স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা : যুবলীগ নেতা সেলিম কারাগারে
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
অ+ অ-প্রিন্ট
দ্বিতীয় স্ত্রী আয়েশা আক্তার বকুলকে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় ঢাকা জেলা পরিষরদের সদস্য ও সাভার থানা যুবলীগের বহিস্কৃত সভাপতি সেলিম মণ্ডলকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। রোববার মানিকগঞ্জ মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে আত্মসমর্পন করলে আদালতের বিচারক মঞ্জুর হোসেন জামিন নামঞ্জুর করে সেলিমকে জেল হাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেই সঙ্গে পলাতক অপর দুই আসামি আবদুল হানিফ ও আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। আলোচিত এই হত্যা মামলায় দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন আসামি সেলিম মণ্ডর।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ মামলায় সেলিম মণ্ডল হাইকোর্ট থেকে চলতি বছরের ১৩ মার্চ থেকে ১৫ এপিল পর্যন্ত অন্তবর্তীকালীন জামিন পান। ২১ এপ্রিল হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করেন আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে সাত দিনের মধ্যে তাকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পনের নিদেশ দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্টের জামিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা এক আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২১ এপ্রিল প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।

ওই মামলায় নিম্ন আদালতে জামিন চেয়ে বিফল হয়ে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করেন সেলিম মণ্ডল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তবর্তীকালীন জামিনে থাকা অবস্থায় এর মেয়াদ ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেই জামিনের বিরুদ্ধে এবং সেলিম মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করতে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ, যা চেম্বার বিচারপতির আদালত হয়ে ২১ এপ্রিল আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানি হয়। সুপ্রিম কোটের আপিল বিভাগ সেলিম মণ্ডলকে সাত দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসর্মপন করার নির্দেশ দেন।

রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেলিম মণ্ডল মানিকগঞ্জ মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে আত্মসর্মপন করেন। ভারপ্রাপ্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মঞ্জুর হোসেন আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনে সেলিম মণ্ডলকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নিদের্শ দেন। সেই সঙ্গে পলাতক আসামি আবদুল হানিফ ও আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিংগাইর থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন গত ৬ জানুয়ারি আলোচিত এই হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন। আদালত ৫ ফেব্রুয়ারি অভিযোগপত্রটি আমলে নেন।

সিংগাইর থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার হোসেন জানান, পারিবারিক কোন্দলের জের ধরে ২০১৮ সালের ২ আগস্ট স্ত্রীকে পিটিয়ে মেরে ফেলার কথা স্বীকার করেছেন সেলিম মণ্ডল। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর সহযোগীদের নিয়ে লাশ গোপন করার জন্য সাভারের মজিদপুর ভাড়া বাসা থেকে নিজের গাড়িতে করে তার মরদেহ মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বায়রা ইউনিয়নের স্বরুপপুর নামক স্থানে নিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এ সময় তার সাথে আরও বেশ কয়েকজন ছিল।

গত ৩ আগস্ট সিংগাইর উপজেলার বায়রা গ্রাম থেকে আগুনে ৯০ শতাংশ ঝলসানো একটি তরুণীর লাশ উদ্ধার করে সিংগাইর থানা পুলিশ। পুলিশ অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি মানিকগঞ্জ পৌরসভা কবরস্থানে দাফন করা হয়। সিংগাইর থানা পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।

পরে মরদেহের ছবি দেখে স্বজনরা আয়েশা আক্তার বকুলের বলে শনাক্ত করেন। আয়েশার বড় ভাই উজ্জল হোসেন এ ঘটনার সেলিম মণ্ডলকে প্রধান আসামি করে সিংগাইর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় প্রধান অভিযুক্ত সেলিম মণ্ডল বেশ কিছুদিন পালিয়ে থেকে গত ২৮ আগস্ট উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাকে অস্থায়ী জামিন দেন। অস্থায়ী জামিনে থাকা অবস্থায় সেলিম মণ্ডল গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশ থেকে পালিয়ে ইতালি যাওয়ার সময় হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। পরে সিংগাইর থানা পুলিশের কাছে আটক সেলিম মণ্ডলকে হস্তান্তর করা হয়।

গত ৬ সেপ্টেম্বর আদালতে সেলিম মণ্ডলকে হাজির করে তিনদিনের রিমান্ডে নেয় সিংগাইর পুলিশ। পরবর্তীতে পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আরও পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই সেলিম মণ্ডল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর সেলিম হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে কারাগার থেকে বের হন। আপিল বিভাগের আদেশে আজ রোববার সেলিম বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পন করেন। বিচারক তাকে জেলা হাজতে পাঠান।

 

২৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০৪:৪২