ছবি বাছার ক্ষেত্রে আমি খুব স্বার্থপর: জয়া
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
অভিনেত্রী জয়া আহসান
এই নিয়ে তিনটে জাতীয় পুরস্কার তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ল। কিন্তু তা নিয়ে গর্ব করতে তিনি নারাজ। ঢাকার মতো কলকাতাও তাঁর ‘বাসা’ হয়ে গিয়েছে।তিনি অভিনেত্রী জয়া আহসান। তার সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া ছবি 'বিসর্জন' সম্প্রতি ভারতে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় তিনি। কলকাতার এবেলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জয়া আহসান বলেছেন তার ক্যারিয়ার ও ব্যাক্তিগত নানা প্রসঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

এবারের নববর্ষটা তাহলে কলকাতাতেই কাটবে?

হ্যাঁ, এখনও তো এখানেই কিছুদিন রয়েছি। তবে ঢাকার অনুষ্ঠানটা খুব মিস করব। ওখানে প্রত্যেক বাড়িতে সকাল থেকে উদ্‌যাপন শুরু হয়ে যায়। তাছাড়া সব জেলাতেই বর্ষবরণের অনুষ্ঠান হয়। ঢাকাতেও হয়। সকাল থেকে বহু লোক সেখানে যান। যাঁদের খুব বড় করে উদ্‌যাপন করার সামর্থ্য নেই, তাঁরাও কিন্তু নিজেদের মতো করে কিছু না কিছু করেন। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় ওই দিনের আয়োজনও দেখার মতো।

কলকাতায় এবার আপনার কোনও আত্মীয়কে ডেকে নিচ্ছেন না কেন?

আমার বোনকে খুব পটাচ্ছিলাম, যদি আসে! ওর ‘বিসর্জন’ দেখার ইচ্ছেও হয়েছিল। কিন্তু পয়লা বৈশাখের লোভটাও সামলাতে পারছে না। আমায় বলল, জ্যাপ্‌স (জয়াকে এই নামেই ডাকেন তাঁর বোন) আমার বাড়ির নববর্ষটা মিস্‌ হয়ে যাবে! তবে আমার এক স্কুলের বন্ধু আসবে ঢাকা থেকে। ওর সঙ্গে পয়লা বৈশাখটা কাটাব।

ছবি-মুক্তির ঠিক আগেই জাতীয় পুরস্কারের সুখবরটা পেলেন...।

সেদিন হঠাৎ কৌশিকদা’র (গঙ্গোপাধ্যায়, পরিচালক) অ্যাসিস্ট্যান্ট রাজদীপ আমায় ফোন করে বলল, খবর শুনেছ? আমি তো ঘাবড়ে গিয়ে বলছি, কীসের খবর! উত্তর এল, আমাদের হয়ে গেছে তো! বেস্ট ফিল্ম, ন্যাশন্যাল অ্যাওয়ার্ড! আমি শুনেই ফোনে চিৎকার করতে শুরু করেছি। এমনিতে আমি আমার দেশে দু’বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি। কিন্তু এটা ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান। আমার জন্য তৃতীয়বার। অভিনেত্রী হিসেবে না পেলেও এটা আমাদের সকলেরই পাওয়া। তাই আনন্দের কোনও সীমা ছিল না।

 

তিনটে জাতীয় পুরস্কারের পর তাহলে অভিনেত্রী হিসেবে আপনার কলারটা আরও উঁচু হয়ে গেল?

(খুব শান্তভাবে...) না না, সেটা কখনওই হয় না। অভিনেত্রী হয়ে কোনওদিন কলার উঁচু করতে নেই, সেটা ভুল কাজ। যেদিন কলার উঁচু করব, সেদিন আমি শেষ!

এমন আনন্দের দিনে নিশ্চয়ই কালিকাপ্রসাদের কথা খুব মনে পড়েছিল?

(একটু চুপ করে থেকে...) ভীষণ! যে ক্ষতিটা হয়েছে, সেটা অপূরণীয়। সেটা শুধু কালিকাদা’র পরিবারের ক্ষতি নয়, আমাদেরও। এখনও সেটা আমরা অনেকেই বুঝতে পারছি না। ধীরে ধীরে বুঝব! বাংলা গানের শিকড়টা ধরা একমাত্র কালিকাদা’র পক্ষেই সম্ভব। উনি ছাড়া এই কাজ আর কেউ করতেই পারতেন না। হয়তো তাই, ‘বিসর্জন’এর কাজটাও ওঁর কাছেই গিয়েছিল। আর কারও পক্ষে এর সঠিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হতো না।

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই প্রথমবার কাজ করছেন। সুযোগটা কীভাবে পেলেন?

এর জন্যে ‘ওবেলা’র ধন্যবাদ প্রাপ্য। আমার আগের সাক্ষাৎকারে আপনাকে বোধহয় বলেছিলাম, এখানকার পরিচালকেরা একটু অন্য রকম চরিত্র নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে চান না। বড্ড টাইপকাস্ট করে দেন। সেই সাক্ষাৎকারটা পড়ে কৌশিকদা’র অভিমান হয়েছিল যে এত বড় কথাটা আমি কীভাবে বললাম! আসলে কী জানেন, আমি বড় কথা ভেবে বলিনি। ‘আবর্ত’র পর থেকে আমার কাছে যে ক’টা অফার এসেছিল সবই ওই ছবির মতোই চরিত্র। তাই অনেক বড় অফারও আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। আমি বোধহয় সেখান থেকে একটু আক্ষেপ করে আপনাকে কথাটা বলেছিলাম। একটা অনুষ্ঠানে কৌশিকদা হাসতে হাসতে বলেছিল, আমরা এক্সপেরিমেন্ট করি না, তাই না? ঠিক আছে, তোর জন্য যখন কিছু লিখব, সেটা তোকে চ্যালেঞ্জ করেই লিখব!

তাহলে এই ছবিতে আপনার চরিত্রটা বেশ চ্যালেঞ্জিং বলছেন?

পদ্মার চরিত্রটাই এই ছবির কেন্দ্রবিন্দু। সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল। ইছামতীর পাড়ে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে থাকা এক হিন্দু বিধবা। তার জীবনের লড়াই নিয়েই গল্প। ঘটনাক্রমে তার আলাপ হয় নাসির আলির (আবির চট্টোপাধ্যায়) সঙ্গে। এবং তাদের মধ্যে যে সুন্দর সম্পর্কটা তৈরি হয়, সেটা নিয়ে ছবি।

‘এবেলা’র দফতরে এসে আবির বলেছিলেন আপনার নাম নাকি মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাপ। পরিচালক বললেই কেঁদে ফেলতে পারেন আপনি?

(জোর আপত্তি জানিয়ে...) এই সব কথা আপনারা একদম বিশ্বাস করবেন না! এই আবিরের জন্য আমার জীবনের কোনও সিক্রেটই দেখছি থাকবে না (হাসি)। আমি মোটেই মিউনিসিপ্যালিটির ট্যাপ নই। দৃশ্যগুলো এমনভাবে লেখা, যে আমি কেন, যে কেউ যদি একটু মন দিয়ে অভিনয় করে, চোখে জল আসতে বাধ্য! তাছাড়া মেয়েরা অনেক বেশি সংবেদনশীল ছেলেদের তুলনায়। স্বাভাবিকভাবেই আমার সহজে চোখে জল এসে যায়। ও সেটা পারে না। আসলে আমার পিছনে লাগার কোনও সুযোগই আবির ছাড়ে না!

অনেকগুলো ছবি আপনারা একসঙ্গে করেছেন। এখন আপনাদের বন্ধুত্বটা নিশ্চয়ই অনেক বেশি পাকা হয়ে গিয়েছে?

কাজের বাইরেও আমাদের বন্ধুত্ব খুব জমাট। শুধু আবির নয়, ছবির বাকিদের সঙ্গেও একটা আলাদা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শ্যুটিং করা কিন্তু খুব পরিশ্রমের কাজ। তার মধ্যেই আনন্দের মুহূর্ত বার করে নিতাম। এই যেমন কবে কী মেনু হচ্ছে, শ্যুটিংয়ের পর আড্ডা, একে-অপরের পিছনে লাগা... এসব লেগেই থাকত।

কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সেট’এ খাবারের আয়োজন তো এলাহি?

আমি খুব মোটা হয়ে গিয়েছিলাম। এমনিতেই ভাত খেতে খুব ভালবাসি। তখন আরও খেতাম। কৌশিকদা অবশ্য চেয়েছিলেন যে পদ্মার জন্য একটু মোটা হই।

এখন মডেলদের মতো যা রোগা হয়েছেন, তাতে একদম বিশ্বাস হচ্ছে না...!

একদিন আমার সঙ্গে লাঞ্চ করুন, তাহলে বুঝবেন আমি কতটা ভাত খাই! তবে এখন নিয়মিত ওয়ার্কআউট করে রোগা হয়েছি। বেশিদিন ওয়ার্কআউট না করলে আমার স্ট্রেস বেড়ে যায়। খুব খিটখিটে হয়ে যাই।

আপনি নিজেও তো রান্না করতে ভালবাসেন?

কলকাতায় এসে আর ইচ্ছে করে না। আপতত দই-মুইসলি খাচ্ছি। এটাও আবিরকে দেখেই শেখা।

বাংলাদেশে আপনি এবার প্রযোজনাও শুরু করলেন?

হুমায়ূন আহমেদের শুরুর দিকের গল্প ‘দেবী’ নিয়ে ছবি করছি। গল্পটা আমার ছোট থেকেই খুব প্রিয়। পড়তে পড়তে একটা ভিস্যুয়াল সামনে ভেসে উঠত। দেখলাম কেউ এটা নিয়ে ছবি বানাচ্ছে না। তাই নিজেই করব ঠিক করলাম। নিজের প্রযোজনা ছাড়াও কয়েকটা কাজ করেছি। আমার যিনি প্রথম পরিচালক, তাঁর সঙ্গে একটা ছবি শেষ করলাম। সার্কাসের ট্র্যাপিজ পারফর্মারের গল্প নিয়ে আরেকটা ছবিও করেছি। প্রত্যেকটা চরিত্রই খুব ডায়নামিক।

প্রযোজনার কাজ বেশ ঝুঁকির। সাহসটা পেলেন কীভাবে?

বাংলাদেশ সরকার থেকে একটা সাবসিডি পেয়েছিলাম। তাই ঝুঁকিটা নিয়েই ফেললাম। শুধু অভিনয় নয়, বাংলাদেশের সিনেমাকে আরও উন্নত করার ইচ্ছে রয়েছে। যখন টেলিভিশনের একদম টপে অনেক বেশি পারিশ্রমিকে কাজ করতাম, তখন সব ছেড়ে ফিল্মে অভিনয় শুরু করি। আরও ভাল ছবি যাতে করা যায়, সেই তাগিদ থেকেই। সেটাও ঝুঁকির কাজ ছিল। 

প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল আপনার?

 আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। আবার প্যাকেজিংটাও খারাপ। এখানে দেখেছি খুব ছোট প্রযোজনা সংস্থা হলেও প্যাকেজিং ভাল হয়। সেই জায়গাটা ওখানে খুব কঠিন।

বলিউডে এখন একাধিক নায়িকাই প্রযোজক। মেয়ে হয়ে প্রযোজনা করাটা কি বেশি কঠিন?

এখনও শ্যুটিং পর্ব শেষ হয়নি। এরপর স্পনসর, ডিস্ট্রিবিউশনের ঝামেলা শুরু হবে। হল অবধি পৌঁছতেই অনেক দাদাগিরি চলে। দেখি কীভাবে সামলাতে পারি!

ছবিটা কি এখানে দেখতে পাব?

ইচ্ছে তো রয়েছে এক্সচেঞ্জ করার। আমাদের অনেক ভাল কাজ আপনারা দেখতেই পান না। আশা করছি এদেশেও রিলিজ করতে পারব।

বাংলাদেশে আপনি খুবই প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী। টলিউডে ছবি বাছার সময় কোন জিনিসটা মাথায় রাখেন?

ছবি বাছার ক্ষেত্রে আমি খুব স্বার্থপর। নতুন পরিচালক হলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু যাকে দেখে মনে হবে সৎভাবে কাজটা করতে ইচ্ছুক, আমি শুধু তার সঙ্গেই কাজ করব। অবশ্য পর পর কাজ করতে আমার ভাল লাগে না। তাহলে চরিত্রগুলোর মধ্যে ঢোকা যায় না। তাই মাঝে মাঝে ব্রেক নিয়ে অন্য কিছু করি। ইদানীং যেমন খুব গার্ডেনিং করছি। 

টলিউডে আপনার প্রেম নিয়ে বিস্তর গুজব। সেগুলো নিয়ে বাংলাদেশের লোকের কী প্রতিক্রিয়া?

তাঁরা তো সেগুলো পড়ে সব সত্যিই ভেবে নেন। তখন আবার তাঁদের বোঝাতে হয়, এখানে খুব উল্টোপাল্টা কথা হয়। এখানকার মিডিয়াও বড্ড এগুলোকে হাইলাইট করে।

বাংলাদেশে আপনার প্রেম নিয়ে চর্চা হয় না বলছেন?

ওখানেও হয়। কিন্তু এখানে বড্ড আকাশ-পাতাল কথা হয়। যেগুলো শুনে অবাক হয়ে হাসা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় থাকে না।

১৩ এপ্রিল, ২০১৭ ০৯:১১:৪৭