয়েছে কুবরাকে। মুম্বাই থেকে ফোনে আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে সে সব কাহিনি শেয়ার করলেন কুবরা।

 

নওয়াজের সঙ্গে ইন্টিমেট সিনে অভিনয় করতে একফোঁটাও অসুবিধা হয়নি কুবরা সেটের।

প্রো-কবাডিতে সঞ্চালনা থেকে সোজা 'সেক্রেড গেমস'-এ নওয়াজের প্রেমিকা। কেমন ছিল জার্নিটা?

সোজা নয়। মাঝে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। শুধু প্রো-কবাডি কেন? যে দিন বেঙ্গালুরু থেকে মুম্বইতে পা রাখলাম, সে দিন থেকেই লাগাতার সঞ্চালনা করে যাচ্ছি। সঞ্চালনার দিকে আমার ঝোঁক তো ছিলই, ঝোঁক ছিল অভিনয়ের দিকেও। ছোটবেলা থেকেই দাদাকে (নামজাদা সঞ্চালক দানিশ সেট) দেখে আসছি সঞ্চালনা করতে। আর আমি তো শাহরুখ থেকে সলমন, অক্ষয় কুমার, রণবীর কপূর, রণবীর সিংহ— সকলের সঙ্গেই স্টেজে সঞ্চালনা করেছি। টুকটাক ছবিতেও অভিনয় করেছি।

আচ্ছা! তাহলে সলমনের সঙ্গে অভিনয় টুকটাক, আর সে জায়গায় নওয়াজ হলেই একটু সিরিয়াস?

না। বিষয়টা সলমন বা নওয়াজ নয়। আসল ব্যাপারটা আমাকে কোন চরিত্রে দেখা যাচ্ছে।সলমনের সঙ্গে আমি 'রেডি', 'সুলতান' দুটো ছবি করেছি। দুটোই হিট। কিন্তু আমি? আমি সেখানেও সেই সঞ্চালকের ভূমিকায়। 'সেক্রেড গেমস'-ই তো আমাকে কুকু-র মতো একটা সিরিয়াস রোল দিল। আশা করি, এর পর বোধহয় সঞ্চালনা, বিজ্ঞাপন— এ সব থার্ড ব্র্যাকেটগুলো থেকে বাইরে বেরতে পারব।

‘সেক্রেড গেমস’ -এর অফারটা কী ভাবে পেলেন?

গায়ক অঙ্কুর তিওয়ারি আমার খুব ভাল বন্ধু। ও-ই অনুরাগকে (অনুরাগ কাশ্যপ) আমার কথা বলেছিল। গত বছরে মুম্বই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবের রেড কার্পেটে অনুরাগের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। সেখানেই হুট করে অনুরাগ আমাকে বলেছিলেন,“মুকেশ ছাবড়ার (কাস্টিং ডিরেক্টর)অফিস থেকে ফোন আসবে। বি প্রিপেয়ার্ড।”

শুনেই বিক্রম চন্দ্রর 'সেক্রেড গেমস' বইটা কিনতে ছুটেছিলেন নিশ্চয়ই?

ঠিক ধরেছেন।কিন্তু বেমালুম বোকা বনে গিয়েছিলাম। ইম্পর্ট্যান্ট চরিত্র, অথচ বইটার প্রথমদিকে 'কুকু' নামের কোনও চরিত্রের উল্লেখই ছিল না। ৯০০ পাতার একটা বই, পুরোটা পড়া মুখের কথা নাকি! আমি তো ঘাবড়ে গিয়ে অনুরাগকে ফোন করি। অনুরাগ শুনেই বইটা সরিয়ে রাখতে বলে।

সেক্রেড গেমস-এ কুকু আদতে একজন বার ডান্সার।

প্রথমে থেকেই কি 'কুকু'-র সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি জানতেন?

একদম জানতাম। মুকেশের বাড়িতে অনুরাগ যে দিন চরিত্রটা আমাকে প্রথম ন্যারেট করেছিল, সে দিনই এ টু জেড সবকিছু খুলে বলেছিল। আমি জানতাম কুকু একজন রূপান্তরকামী। আর তাই চরিত্রটা আমার চ্যালেঞ্জিং লেগেছিল। এও জানতাম যে আমার একটা ফ্রন্টাল নুড সিন আছে।

'কুকু' চরিত্রের ইউএসপি কি শুধুই সে একজন রূপান্তরকামী?

না, তা কেন হতে যাবে? 'কুকু'-র ইউএসপি তাঁর ইমোশন, তাঁর জাদু, তাঁর শক্তি।কুকু যাঁর, মুম্বই তাঁর। জন্নত দেখতে লোকে কুকু-র কাছেই ছুটে আসে। আর সেই কুকু ধনকুবেরদের রোলস রয়েসে চড়ে গোটা মুম্বই চষে বেড়ায়। সেই গাড়িটা কখনও সুলেমান ইশার তো কখনও আবার গণেশ গাইতুণ্ডের। আবার সেই কুকুকেই কাছে টানতে মানুষে মানুষে লড়াই, ধর্মে ধর্মে লড়াই।

কুকু হয়ে ওঠার জন্য প্রিপারেশন কী ভাবে নিলেন?

বিশ্বাস করুন কোনও প্রিপারেশন নিইনি। যে দিন ফাইনালি জানতে পারলাম যে, আমিই কুকু তার পর থেকে গুনে গুনে তিন দিন পরেই শুট হয়েছে। না তো আমাকে রূপান্তরকামীদের জীবনধারা দেখার সুযোগ দেওয়া  হয়েছে, না বার ডান্সারদের ভাল করে পরখ করার সুযোগ পেয়েছি। আর এ গুলো অনুরাগই আমাকে করতে বারণ করেছিলেন। কারণটা আগেই বললাম। কুকু-র ইমোশনটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ বুক ফেটে যে কান্নাটা বেরোয়, তা একজন রূপান্তরকামীরও যা, এক সমকামীরও ঠিক তাই। তথাকথিত সাধারণ মানুষ বা সিসজেন্ডারদেরও (পুরুষ বা মহিলা) তাই। তবে 'দ্য ড্যানিশ গার্ল' সিনেমাটা দেখেছিলাম। আমাদের দেশের সিনেমায় একজন রূপান্তরকামী হয় হাততালি দিয়ে পয়সা চাইবেন, নয়তো হাসির খোরাক হয়ে ধরা দেবেন। কিন্তু "দ্য ড্যানিশ গার্ল" আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। ছবিটা রূপান্তরকামীদের বুঝতে অনেক সাহায্য করেছিল। বুঝিয়ে দিয়েছিল ওঁরাও আর পাঁচটা মানুষের মতো, সিরিয়াস। ওঁদের এ বার সিরিয়াসলি দেখানোর সময় এসেছে।

নওয়াজের মতো একটা মানুষকে ভাল না বেসে পারা যায় না বলছিলেন কুবরা।

নওয়াজের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করার অভিজ্ঞতা কী রকম?

খুবই ভাল। সব থেকে বড় ব্যাপার, নওয়াজ পাশে থাকলে কখনও টের পেতে দেন না তিনি নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি। অত বড়মাপের একজন অভিনেতার ওরকম বাচ্চাদের মতো শেখার আগ্রহ দেখা যায় না সচরাচর। চুপচাপ বসে থাকত কিন্তু ওঁর চোখ থাকত সবদিকে।

এই নওয়াজের সঙ্গেই তো সেক্স সিন করতে হবে বলে এক অভিনেত্রী 'বাবুমশাই বন্দুকবাজ' থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। আপনার কোনও সমস্যা হয়েছিল নাকি নওয়াজের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে?

সে তো গুজব। গুজবে কান দেবেন না প্লিজ (হাসতে হাসতে)। সত্যি বলছি, আমার একফোঁটাও অসুবিধা হয়নি নওয়াজের সঙ্গে সেক্স সিন করতে। ওঁর জায়গায় অন্য কেউ হলে বোধ হয় চাপ হতে পারত। আর আমার কাজটাই তো নওয়াজকে ভালবাসা।কুকুও তো গণেশ গায়তোন্ডের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। আর নওয়াজের মতো ওরকম একটা মাটির মানুষ কে ভাল না বেসে থাকা যায়? অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলোর আগে নওয়াজকে জাস্ট একটা হাগ করতাম। আর ও বলত, "বেবি চলো, সিন করতে হ্যায়।"

অন স্ক্রিন নুড হতে দ্বিতীয় বার ভাবতে হয়েছিল নাকি?

প্রথমত, ভাবার কোনও সময়ই ছিল না।দ্বিতীয়ত, আমি তো আর পর্নোস্টার নই। না তো কোনও পর্নোফিল্ম শুট করছি। আমি তখন কুকু। সেই কুকুকে যে যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, আমি ঠিক সেগুলোই করেছি। আমার এখনও মনে আছে, বন্ধুদের স্যাড সং পাঠাতে বলতাম। নুড সিন করব বলে নয়, আমাকে অনেক কাঁদতে হবে বলে। আর এই কাঁদতে হবে বলেই আমি খুব নার্ভাস ছিলাম।

এই সিন নিয়েই চারিদিকে চর্চা।

যে সিন নিয়ে নার্ভাস ছিলেন, সেই সিন নিয়েই যে আবার চারদিকে এত চর্চা হবে ধারণা করতে পেরেছিলেন?

'কেয়া দেখেগা?' এই দেখানোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত সততা। সত্যতা। আমার সেক্সুয়াল আইডেন্টিটিই আমার প্রেমিকের অজানা। সে দেখতে চাইছে। অথচ আমার মনের মধ্যে ভয়, যদি এ সব জানার পর সে আমাকে ছেড়ে চলে যায়। 'সেক্রেড গেমস'-এ আমার প্রথম শটই ছিল এইটা। সাত বার টেক নিয়েছিল অনুরাগ। সেই ঘরে আমি, নওয়াজ আর ডিওপি ছাড়া কেউ ছিল না। অনুরাগ প্রত্যেক বার কোথা থেকে একটা চলে আসত আর আমাকে এক পেগ করে হুইস্কি ধরিয়ে দিয়েই বলত "আরেকটা টেক নেব! প্লিজ, আমার উপর রাগ করো না, আই লাভ ইউ।" ব্যাস উধাও হয়ে যেত। প্রত্যেকবারই আমি হাউ হাউ করে কাঁদতাম। এ দিকে অনুরাগ এত বার করে টেক নিচ্ছে, বুঝতেও পারছিলাম না, ঠিক হচ্ছে না ভুল। শেষ বারটা মনে আছে, এত কষ্ট হচ্ছিল যে সত্যিই কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরেই পড়ে গিয়েছিলাম।

সম্বিত ফেরে যখন ইউনিটের সবাই হাততালি দিতে থাকে। সামনে দেখি অনুরাগ দাঁড়িয়ে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে ওঁকে জিজ্ঞেস করি, "অনুরাগ, আমি কি সেক্রেড গেমসে থাকছি?" অনুরাগ বলে, "কেন থাকছ না? তুমি জান না, তুমি আমাকে কী সিন দিয়েছ!" আর সঙ্গে সঙ্গে নেটফ্লিক্সের অফিসে ফোন করে চিৎকার করে বলে ওঠে, "'কুকু'-কে পেয়ে গিয়েছি। এ বার শুটিং পুরোদমে চলবে।"

এই কুকু-র চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নাকি অনেকেই ছি ছি করেছেন?

সে তো করবেনই, এ ছাড়া আর তো কিছুই করার নেই তাঁদের।আমার এক বন্ধুই আমাকে মেসেজ করেছিল, "আমি ভাবতেও পারিনি তুই টাকা আর খ্যাতির জন্য এতটা নীচে নেমে গিয়েছিস। তোর এই চরিত্রে অভিনয় করা ঠিক হয়নি।" এটা ছিল তাঁর বার্তা। তবে এ সবে আমার কিসসু আসে যায় না। জীবনে চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে অভিনয় না করলে আর অভিনেতা হওয়ার মানেটা কী দাঁড়াল?'সেক্রেড গেমস' দেখে তো আমাকে অনেকে এও বলেছেন, তুমি কি সত্যিই রূপান্তরকামী?"

বেস্ট কম্পলিমেন্ট এখনও অবধি কার কার কাছে পেলেন?

প্রথমেই মায়ের কাছে। 'সেক্রেড গেমস' দেখে মা আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। অনুরাগকেও ফোন করে ধন্যবাদ জানিয়েছিল মা। আমার মা আর দাদা দু’জনের সাপোর্ট পেলে জীবনে আর কিছু চাই না। তবে দিন কয়েক আগে সইফ আলি খানের একটা ইন্টারভিউ দেখছিলাম। সেখানে শুনলাম কুকু চরিত্রটা করিনা কপূরের খুব পছন্দ হয়েছে। আমার অভিনয়ও নাকি সইফ আর করিনার ভাল লেগেছে।

আপনার জায়গায় যদি 'সেক্রেড গেমস'-এ সত্যি সত্যিই রূপান্তরকামী কেউ অভিনয় করতেন?

আমি সে দিন সব থেকে খুশি হতাম। মোবাইলে দেখেও ওঁদের জন্য দাঁড়িয়ে হাততালি দিতাম। সিটি মারতাম। খুবই দুর্ভাগ্যজনক, যে এ দেশে এখনও পুরুষের ঠোঁটে লিপস্টিক আর শাড়ি পরিয়ে রূপান্তরকামী সাজানো হয়। তবে আশাব্যঞ্জক দিকটা হল বিপ্লব শুরু হয়ে গিয়েছে। আমি যখন একজন মহিলা হয়ে রূপান্তরকামীর চরিত্রে অভিনয় করলাম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ বার ট্রান্সজেন্ডারের চরিত্রে ট্রান্স মানুষজনই ডাক পাবেন।

ঘন ঘন কাজ নয়, এখনও হলি ডে মুডেই রয়েছেন কুবরা সেট।

টাইপকাস্ট হয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করে নাকি মনের মধ্যে?

'রেডি' তে আমি বাইসেক্সুয়াল হয়েছিলাম। 'সেক্রেড গেমস'-এ ট্রান্সজেন্ডার। কই টাইপকাস্ট হলাম না তো!ফের যদি কুকু-র মতো একটা চরিত্রের অফার পাই, তা হলে আবারও করব। শুধু রূপান্তরকামী হলেই চলবে না, কুকু-র মতো একটা চরিত্রও হতে হবে।

'সেক্রেড গেমস' যদি ওয়েবসিরিজ না হয়ে একটা পুরোদস্তুর সিনেমা হত?

কোনও দিন সম্ভব নয়। ৯০০ পাতার একটা বই থেকে দু'ঘণ্টার একটা সিনেমা সম্ভব নাকি? 'সেক্রেড গেমস টু'ও আসছে। আর ধরে নিই যদি সিনেমা হয়ও, তাতেও মানুষ দেখতে আসতেন। সাঁস-বহু সিরিয়াল দেখার দর্শক বেশি থাকলেও, কন্টেন্ট ড্রিভেন সিনেমা দেখার দর্শক কিন্তু এখন কম নেই। যদিও সেন্সর বোর্ডের কাঁচির মুখোমুখি হতে হত ছবিটাকে। কী দরকার সে সবের। নেটফ্লিক্স যুগ যুগ জিও। নেটফ্লিক্সে এ দেশের বহু মানুষ 'সেক্রেড গেমস' দেখেছেন। এখনও অনেকে দেখছেন। এমনকি আমি এও শুনেছি, বিশ্বকাপ খেলা থামিয়েও নাকি অনেকে 'সেক্রেড গেমস' দেখেছেন।

'সেক্রেড গেমস টু' তে কুকু আবার ফিরছে নাকি? বা সামনে নতুন কোনও প্রজেক্ট?

'সেক্রেড গেমস টু' তে আর কোনও চান্স নেই। এমনিতেই আমার ঘন ঘন কাজ পোষায় না। সবে মলদ্বীপ থেকে ছুটি কাটিয়ে ফিরেছি। এখনও ঘোর কাটেনি। হলিডে মুডটা আর কিছুদিন থাকবে মনে হচ্ছে। সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

 

০২ আগস্ট, ২০১৮ ০৬:১১:১৯