রেমিটেন্স প্রবাহ কমার নেপথ্যে
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট


বাংলাদেশে বৈধভাবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স কমে গেছে৷ গত ১০ মাসে রেমিটেন্স কমেছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা,এর প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা কম পাঠানো ও প্রবাসী কর্মীদের আয় কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে৷ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জানান, ‘‘২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে (জুলাই-এপ্রিল) ব্যাংকিং চ্যানেলে ৮১ হাজার ১০৮ কোটি টাকা রেমিটেন্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ হাজার ৭৩৫ টাকা কম৷ ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে রেমিটেন্স আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা৷''

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে প্রবাসীরা ১ হাজার ৩৬১ কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন, যা ২০১৫ সালের তুলনায় ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ কম৷

এর আগে ২০১৩ সালেও প্রবাসীরা তার আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ কম রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন৷ গত কয়েক বছর ধরে বৈধ চ্যানেলে বাংলাদেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সে ধসের ধারা স্পষ্ট৷ বিশ্লেষকরা বলছেন, রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হতে পারে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স পাঠাতে আগ্রহ কমে যাওয়া৷ প্রবাসী কর্মীরা ‘বিকাশ', হুন্ডিসহ নানা উপায়ে দেশে টাকা পাঠাতে আগের চেয়ে বেশি উৎসাহ বোধ করছেন৷ কারণ, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কম৷

জনশক্তি রপ্তানি বিশ্লেষক হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রবাসী শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়াও রেমিটেন্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ৷ সৌদি আরবে কাজ করতে নতুন যাওয়া শ্রমিকরা এখন সর্বোচ্চ ৬ থেকে ৮শ' রিয়াল আয় করতে পারেন, যা আগের তুলনায় অনেক কম৷ আবার নতুন নিয়মে অফিসিয়ালি যে বেতনে কাজ করতে যান, তার চেয়ে বেশি টাকা পাঠাতে পারেন না কর্মীরা৷ ফলে নির্ধারিত কাজের বাইরে ‘অড জব' করে তাঁরা যে টাকা আয় করেন তা ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠাতে পারেন না৷''

তিনি বলেন, ‘‘ফর্মাল বা ব্যাংকিং সেক্টরে ডলারের রেট কম হওয়া ছাড়াও টাকাটা বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যদের হাতে পৌঁছানোর কোনো ব্যবস্থা নেই৷ সে সুযোগ বিকাশ বা অন্য কোনো ইনফর্মাল সিস্টেমে পাওয়া যায়৷ আবার ইরাক ও লিবিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকথাকলেও সেখান থেকে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর কোনো ব্যবস্থা নেই৷''

কিরণ জানান, ‘‘কাতারসহ আরো কয়েকটি দেশে গিয়ে শ্রমিকরা প্রতিশ্রুত বেতন পাচ্ছেন না৷ যাঁরা পাচ্ছেন তারা কোনোভাবেই বাংলাদেশে মূদ্রামানে ১০-১৫ হাজার টাকার বেশি বেতন পান না মাসে৷ ওইসব দেশে প্রতারক চক্র গড়ে উঠেছে, যারা বাংলাদেশি শ্রমিকদের ঠকায়৷''

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমরা দেখেছি গত এক বছরে টাকার সঙ্গে ডলারের বিনিময় হারে ব্যাংকিং এবং ইনফরমাল সেক্টরে ব্যাপক পার্থক্য ছিল৷ প্রতি ডলারে ইনফর্মাল সেক্টরে ৭-৮ টাকা বেশি পাওয়া গেছে৷ এই ব্যাপক তফাতের কারণে আন- অফিসিয়াল চ্যানেলে অনেক রেমিটেন্স বাংলাদেশে এসেছে বলে বলা হয়ে থাকে৷ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স আসা কমেছে৷ এটা উদ্বেগজনক৷ কারণ, অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ফরমাল চ্যানেলে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়া দরকার৷ এতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ব্যক্তির কোনো সমস্যা আছে বলে মনে হয় না৷''

তিনি আরো বলেন, ‘‘বাংলাদেশ থেকে টাকা নিয়ে বিদেশে বিনিয়োগ করায় যেহেতু নানা বিধিনিষেধ আছে, তাই শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অনেক বিনিয়োগকারী বিদেশেই তহবিল সংগ্রহ করছে৷ তাঁরা সেখানেই প্রবাসীদের আয় নিয়ে নিচ্ছেন৷ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা পরিশোধ করছেন৷''

ড. নাজনীন বলেন, ‘‘এভাবে চলতে থাকলে ইনফরমাল ইকোনমি বড় হয়ে যাবে৷ ফলে অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ ঠিকঠাক থাকবে না৷ তা অর্থনীতির জন্য শেষ বিচারে ক্ষতির কারণই হবে৷'' -ডয়েচেভেলে

 


১১ জুন, ২০১৭ ২০:৫৬:২১