হাসপাতালে চিকিৎসকদের রুমে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিড়, স্থান নেই রোগীদের!
মাওলা বকস, খুলনা
অ+ অ-প্রিন্ট
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক মাইকিং চলছে। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের পরিদর্শনের সময় দুপুর একটা থেকে দুইটা। এছাড়া দেয়ালে দেয়ালে একই কথা সম্বলিত পোস্টার লাগানো। তবে এর কোন কিছুরই তোয়াক্কা করছে না ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। তাদের চরম উৎপাতে বিভিন্ন বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগের রোগীরাও চিকিৎসকদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোন পদক্ষেপই কাজে আসছে না। তবে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা সিনিয়র চিকিৎসকদের কাছে তেমন পাত্তা না পেয়ে ইন্টার্ণি, মেডিকেল অফিসার ও সহকারী রেজিস্ট্রারদের টার্গেট করেছেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিন দেখা যায়, বহির্বিভাগে ডেন্টাল, নাক কান গলা, চক্ষুসহ প্রায় সব চিকিৎসকের কক্ষে পরিদর্শনের সময় মানছে না ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে ২০২নং কক্ষ সহ কয়েকটি কক্ষে। ডাঃ হাসানসহ কয়েকজন চিকিৎসক বলেন, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের জন্য আমরাও বিব্রত, বিরক্ত। 

এদিকে এসব ডাক্তারের রুমে স্থান না পেলেও রুমের বাইরে রোগীদের সাথে প্রেসক্রিপশনের ছবি তোলা নিয়ে ঘটছে তুলকালাম। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা আন্তঃবিভাগে। বিশেষ করে মেডিসিন, সার্জারিসহ অন্যান্য ওয়ার্ডে যেদিন ভর্তির ডেট নির্ধারণ থাকে সেদিন সন্ধ্যার পরে চিকিৎসকদের রুমে প্রবেশ করা দুষ্কর হয়ে ওঠে সাধারণ রোগীদের জন্য। জানা গেছে, গত বছর ঠিক এই সময় মেডিসিন ৭ ও ৮নং ওয়ার্ডে ওষুধ লেখা নিয়ে এক রোগীর স্বজনকে মারধোর করে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। তখন গণমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হলে তত্ত্বাবধায়ক ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের ভিজিটিং টাইম নির্ধারণ করে দেন দুপুর ১টা থেকে দুইটা। যা এখন শুধুই কাগজে কলমে।  গত বুধবার সন্ধ্যার পর বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে অন্তত ৫০ জন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির দেখা মেলে। এরা এখন দিনের বেলায় সিনিয়র চিকিৎসক এর চাইতে ভর্তির সময় জুনিয়র চিকিৎসকদের ঘিরে রাখে নিজের কোম্পানির ওষুধ লেখাবার জন্য। একটি মেডিসিন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে ইন্টার্ণী চিকিৎসকদের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ৬-৭ জন ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধি। দরজার বাইরে রয়েছে তাদের ব্যাগও। ভর্তি রোগীর এক স্বজন ভিতরে ঢুকে ডাক্তারের পরামর্শ নেবে তারও কোন উপায় নেই। 

সান্তা নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের জন্য আমারা রুমে ঢুকতে পারছিলাম না। তাদের সরিয়ে রুমে ঢুকতে চাইলে আমার সাথে খারাপ আচরণ করেছে। একবারে এতো ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি এলে আমাদের সেবা পেতে সমস্যা হয়। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন অন্তত ১০ জন রোগী, যারা সার্জারি ও মেডিসিনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন।

রফিক সামে সোনাডাঙ্গা এলাকার এক রোগী অভিযোগ করেন, টিকিট কেটে ৪ তলায় লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম কিন্তু ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের জন্য ঢুকতে অনেক দেরি হয়েছে। রুপা বেগম নামে নিউমার্কেট এলাকার বাসিন্দা একই অভিযোগ করে বলেন, ওষুধ কোম্পানিদের প্রতিনিধিদের ডাক্তাররা বললেও শোনে না, তারা ডাক্তারদের রুমে দল বেধে ঢোকে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভর্তি ছিল সার্জারি-১ এ। আলমগীর নামে এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করেন ইন্টার্ণি চিকিৎসকদের নিজেদের ওষুধ লেখার জন্য ঘিরে রেখেছেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা। 

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ এটিএম মোর্শেদ বলেন হাসপাতালে রোগীদের ভিজিটের টাইম নির্ধারণ করা রয়েছে। প্রশাসনকে বলেছি  নির্ধারিত সময়ের বাইরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের পেলে ব্যবস্থা নিতে।  তার পরেও সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা নেই। আন্তঃবিভাগেও একটি নিয়মের প্রয়োজন আছে উল্লেখ করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

 

২০ মার্চ, ২০১৯ ০৬:৩৮:৪০