এই মেয়ে কেন সানি লিওন হতে চান...
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট


ছোট্ট বসার ঘর। সাজানো, টিপটপ। এক কোণে গোছানো ডাইনিং টেবিল। কোনও এক রঙিন সকালে সেই টেবিলে বসে গ্লাসে জল ঢালতে ঢালতে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেয়ে বলল, আমি ‘সানি লিওন’ হতে চাই। ঠিকই পড়েছেন আপনি। যেমন ঠিকই শুনেছিলেন টিনএজার মেয়েটির আঁতকে ওঠা  বাবা। দরজায় দাঁড়িয়ে হতবাক মা প্রথমে কী বলবেন বুঝেই উঠতে পারছিলেন না। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত! মেয়ের অ্যাম্বিশন কিনা ‘সানি লিওন’ হয়ে ওঠা! এ মেয়ে বলে কী?

ঠিক এখানেই প্রশ্ন তুলেছেন পরিচালক রামগোপাল ভার্মা। সেই পরিচালক যিনি গত ৮ মার্চ অর্থাৎ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন টুইট করেছিলেন, ‘আমি চাই পৃথিবীর সব মহিলা পুরুষদের ততটাই আনন্দ দিন, যতটা সানি লিওন দেন।’ এ নিয়ে তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেই রামগোপালই এখন প্রশ্ন তুলেছেন, বাড়ির মেয়ে যদি ‘সানি লিওন’ হতে চায়? পর্নো ইন্ডাস্ট্রিকেই বেছে নিতে চায় কেরিয়ার হিসেবে? সেটা কেন কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না কোনও অভিভাবক? এই বিষয়টিকেই তাঁর প্রথম শর্টফিল্মে তুলে এনেছেন রামগোপাল। ফিল্মের নাম ‘মেরি বেটি সানি লিওন বন্‌না চাহতি হ্যায়’। সদ্য ইউটিউবে মুক্তি পেয়েছে। সাজানো বসার ঘরে খুব শান্ত ভঙ্গিতে ছবির তরুণী মেয়েটি দৃঢ় গলায় তার ইচ্ছের কথা বলে ফেলেন বাবা-মাকে। আর এ হেন ইচ্ছের কথা শুনে রাগে কাণ্ডজ্ঞান শূন্য বাবা ও কেঁদে আকূল মাকে একটার পর একটা যুক্তি দিতে থাকেন তিনি। বোঝাতে থাকেন তাঁর এ হেন ইচ্ছের বিবিধ কারণ।

রামগোপাল বরাবরই নিজস্ব ঢঙে গল্প বলতে ভালবাসেন। এ বার যেন চলতি ভাবনার গোড়ায় আঘাত করেছেন পরিচালক। ‘সানি লিওন’ আমাদের এই সময়ে সেক্স ফ্যান্টাসির অন্যতম নাম হতে পারেন। লুকিয়ে তাঁকে দেখতে ভারি সুখ। শুধু সানি লিওনই বা কেন, গত কয়েক বছরে ইন্টারনেটের দৌলতে এ দেশেও সব রকম পর্ন ছবির জনপ্রিয়তাই হুড়হুড় করে বেড়েছে। কিন্তু ওই পেশায় নিজের বাড়ির মেয়ে যেতে চাইলেই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে! সামাজিকতা, লোকলজ্জা, শিক্ষা— বিবিধ আভিধানিক শব্দ এসে পথ আগলায়! যে আয়নায় অন্যের মেয়েকে অনায়াসে মেনে নিই আমরা, আমাদের সমাজ, সে আয়নায় নিজের মুখ দেখাটা আজও রপ্ত করতে পারিনি।

যেমন বছর ৪৫-এর এক শিক্ষিকা। শহুরে, আধুনিক, প্রগতিশীল ভাবনার অধিকারী বলে নিজেকে মনে করেন। তবুও সন্তানের এই দাবি মেনে নিতে মানসিক ভাবে জোর পাচ্ছেন না। তিনি বললেন, ‘‘ছেলেমেয়েরা বড় হলে অনেক কিছুই মা-বাবাদের মেনে নিতে হয়। আমাদেরও ওই বয়স ছিল। তবে আমার কলেজ পড়ুয়া মেয়ে এ সব কথা কোনও দিন বলার সাহস পাবে বলে মনে হয় না। আর যদি এ সব করতেও চায় আমরা মধ্যবিত্ত মানসিকতায় এটা মেনে নিতে পারব না।’’ তাঁর ভাবনা মিলে যায় রামগোপালের ছবির সঙ্গে।

পেশা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা

রামগোপালের ছবির টিনএজার চরিত্র এই মোক্ষম জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাদের। বাবা যদি ব্যাঙ্ক-কে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পান, মেয়েটি পাবে না কেন? সেই স্বাধীনতা তো সকলের রয়েছে। কিন্তু পেশা যদি হয় পর্নোগ্রাফি? দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্বের অধ্যাপক অভিজিত্ কুণ্ডুর কথায়, ‘‘রামগোপাল খুব বুদ্ধিমান পরিচালক। অনেক এগিয়ে ভাবেন। সে কারণেই এমন একটা বিষয় নিয়ে ছবি করেছেন। সোশ্যাল ট্যাবুগুলোতে আঘাত লাগবে। যেটার দরকার ছিল। কারণ সমাজ যে খুব একটা এগিয়ে গিয়েছে এটা বলব না। এখনকার ছেলেমেয়েদের পর্ন নিয়ে ছুত্‌মার্গ কমেছে, তবে অ্যাজ আ প্রফেশন এটা নেওয়ার কথা তারা হয়তো এখনও ভাবে না।’’

ধরা যাক ঋ-এর কথা। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যথেষ্ট সাহসী মুখ তিনি। তবুও এটা তাঁর সাহসেও কুলোয়নি। ঋ বললেন, ‘‘থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিতে দাঁড়িয়ে আমার এখন সেই সাহসটা নেই। এখানে ‘গান্ডু’র মতো ছবি করার পরই আর কাজ পাই না! লোকে ভাবে ঋ-তো পর্নস্টার টাইপ। তবে বিদেশে হলে পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে কেরিয়ার করার কথা হয়তো ভেবে দেখতাম।’’

আবার সাবলীল ভাবে এ প্রসঙ্গে কথা বললেও নিজের নাম মিডিয়ায় না লেখার অনুরোধ করলেন শহরের এক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। সিঙ্গল সেক্সের কথাও স্বীকার করলেন। তবে এই পেশায় আপত্তি রয়েছে তাঁরও। সটান বললেন, ‘‘না না, পর্ন ইন্ডাস্ট্রিকে কেরিয়ার হিসেবে নেব কখনও ভাবিনি। তবে পর্ন মুভি দেখাতে কোনও সমস্যা নেই আমার। কয়েকজনের সঙ্গে যৌন সম্পর্কও হয়েছে।’’

কিন্তু মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, ‘‘যদি কোনও মহিলা এই প্রফেশন বেছে নিতে চান সেক্ষেত্রে নৈতিক ঢেঁকুর তোলার কিছু হয়নি।’’

প্রশ্মটা সম্মানের?

ঢেঁকুর তবু তোলে সমাজ। এবং তাই, পর্ন ইন্ডাস্ট্রিকেই যাঁরা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন তাঁদের সম্মানের চোখে দেখার মতো মানসিকতা এখনও তৈরি হয়নি সমাজের। ঠিক যেমন ভাবে প্রয়োজনে যৌনকর্মীর কাছে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা করতে গেলেই হিপোক্রেসি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন কোথাও সমাজ হয়ে যায় ‘সতী’, আর সানি লিওন ‘অসতী’। ছবিতে মেয়েটির বাবা যখন বলে ওঠেন, ‘‘সানি লিওন শুধুমাত্র একটি বস্তু। ব্যবহার করা হয়ে গেলে যাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়।’’ মেয়ের উত্তর, ‘‘প্রত্যেক পেশার প্রত্যেক মানুষকেই ব্যবহার করা হয়ে গেলে ছুঁড়ে ফেলা হয়। একটা সময়ের পর সকলকেই তো অবসর নিতেই হয়।’’

সেক্সুয়ালিটি যখন প্রপার্টি

রামগোপালের ছবির মুখ্য চরিত্র মনে করেন, যৌনতা তাঁর প্রপার্টি। তাকে যেখানে খুশি যেভাবে খুশি খরচ করবেন। সে কারণেই তিনি বেছে নিতে চান এই পেশা। পৃথিবীতে সকলেই কিছু না কিছু বিক্রি করেন নিত্যদিন। কেউ মেধা, তো কেউ শ্রম…আরও কত কী! পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিক্রি হয় যৌনতাও। যা ক্রয় ও বিক্রয়ে কোনও আপত্তি নেই, শুধু ওই নির্দিষ্ট প্রফেশন বেছে নিতে চাইলেই শুরু হয়ে যায় নীতি পুলিশি। তা হলে সানি লিওন যদি তাঁর পর্ন কেরিয়ারে সেক্স অ্যাপিল বিক্রি করে থাকেন, ক্ষতিটা কোথায়? সেই পথেই যেতে চায় মেয়েটিও। নিজের শর্তে বাঁচতে চায় সে। মাকে মনে করিয়ে দেয়, তাঁর মতো বিয়ে করে ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয়- স্বামীর যৌনসঙ্গী হতে নারাজ। একটু অন্য ভাবে ব্যখ্যা দিলেন মনোবিদ মোহিত রণদীপ। তাঁর কথায়, ‘‘বাস্তবে অনেকে এটা সরাসরি বলতে পারেন না। কিন্তু চলে আসেন এই পেশায়। যদি কেউ নিজেই এই সিদ্ধান্ত নেন, সেই অধিকার সকলের আছে। সেটা কেউ আটকাতে পারেন না। কিন্তু এখনও আমরা কনজারভেটিভ মনোভাবের মধ্যেই বসবাস করি।’’

কেন ‘সানি লিওন’ নামটাকেই বেছে নিলেন রামগোপাল?   

কানাডার সার্নিয়ায় এক পঞ্জাবি পরিবারে জন্ম মেয়েটির। এখন বয়স ৩৬। ছোটবেলার হকি খেলতে ভালবাসত। নার্স হওয়ার জন্য জোরদার পড়াশোনা করত সে। আবার পকেটমানি জোগাড় করার জন্য জার্মান বেকারিতে পার্টটাইমের চাকরিও। ১৮ বছর থেকেই জড়িয়ে পড়েন পর্ন ইন্ডাস্ট্রিতে। খুব অল্প দিনের মধ্যেই প্রফেশনাল তারকা হয়ে ওঠেন। একের পর এক ম্যাগাজিনের কভার শুটের অফার আসতে থাকে তখন। পরিচিতি বাড়িতে থাকে মডেলিং জগতে। ২০১১ বদলে দিল মেয়েটির জীবন। ‘বিগ বস’-এ অংশ নিলেন। সে বছরই প্রথম কোনও পর্ন তারকার ‘বিগ বস’-এ আসা। ওই রিয়ালিটি শো এপিসোড টিআরপি পেল প্রচুর। মেয়েটি অর্থাত্ সানি লিওনেরও কম লাভ হল না। ওখান থেকেই নাকি তিনি ‘জিসম ২’-এর অফার পান। ২০১২-তে মুক্তি পায় সে ছবি। এখান থেকে নতুন জার্নি শুরু হয় সানির। পর্নো ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে বলিউডি জার্নি…।  

সেই সানি লিওন, যিনি পর্নো তারকা হয়েও মেনস্ট্রিমে জায়গা করে নিয়েছেন স্বচ্ছন্দে। টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে পর্ন কেরিয়ার নিয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামলে নেন অবলীলায়। নিজের সুপারস্টার ইমেজ তৈরি করেছেন। আলাদা হয়েছেন স্টাইল স্টেটমেন্টে। পুরোটাই এই সমাজের মধ্যে থেকেই। তাঁকে দেখে ঈর্ষা করেন অনেকে, অনেকে আবার তাঁর মতো হতে চান (রামগোপালের ছবির প্রধান চরিত্র)— কিন্তু সানি লিওন যে লাইমলাইটে এ কথা অস্বীকার করেন না কেউই।

অনুত্তমা মনে করেন, ‘‘পর্ন তারকা বলে দেগে দেওয়ার সময়টা যে আর নেই বলিউড ফিল্ম করে তা প্রমাণ করেছেন সানি। স্টিরিওটাইপ ধারণাগুলো ভেঙেছেন। বিতর্ক থাকতেই পারে, তবুও যৌনতার নতুন নারীকেন্দ্রিক ভাষা তৈরি করেছেন তিনি। সে কারণেই ছবির নামে তাঁর নাম ব্যবহার করেছেন রামগোপাল।’’ চূর্ণীর উত্তর, ‘‘অডিয়েন্সকে শক করা রামগোপালের স্টাইল। ছবিটা ওঁর উওম্যানস্ ডে টুইট এবং তার নেগেটিভ রিঅ্যাকশনের ফলোআপ বা জাস্টিফিকেশন বলেই মনে হয়েছে আমার।’’

ছবির দৃশ্য। মেয়ের কথা শুনে ভেঙে পড়েছেন মা।

পরিচালক অনীক দত্ত তাঁর ‘আশ্চর্য প্রদীপ’-এ দেখিয়েছিলেন এক মধ্যবিত্ত গৃহবধূ রাতে এসকর্ট সার্ভিস দেন। অভিনয় করেছিলেন শ্রীলেখা মিত্র। মাসাজ পার্লার, এসকর্ট সার্ভিস, বা আরও অন্য কোনও নামে বেনামে, অর্থের বিনিময়ে যৌনতার আদান প্রদানের পরিসর সমাজে এখন অনেক অনেক বেড়েছে। কিন্তু যৌনপল্লির মেয়েদের মতো প্রকাশ্যে নিজের যৌনপেশার কথা স্বীকার করেন না এঁরা। সানি তো তবু স্পষ্ট করে নিজের প্রফেশনের কথা বলতে পারেন। প্রকাশ্যে অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামলান, কখনও বা এড়িয়ে যান সাবলীল দক্ষতায়। কিন্তু এ সমাজের গৃহস্থ বাড়ির অনেক মেয়ে নানান পরিবেশে, নানান পরিস্থিতিতে আড়ালে এই পেশায় আসছেন। প্রকাশ্যে সেটা বললেই যত বিপত্তি। চার পাশের সমাজ, স্বজনরাই তাঁকে একঘরে করে ফেলবেন সেই ভয়। সে প্রশ্নেই আঘাত করতে চেয়েছেন রামগোপাল। আর নিজেকে না লুকিয়ে সমাজের কাছে প্রশ্ন তোলার কাজে এই মুহূর্তে সানি লিওনের থেকে বড় নাম আর কী হতে পারে! পর্ন স্টার হিসেবে কেরিয়ার শুরু করে মেনস্ট্রিম বলিউডে জায়গা করে নেওয়া সানিকে তাই তিনি নিয়ে এসেছেন ছবির শিরোনামে। কৌতূহল বশত দর্শক ছবিটি দেখছেন। তর্কের তুফান উঠছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কেউ বাহবা দিচ্ছেন। কেউ বা মনে করছেন বাড়াবাড়ি। তবে চলতি ধারণার পালের হাওয়াটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার যে একটা চেষ্টা রয়েছে এ কথা একবাক্যে মেনে নেন প্রায় সকলেই।

ছবিটা দেখে কোনও কোনও অভিভাবক ভাবছেন, আমার মেয়েটাই যদি কোনওদিন এটা বলে…!

কী করব…?  সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা



 


১৩ জুন, ২০১৭ ২১:৩৬:০০