রিজার্ভের অর্থ চুরি
আতিউর রহমানকে সিআইডির দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম
অ+ অ-প্রিন্ট
ড. আতিউর রহমান
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সোমবার ধানমন্ডিতে আতিউর রহমানের বাসায় যান সিআইডির ৪ সদস্যদের একটি দল। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাকে তিনটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন সিআইডির কর্মকর্তারা। বেলা ১১টার দিকে সিআইডির চার সদস্যের একটি দল ড. আতিউর রহমানের ধানমন্ডির বাসায় যায়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বেরিয়ে যান তারা। রিজার্ভ চুরির ঘটনার পরপরই চাপের মুখে পদত্যাগ করেছিলেন আতিউর রহমান। সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের ডিআইজি মো. শাহ আলম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, রিজার্ভ চুরির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। এটা রুটিন ওয়ার্ক। এর আগেও তার সঙ্গে কয়েক দফায় কথা হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত সিআইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে কেউ দেখা করতে চাইলে নিয়ম অনুযায়ী তাকে রেজিস্টার খাতায় স্বাক্ষর করতে হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনার আগে ও পরে রেজিস্টার খাতায় স্বাক্ষর না করেও অনেকে গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আতিউর রহমান সিআইডিকে জানান, তারা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সাক্ষাত্ করেছিলেন। তবে তার এমন জবাবে সন্তুষ্ট নয় সিআইডি।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় ৪০ দিন পর মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মামলা করার ক্ষেত্রে এমন বিলম্বের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা জানতে চাইলে সাবেক গভর্নর জানান, ঘটনাটি প্রকাশ হওয়ার আগেই চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। অথচ এ ধরনের ঘটনা আইন অনুযায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করতে হয়। আইনগত পদক্ষেপ ছাড়া আন্তঃদেশীয় অপরাধীদের মাধ্যমে খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধার সম্ভব নয়। 

জিজ্ঞাসাবাদে আতিউর রহমান জানান, চুরি হওয়া রিজার্ভের অর্থ ফেরত আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ফিলিপাইনে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এ ধরনের সফরের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমতির দরকার হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিধি দলের ছিল না। এছাড়া এ প্রতিনিধি দল সেখান থেকে আসার পর দাপ্তরিকভাবে এ-সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতি প্রতিবেদনও দেয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সিআইডিকে সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি আতিউর রহমান।

ড. আতিউর রহমানের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত দলের প্রধান ও সিআইডির অ্যাডিশনাল ডিআইজি শাহ আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, তদন্তকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দেশীয় যেসব ব্যক্তি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রায় সবাইকেই শনাক্ত করা হয়েছে। রিজার্ভ চুরির প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা আছে। এখন বিদেশী অপরাধীদের শনাক্তের বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে। তাদের বিষয়েও আমরা কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় চলতি বছরের ২০ ও ২২ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে খুব একটা সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় তাদের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে বলে জানান তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।

এর আগে চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে আতিউর রহমানসহ ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। ওই সময় রিজার্ভ চুরি মামলার বাদী বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের অধীন ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুমের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদাকেও টানা ৩ ঘণ্টা জেরা করা হয়েছিল।

সিআইডি সূত্র জানায়, রিজার্ভ চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক (ডিডি), সহকারী পরিচালক (এডি) এবং ডিজিএম পদের বেশ কয়েকজনের। রিজার্ভ চুরির আগে ওইসব কর্মকর্তার ভূমিকা ছিল খুবই রহস্যজনক। পরবর্তী সময়ে ওই রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়েই এ ঘটনার সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণও পাওয়া গেছে। ওই সব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই রিজার্ভ চুরির মামলায় তাদের আসামি করা হচ্ছে। জড়িত কর্মকর্তাদের দুই অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি অংশে রাখা হয়েছে যারা সরাসরি রিজার্ভ চুরির সঙ্গে জড়িত। আর যারা এ চুরিতে সরাসরি জড়িত কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করেছেন, তাদের রাখা হয়েছে আরেকটি তালিকায়। প্রথম তালিকায় রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষপদের দুই কর্মকর্তা। এছাড়া আছেন ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুমের তিন কর্মকর্তা, পেমেন্ট অফিসের এক কর্মকর্তা ও অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং শাখার সাবেক এক কর্মকর্তার নাম।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সহযোগী হিসেবে নাম রয়েছে ব্যাংকের ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুমের এক নারী কর্মকর্তাসহ ছয় কর্মকর্তার। এ তালিকায় আরো রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাজেট শাখার সহকারী পরিচালক পদের এক কর্মকর্তা এবং গভর্নরের সচিবালয়ের আরো তিন কর্মকর্তার নাম।

রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর পার হয়েছে দীর্ঘ নয় মাস। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের প্রায় ১২০ জন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। জব্দ করেছে ব্যাংকটির সাড়ে চার হাজার কম্পিউটারের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কম্পিউটার, যার মধ্যে ৫০টি কম্পিউটারে রিজার্ভ চুরির কিছু আলামতও মিলেছে। পরে ওই কম্পিউটারগুলো পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের নয় মাস শেষে সিআইডির তদন্ত দলের পক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতনদের বরাবর একটি অগ্রগতি প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিএম আব্দুল্লাহ ছালেহীন ও রেজাউল করিমের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি সম্পন্ন হতে সহায়তা করেছে। এছাড়া গভর্নর সচিবালয় বিভাগে কর্মরত মইনুল ইসলাম এবং অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের শেখ রিয়াজউদ্দিন তাদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ‘কমপ্রোমাইজড’ হতে দিয়ে মহাবিপত্তির সৃষ্টি করেছিলেন। এ বিপত্তির ফলেই হ্যাকাররা নিরাপদে রিজার্ভের অর্থ চুরি করে অন্য অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করতে পেরেছিল। তবে ট্রান্সফারের সময় ৪ ফেব্রুয়ারি আরসিবিসি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুমে একটি বার্তা আসে। ওই বার্তাটি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট শাখার যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা অবগত হয়েও বিষয়টি চেপে যান, যা রীতিমতো রহস্যজনক।

 

২০ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০৭:০৫:০৬