লাখ টাকা হবে সাড়ে ৯৬ হাজার
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক গ্রাহকদের জন্য দুঃসংবাদ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ করে ১ লাখ টাকার বেশি যে কোনো ধরনের জমার ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এই আবগারী শুল্ক, উৎসে কর, ভ্যাট, ব্যাংকের সব ধরনের সার্ভিস চার্জ এবং বার্ষিক মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করার পর যে অর্থ পাওয়া যাবে তা জমাকৃত অর্থের তুলনায় অনেক কম। বর্তমানের ৫ শতাংশ সুদে ১ লাখ টাকা জমা রাখলে বছর শেষে পাওয়া যাবে সাড়ে ৯৬ হাজার টাকা। এতে ব্যাংকিং লেনদেন সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। একই সঙ্গে অর্থ পাচারেরও আশঙ্কা করছেন।

কোনো গ্রাহকের হিসাবে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোনো সময় যদি জমা টাকার পরিমাণ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হয় তাহলে তাকে কোনো আবগারি কর দিতে হবে না। ১ লাখ টাকার ওপর ১ টাকা হলেই তাকে এ কর দিতে হবে। কেউ টাকা জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিলেও এ কর দিতে হবে। তবে টাকা জমা ও তুলে নেওয়ার ফলে কোনো সময় যদি একসঙ্গে জমার পরিমাণ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হয় তাহলে তাকে কর দিতে হবে।

আগে ২০ হাজার টাকা জমা পর্যন্ত কোনো আবগারি কর ছিল না। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত করের পরিমাণ ছিল ১৫০ টাকা। নতুন আইনে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো কর নেই। ১ লাখ টাকার বেশি থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আবগারি কর ছিল ৫০০ টাকা। এখন বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ বছরে কোনো একসময়ে হিসাবে ১ লাখ টাকার বেশি জমা হলেই ৮০০ টাকা কর ব্যাংক বছরশেষে কেটে রাখবে। ১০ লাখ টাকার বেশি থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জমা রাখলে তাকে দেড় হাজার টাকার স্থলে কর দিতে হবে ২ হাজার ৫০০ টাকা। ১ কোটির বেশি থেকে ৫ কোটি টাকা রাখলে কর দিতে হবে সাড়ে ৭ হাজার টাকার পরিবর্তে ১২ হাজার টাকা। ৫ কোটি টাকার ওপর রাখলে ১৫ হাজার টাকার পরিবর্তে কর দিতে হবে ২৫ হাজার টাকা।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের অর্থ লেনদেনে আবগারি শুল্ক বাড়ানো ঠিক হয়নি। এমনিতে ব্যাংকগুলো সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কমে গেছে। এতে করে আমানতকারী প্রতিবছরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে জনগণকে ব্যাংকবিমুখ করতে পারে। এখন যদি ব্যাংকে টাকা রেখে আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, তা হলে ব্যাংকের পরিবর্তে অন্য ঝুঁকিপূর্ণ খাতে টাকা চলে যেতে পারে। এমনকি পাচারেরও আশঙ্কা রয়েছে।

ব্যাংকিং সেবার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে করের ছোবল। সঞ্চয়ী হিসাব, মেয়াদি হিসাব, চলতি হিসাব, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিড কার্ড, ঋণের হিসাব, আমদানি-রপ্তানি সব ধরনের লেনদেনেই করের বোঝা পড়ে গ্রাহকের ওপর। আবগারি শুল্ক ছাড়া রয়েছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট, উৎসে কর ইত্যাদি দিতে হয় গ্রাহকদের। ব্যাংকের সব ধরনের সেবার বিপরীতে সার্ভিস চার্জ রয়েছে, সার্ভিস চার্জের বিপরীতে দিতে হয় ১৫ শতাংশ ভ্যাট। সঞ্চয়ের মুনাফার বিপরীতে দিতে হয় ১৫ শতাংশ বা ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের চার্জ তালিকায় দেখা যায় চেকবইয়ের জন্য ২৫০ টাকা, অনলাইন চার্জ ১০০, ডেবিট কার্ড চার্জ ৪৬০ ও বার্ষিক চার্জ ৫০০ টাকা সর্বমোট ১ হাজার ৩১০ টাকা চার্জ বাবদ ব্যাংক কেটে রাখবে। ওই চার্জের বিপরীতে আরও ১৫ শতাংশ হারে মোট ১৯৬ টাকা সরকারকে ভ্যাট দিতে হবে।

সঞ্চয় ও আমানতের প্রাপ্ত মুনাফার বিপরীতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (ইটিআইএন) না থাকলে ১৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা হয়। তবে ইটিআইএন থাকলে কর কাটা হয় ১০ শতাংশ হারে। অর্থাৎ কোনো গ্রাহক যদি বর্তমানে সুদহার ৫ শতাংশে ১ লাখ টাকা ব্যাংক জমা রাখেন, বছরশেষে ওই গ্রাহক মোট মুনাফা হবে ৫ হাজার টাকা। ইটিআইএন না থাকলে ওই মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ কর কেটে রাখার পর গ্রাহক পাবেন ৪ হাজার ২৫০ টাকা। গ্রাহকের প্রাপ্ত মুনাফা থেকে ৬০০ টাকা উৎসে কর কেটে রাখা হবে। এরপর ভ্যাটসহ সার্ভিস চার্জ বাবদ ১ হাজার ৫০৬ টাকা ও আবগারি শুল্ক বাবদ ৮০০ টাকা কেটে নেওয়ার পর টাকা থাকবে ১ হাজার ৯৪৪ টাকা। অর্থাৎ ১ লাখ টাকা রাখলে গ্রাহক সুদসহ ফেরত পাবেন ১ লাখ ১ হাজার ৯৪৪ টাকা। বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৫ শতাংশ ধরলেও এক বছরে ১ লাখ টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে দাঁড়াবে সাড়ে ৯৬ হাজার ৪৪৪ টাকা টাকা। সব মিলিয়ে বছরশেষে সুদসহ ১ লাখ টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে দাঁড়াবে ৯৬ হাজার ৪৪৪ টাকা। অর্থাৎ ১ লাখ টাকা জমা করলে ক্ষতি হবে ৩ হাজার ৫৫৬ টাকা।

এ ছাড়া গ্রাহকের বছরে বিভিন্ন ধরনের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন পড়ে। বিভিন্ন প্রয়োজনে সলভেন্সি সার্টিফিকেট নিতে হলে ব্যাংক আরও ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ কেটে রাখে। হিসাব বিবরণী নিতে হলেও কোনো কোনো ব্যাংক ১০০ থেকে ৩০০ টাকা চার্জ কেটে রাখে। অনলাইনে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ ও স্থানভেদে ১০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চার্জ নেয় ব্যাংক। এসব চার্জের বিপরীতেও রয়েছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস এ খান বলেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে ব্যাংক খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জনগণ সঞ্চয়বিমুখ হয়ে পড়বে। এতে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ কমে যাবে। ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যবসাও কমে যাবে। তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অল্প অল্প টাকা বাঁচিয়ে ব্যাংকে জমা রাখে। এখন যদি তাদের লেনদেনের ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানো হয়, তা হলে সে টাকা অন্যত্র চলে যাবে। তারা সঞ্চয়ে আগ্রহী হবে না। পৃথিবীর কোনো দেশে এটি নেই। তাই প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, যারা ব্যাংকে টাকা রাখেন, তারা একটি নিদিষ্ট হারে কর দেন। ব্যাংকে যে টাকা থাকে, তা আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত হয় ও ট্যাক্স দেওয়া হয়। কাজেই একই টাকার ওপর আবার ‘আবগারি শুল্ক’ নামে ট্যাক্স কেটে নেওয়া উচিত নয়। এতে ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে।

প্রসঙ্গত, সুদের হার কম থাকায় এমনিতেই ব্যাংকে আমানত রাখার হার এখন অনেক কম। আমানতকারীরা এখন আর ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহী হচ্ছেন না। এমন অবস্থায় আসছে স্থায়ী আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাবে বেশ শঙ্কিত আমানতকারীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আবগারি শুল্ক বাড়ানো হলে ব্যাংকে আর টাকা রাখবেন না আমানতকারীরা।

আবগারী শুল্ক আরোপের প্রতিবাদে সোশ্যাল মিডিয়াতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন জনসাধারণ। ফয়সাল আকবর নামে এক ব্যক্তি তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, গ্রামের জমি বিক্রি করে কিছু টাকা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট রাখা হয়েছিল। এখন দেখি আবগারি শুল্ক কেটে বছর গেলে টাকার অঙ্ক কমে যাবে। ব্যাংকে লাভের জন্য রেখে এভাবে আবগারি কর কাটলে দেখা যাবে এক সময় আসল টাকাই সরকার খেয়ে ফেলেছে। আমি শূন্যহাতে বাড়ি ফিরব। দারুণ বুদ্ধি অর্থমন্ত্রীর। একজন মানুষকে এমনভাবে করের নেটওয়ার্কে বেঁধেছেন অর্থমন্ত্রী যার তুলনা হয় না। বাংলাদেশে একজন মানুষ বসবাস করতে তার নিত্যদিন কত টাকা ভ্যাট দিতে হচ্ছে? তার হিসাব কষলে মাথা ঘুরে যায়। আয়ের টাকা ভ্যাটের পেছনেই যদি ঢালতে হয়, তা হলে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার উপায় থাকল কোথায়? -আমাদের সময়

০৫ জুন, ২০১৭ ০৯:৫১:৩১