কেশবপুরে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে স্বেচ্ছাশ্রমে সড়কের দু’পাশের ঝোপ-জঙ্গল অপসারণ
জাহিদ আবেদীন বাবু, কেশবপুর (যশোর )
অ+ অ-প্রিন্ট
যশোরের কেশবপুর উপজেলার আলতাপোল গ্রামের যুবকদের বিবেক জাগ্রত করল সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ জন শিক্ষার্থী মৃত্যু । পুরো গ্রামকে কাঁদিয়ে শোকাচ্ছন্ন করে না ফেরার দেশে চলে গেছে স্কুলছাত্রী মুন্নি খাতুন, মুক্তা মনি ও সুরাইয়া খাতুন। কিন্তু শোককে শক্তিতে পরিণত করে ঐ গ্রামের যুবকরা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে স্বেচ্ছাশ্রমে যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের চুকনগর- মঙ্গলকোট-কেশবপুর বাজার পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশের ঝোপ-জঙ্গল পরিস্কার করে হাঁটাপথ তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আলতাপোল চারের মাথা এলাকার যুবক জি.এম.মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে চাকরীজীবী, ডাক্তার, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ঈমাম, শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে ১২ কি.মি. সড়কের দু’পাশের ঝোপ-জঙ্গল স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে অপসারন করে হাটাপথ বের করার এ ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

যশোর-সাতক্ষীরা মহাসড়কটি একটি ব্যস্ততম সড়ক। দু’টি গাড়ী ক্রসিং করলে ঝোপ-জঙ্গলের কারণে রাস্তার পাশে হাটার জায়গা থাকেনা। স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছেলেমেয়েরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রধান সড়কের উপর দিয়ে চলাচল করে থাকেন। মাঝে মধ্যে ছোট ছোট যানবাহন ও পথচারিরা খুব বিপাকে পড়েন। প্রতি বছরই এ সড়কে দূর্ঘটনায় বহু লোক প্রাণ হারান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর না থাকায় সড়কের চুকনগর, মঙ্গলকোট, কেশবপুর বাজার পর্যন্ত দু’পাশ ঝোপ-জঙ্গলে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। ২০০৭ সালে স্কুল থেকে বাড়ী ফেরাত পথে যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের তালতলা নামক স্থানে বাসের চাকায় পিস্ট হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায় দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী মুন্নি খাতুন(৭)। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮সালে স্কুল পারাপারের সময় যশোর-সাতক্ষীরা সড়কের আলতাপোল চারের মাথা এলাকার ২য় শ্রেণীর ছাত্রী মুক্তা খাতুন বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। ২০ ডিসেম্বর ২০১৮, একই ভাবে রাস্তা পারা পারের সময় সুরাইয়া খাতুন(৭) বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। শিক্ষার্থীদের করুন এ মৃত্যুর ঘটনা ওই এলাকার সাধাণ মানুষের বিবেককে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। এ উপলদ্ধি থেকে এলাকার যুবকরা সিদ্ধান্ত নেন, এভাবে আর কোন প্রাণকে অকালে ঝরতে দেবেন না। এরপর এলাকার যুবক চাকুরিজীবী জি.এম. মনিরুজ্জামান, মসজিদের ঈমাম হাফেজ মোঃ রবিউল ইসলাম প্রায় ২৫জন যুবককে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাস্তার দু’পাশের ঝোপ-জঙ্গল পরিস্কার করার উদ্যোগ নেয়। তারা “দেশকে ভাল বাসুন, সড়ক দূর্ঘটনা রোধে এগিয়ে আসুন” এ স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতি শুক্রবার থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে সড়ক দূর্ঘটনারোধে ঝোপ-জঙ্গল পরিস্কার করে হাঁটাপথ তৈরীর কাজ শুরু করেন।

সরেজমিন দেখাযায়, শুক্রবার সকালে একদল যুবক একই রঙের গেঞ্জি পরে উল্লেখিত রাস্তার দু‘পাশের ঝোপ-জঙ্গল পরিস্কারের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেকে এ দৃশ্য দেখে স্বতস্ফূর্তভাবে ওই কাজে যোগ দিচ্ছেন। অনেকে গাড়ি থামিয়ে যুবকদেরকে উৎসাহ ও দোয়া করছেন। 

প্রধান উদ্যোক্তা চাকুরিজীবী জি.এম. মনিরুজ্জামান জানান, এলাকার ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েরা, স্কুলছাত্রী মুন্নি খাতুন, মুক্তা মনি ও সুরাইয়া খাতুনের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরোগ্রামে। সাধারণ মানুষ এ অপমৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। পাকা সড়কের দু’পাশ জুড়ে ঝোপ-জঙ্গলের কারণে ঔ স্কুলছাত্রীরা প্রধান সড়ক ধরে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলো। যে কারণে সড়ক দূর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। ঘটনার পর এলাকার মসজিদের ঈমাম হাফেজ রবিউল ইসলাম, ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান, ইউসুফ আলী টিটু, ডাক্তার বাবলা, সাহিত্যিক রুবেল, সোহেল, কবীর, মোস্তফা, শিক্ষার্থী ফিরোজ, রেজাউল হোসেন, কৃষক আব্দুস সালাম, সোহেল, আব্দুল আজিজসহ ২৫জন যুবক স্বেচ্ছাশ্রমে জনস্বার্থে কাজ করছেন। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার সকালে তারা রাস্তার দু‘পাশের বাগান পরিস্কার করে পায়ে হাঁটার রাস্তা বের করছেন। প্রথম দিন সকলে যশোর-চুকনগর সড়কের মঙ্গলকোট বাজার থেকে চারের মাথা হয়ে ২৩ মাইল পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশের ঝোপঝাড় জঙ্গল পরিস্কার করেন। এখন প্রায় ৮/৯ কিলোমিটার পর্যন্ত কাজ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে কেশবপুর টু-চুকনগর বাজার পর্যন্ত কাজ করা হবে। 

এলাকার যুবক মোঃ রেজাউল ইসলাম বলেন, শুধু রাস্তার দু’পাশ পরিষ্কার নয়, চুকনগর-মঙ্গলকোট বাজার থেকে কেশবপুর পর্যন্ত সড়কের দু’পাশের যে সমস্ত গাছ মরে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে সেগুলোও অপসারণের জন্য তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করবেন। এছাড়া, এলাকার বাল্যবিবাহরোধ, জঙ্গীবাদ নির্মূল, মাদকমুক্ত সমাজ, স্বেচ্ছায় রক্তদান কেন্দ্র করারও পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। পর্যায়ক্রমে কেশবপুর উপজেলাব্যাপি ১১টি ইউনিয়নে সড়ক দূর্ঘটনারোধে জনসচেতনতা মূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। 

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলাউদ্দিন বলেন, এলাকার যুবকরা প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। সড়ক দূর্ঘটনা প্রতিরোধে সকলে যদি এ গ্রামের যুবকদের মতো স্বেচ্ছাশ্রমে জনসচেতনতা মূলক কর্মকান্ড ও প্রধান সড়কের দু'পাশের ঝোপ-জঙ্গল পরিস্কার করে পায়ে চলাচলের রাস্তা সবসময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক কমে আসবে । 

 

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১২:১৯:০৬