সংসদীয় কমিটিকে বাংলাদেশ ব্যাংক
রিজার্ভ চুরির প্রতিবেদন আটকে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী!
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম
অ+ অ-প্রিন্ট
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত
বহুল আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আটকে রেখেছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধির কাছে ওই তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হলে ব্যাংকটির কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ার বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। এবিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে এই প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আটকে রাখেনি। এটি আটকে রেখেছেন স্বয়ং অর্থমন্ত্রী। জাতীয় সংসদ ভবনে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এই ঘটনা ঘটে।  

কমিটির সভাপতি শওকত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মোহাম্মদ সুবিদ আলী ভূঁইয়া, আবদুর রউফ ও অ্যাডভোকেট নাভানা আক্তার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।  কমিটি সূত্র জানায়, আগের দুইটি বৈঠকের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবারের বৈঠকেও ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে তদন্ত প্রতিবেদনটি উত্থাপনের কথা থাকলেও তা উত্থাপিত হয়নি। এনিয়ে কমিটির সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা জানতে চান, বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও প্রতিবেদনটি কেন উত্থাপন করা হচ্ছে না? জাবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিবেদনটি অর্থমন্ত্রীর কাছে রয়েছে। তিনি এই মুহূর্তে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করতে আগ্রহী নন। এরপর কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, অর্থমন্ত্রী একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তিনি ভালো করেই জানেন সংসদীয় কমিটিকে এটা দেখাতে হবে। তাই যেভাবেই হোক প্রতিবেদনটি জোগাড় করে পরবর্তী বৈঠকে উত্থাপনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে বলা হয়। 

বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি শওকত আলী সাংবাদিকদের বলেন, রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কমিটির বৈঠকে আবারো আলোচনা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা প্রতিবেদন না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী মোট খোয়া গেছে ৮১ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ১৫ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গেছে। বাকি ৬৬ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৩৪ মিলিয়ন পাইপলাইনে আছে। আর বাকি ৩২ মিলিয়ন ডলারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। কমিটি ওই ৩২ মিলিয়ন ডলার চিহ্নিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবস্থা নিতে বলেছে বলেও জানান তিনি। 

আমরা ফরাসউদ্দিন সাহেবের প্রতিবেদন দেখতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, ওই প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রীর কাছে রয়েছে, তিনি প্রকাশ করতে চাচ্ছেন না বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি শওকত আলী। এই জবাব পেয়ে সংসদীয় কমিটি প্রতিবেদনটি জোগাড় করে পরবর্তী সভায় উপস্থাপন করতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিধিকে বলেছেন। 

শওকত আলী বলেন, অর্থমন্ত্রী দায়িত্বশীল ব্যক্তি। কিন্তু সংসদ এবং সংসদীয় কমিটিকে তো এটা দেখাতে হবে।

গত ফেব্রুয়ারিতে সুইফট মেসেজিং সিস্টেমের মাধ্যমে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে রাখা বাংলাদেশের এক বিলিয়ন ডলার সরিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি মেসেজে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার যায় ফিলিপিন্সের একটি ব্যাংকে। আর আরেক আদেশে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয় ২০ লাখ ডলার। শ্রীলঙ্কায় পাঠানো অর্থ আটকানো গেলেও ফিলিপিন্সের ব্যাংকে যাওয়া অর্থের বেশির ভাগটাই স্থানীয় মুদ্রায় বদলে জুয়ার টেবিল ঘুরে চলে যায় নাগালের বাইরে। তার কিছু অংশ উদ্ধারের পর সেই টাকা সম্প্রতি বাংলাদেশ ফেরত পেয়েছে। 

বিশ্বজুড়ে আলোচিত এই ঘটনায় সমালোচনার মুখে গভর্নরের পদ ছাড়তে বাধ্য হন আতিউর রহমান। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে আনা হয় বড় ধরনের রদবদল। মার্চ মাসে সরকারের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি, যার প্রধান করা হয় সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিনকে। ফরাসউদ্দিন ৩০ মে ওই প্রতিবেদন দেয়ার পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, রিপোর্টে যা আছে, তা অবশ্যই প্রকাশ করা হবে। এরপর কয়েক দফা সময় দিয়েও কথা রাখেননি মুহিত। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিবেদন প্রকাশ করার দিনক্ষণ ঠিক করে দিলেও তিনি পরে তার অবস্থান থেকে সরে যান। এর আগে প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিও ক্ষোভ প্রকাশ করে। তারপরে সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটিও ওই প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চেয়েছিল।

২৯ নভেম্বর, ২০১৬ ২১:২৩:২২