ইইউ-কানাডা বাণিজ্য চুক্তি ভেস্তে যেতে বসেছে
দ্য বেঙ্গলি টাইমস ডটকম ডেস্ক
অ+ অ-প্রিন্ট
কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরে সক্ষম নয় বলে মন্তব্য করেছেন কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড। কানাডা ও ইইউর মধ্যে পরিকল্পিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভেস্তে যেতে বসায় তিনি এ কথা বলেন। খবর এএফপি, সিবিসি।

কানাডা ও ইইউ ২০০৯ সাল থেকে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি (সিইটিএ) স্বাক্ষরের চেষ্টা করছে। কানাডা ও ইইউর মধ্যকার বাণিজ্যে বিদ্যমান শুল্কের ৯৮ শতাংশ প্রত্যাহার করবে এ চুক্তি। ২০১৪ সালে সিইটিএ আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার পর দুই পক্ষ চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু করে।

আগামী সপ্তাহে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ব্রাসেলস সফরকালে চূড়ান্তভাবে চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার কথা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বেলজিয়ামের একটি প্রাদেশিক সরকারের আপত্তির কারণে সিইটিএ চুক্তি ভেস্তে যেতে বসেছে। ফরাসি ভাষাভাষী প্রদেশ ওয়ালোনিয়ার আঞ্চলিক পার্লামেন্ট সিইটিএ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইইউর আইন অনুযায়ী, জোটের যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ২৮টি সদস্য দেশের অনুমোদন থাকতে হবে। ওয়ালোনিয়া সরকারের আপত্তির কারণে বেলজিয়াম সিইটিএতে সম্মতি দিতে পারছে না।

কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে সিইটিএ চুক্তি স্বাক্ষরের পথ সুগম করতে বেলজিয়াম, ইইউ ও কানাডার প্রতিনিধিরা ওয়ালোনিয়া সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। ওয়ালোনিয়ার সোস্যালিস্ট সরকারের প্রধান পল ম্যানেত এ সময় তাদের কাছে আরো কিছুদিন সময় চান।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কোনো রকমে কান্না সামলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার কাছে এবং কানাডার কাছে এটা স্পষ্ট যে ইইউ এখন আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরে সক্ষম নয়। কানাডার মতো ইউরোপীয় মূল্যবোধ ধারণকারী এবং এত ধৈর্যশীল ও উদার দেশের সঙ্গেও তারা চুক্তি স্বাক্ষর করতে সমর্থ নয়।’

ওয়ালোনিয়ার বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় কানাডার প্রধানমন্ত্রীর ব্রাসেলস সফর বাতিল হয়ে যেতে পারে। ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড সাংবাদিকদের বলেন, ‘কানাডা হতাশ হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমিও হতাশ। আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি। কিন্তু মনে হচ্ছে চুক্তিটি সম্ভব নয়। আমরা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি খুব দুঃখিত। আমার জন্য একমাত্র সুখের বিষয় হলো কাল বাড়ি ফিরে সন্তানদের দেখতে পাব।’

ওয়ালোনিয়ার মিনিস্টার-প্রেসিডেন্ট পল ম্যানেত বলেছেন, গণতন্ত্র সময়সাপেক্ষ বিষয়। এমন নয় যে আমরা কয়েক মাস সময় চেয়েছি। কিন্তু দুদিনে একটি পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এখনো সিইটিএ স্বাক্ষরের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী শার্ল মিশেল বলেছেন, ওয়ালোনিয়া সরকার কট্টর অবস্থানের দিকে ঝুঁকেছে। তিনি সিইটিএকে জোর সমর্থন জানিয়েছেন। চুক্তিটি টিকিয়ে রাখার বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রীর মতোই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ইইউর বাণিজ্য কমিশনার সেসিলিয়া ম্যামস্ট্রম। সুইডেনের এ কূটনীতিক টুইটারে পোস্ট করেছেন, ‘গত কয়েক দিন ওয়ালোনিয়ার সঙ্গে মনেপ্রাণে ব্যস্ত ছিলাম। আলোচনা থমকে যাওয়ায় সত্যিই দুঃখিত। তার পরও আশা করছি সিইটিএ স্বাক্ষরের কোনো পথ বেরিয়ে আসবে।’

ইউরোপিয়ান কমিশনও (ইসি) একই রকম আশা প্রকাশ করেছে। ইসি কার্যালয়ের একটি সূত্র এএফপিকে বলেছেন, কমিশন এটাকেই পথের শেষ মনে করছে না।

শেষ খবরে জানা গেছে, সিইটিএ চুক্তিকে বাঁচাতে গতকাল বিকাল নাগাদ ব্রাসেলসে জরুরি বৈঠক চলছিল। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের প্রধান মার্টিন শুলয কানাডার বাণিজ্য মন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড ও ওয়ালোনিয়া সরকারের প্রধান পল ম্যানেতের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড বিবিসিকে বলেছেন, এবার নিজেদের কাজ শেষ করা ইউরোপের দায়িত্ব। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

বিশ্বায়নবিরোধী সংগঠনগুলো সিইটিএর ঘোর বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, কানাডার সঙ্গে ইইউ সিইটিএ স্বাক্ষর করতে চাইছে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরো বিতর্কিত টিটিআইপি চুক্তির পথ সুগম হয়।

ইউরোপের বেশ কয়েকটি শহরে সিইটিএ ও টিটিআইপি চুক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। শুক্রবার ওয়ালোনিয়ার পার্লামেন্টে বৈঠক চলাকালে ভবনের বাইরে বিক্ষোভ হয়েছে।

ওয়ালোনিয়ার মিনিস্টার-প্রেসিডেন্ট পল ম্যানেত সিইটিএ চুক্তিতে উল্লিখিত বিনিয়োগ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বিশেষ আপত্তি জানিয়েছেন। স্থানীয় আদালতের এখতিয়ারের বাইরে বহুজাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য পৃথক আদালত প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে অধিকারকর্মীরাও তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন। টিটিআইপি চুক্তিতেও এমন বিনিয়োগ সুরক্ষা ও আদালতের কথা বলা হয়েছে।

ওয়ালোনিয়ার এ সংকট ইইউর ভবিষ্যতে বড় প্রভাব রাখতে পারে। ইইউ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক বলেছেন, কানাডার সঙ্গে না হলে অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে ইইউ ভবিষ্যতে কখনো চুক্তি করতে পারবে না। ইসি প্রেসিডেন্ট জঁ ক্লদ ইয়ুংকার অবশ্য কয়েক দিনের মধ্যে সিইটিএ চূড়ান্ত হওয়ার আশা প্রকাশ করেন।

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিসসহ বিভিন্ন অধিকার গোষ্ঠী ওয়ালোনিয়া সরকারের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে। সিইটিএ করপোরেট লিপ্সার হাতিয়ার বলে সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে। পরিবেশবাদী, শ্রমিক সংগঠক ও বামপন্থী রাজনীতিকদের মতে, এ চুক্তি আটলান্টিকের উভয় পাড়ে মানুষের অধিকার ও স্বাস্থ্যমানে অবনমন ঘটাবে।

বিনিয়োগ সুরক্ষা প্রস্তাবের সমর্থকরা বলছেন, স্থানীয় আইনের কারণে পুঁজি হারানোর ঝুঁকি থেকে বিনিয়োগকারীদের বাঁচাতে এ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, এ ব্যবস্থা বিভিন্ন দেশের সরকারকে আইন পরিবর্তনে বাধ্য করতে ব্যবসায়ীদের শক্তি জোগাবে।

 

২৩ অক্টোবর, ২০১৬ ১২:০২:৩৩