খুলনা বিএনপি’র ‘গায়েবি’ মামলায় আটক ৭৮৮ জন
মাওলা বকস, খুলনা
অ+ অ-প্রিন্ট
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর হামলা মামলায় শিকার খুলনা বিএনপির নেতাকর্মীরা। দল ও কর্মীদের নিজেদের ভবিষ্যত নিয়েও দুশ্চিন্তা তাদের। এর মধ্যে নেতাকর্মীদের একটা বড় অংশ কারাগারে আটক থাকায় হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে অন্যদের মাঝে। বিষয়টি বুঝতে পারছেন দলের নেতারাও। এজন্য আপাতত কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি ও মামলা মোকাবেলা করা ছাড়া বিকল্প কিছু নিয়ে ভাবছে না দলটির নেতারা।

খুলনা মহানগরী ও জেলা বিএনপির একাধিক নেতা ও তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপি নেতারা জানান, খুলনা মহানগরীতে ৪২৩ জন এবং জেলার ৯টি উপজেলায় ৩৬৫ নেতাকর্মী বিভিন্ন সময়ে আটক হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।

দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের আগের ও পরের চিত্র দেখে কর্মীরা মুষড়ে পড়বে-এটাকে তারা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন। এসব কর্মীদের সক্রিয় করতে বিভিন্ন প্রস্তাব তারা কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে দল পুনর্গঠন কাজ শুরু করা হবে।

নেতারা জানান, দল বা রাজনীতির ভবিষ্যতের চাইতে তাদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ কারাগারে যারা আছেন, তাদের বাইরে বের করে আনা এবং দীর্ঘদিন যারা পালিয়ে আছেন তাদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করা। ইতোমধ্যে সেই কাজ তারা শুরু করেছেন। এছাড়া নির্বাচনের পর থেকে আটক নেতাকর্মীদের পরিবারের সদস্যরা নেতাদের বাড়িতে ভিড় করছেন। তাদের মুক্ত করতে চাপ বাড়ছে।

গতকাল আদালতপাড়ায় গিয়ে দেখা গেছে, বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। থানা পর্যায়ের নেতারা তাদের জামিন কার্যক্রম তদারকি করছেন। তবে কারোরই গতকাল জামিন হয়নি। জেলা আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে বসে পুরো কার্যক্রম তদারকি করছেন নগর বিএনপি সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও খুলনা-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল।

নগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু  বলেন, গত সেপ্টেম্বর মাসে হঠাৎ করে গায়েবী মামলা এবং অক্টোবরে ধরপাকড় শুরু হয়। তফসিল ঘোষণার আগেই ১৬৩ নেতাকর্মী গ্রেফতার হন। তারা আর বের হতে পারেননি। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের দিন সকাল পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন আরও ২৬০ থেকে ৭০ জন। তাদের কারাগার থেকে বের করে আনাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

তিনি জানান, এছাড়া ইতোপূর্বে খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন থানায় দায়ের করা ৬৪টি মামলায় ১২২টি চার্জশিট দেওয়া হয়। এর অধিকাংশেরই বিচার কাজ চলছে। এছাড়া গত সেপ্টেম্বর মাসে দায়ের করা হয়েছে ১৯টি মামলা। যা ‘গায়েবী’ মামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে ৬টি মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এতে আসামি করা হয়েছে থানা ও ওয়ার্ড কমিটির সব পর্যায়ের নেতাদের। এসব মামলাও আইনীভাবে মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে টিম করে সেই কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।

জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক রফিকুর রহমান বাবু জানান, নির্বাচনের সময় ৯টি উপজেলায় ৩৬৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রেফতার হয়েছে ডুমুরিয়ায় ১১৭ জন। এছাড়া কয়রা উপজেলায় ৯৩ জন, পাইকগাছায় ৩৬ জন, রূপসা, তেরখাদা ও দিঘলিয়ায় ৭৪ জন, ফুলতলায় ২৬ জন, দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় ১৯ জন।

বর্তমানে খানজাহান আলী থানা বিএনপির সভাপতি মীর কায়সেদ আলী, দৌলতপুর থানা বিএনপির সভাপতি মোশাররফ হোসেন, খালিশপুর থানা বিএনপির সভাপতি ফজলে হালিম লিটন, তেরখাদা উপজেলা বিএনপির সভাপতি চৌধুরী কওছার আলী, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহবায়ক আজিজুল হাসান দুলু, মহানগর জাসাস সভাপতি মেহেদী হাসান দিপু, মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হুদা সাগর ও সিনিয়র সহ-সভাপতি চৌধুরী শফিকুল ইসলাম হোসেন কারাগারে রয়েছেন।

এছাড়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক কামরুজ্জামান টুকু, মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মাসুদ পারভেজ বাবু, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কামরান হাসান, ১৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সভাপতি হাফিজুর রহমান মনি, ১২নং ওয়ার্ড সভাপতি আবু সালেক, ১৩ নং ওয়ার্ড সভাপতিসহ অনেক নেতাকর্মী নাশকতার মামলায় এখন কারাগারে।

গতকাল বুধবার আদালত প্রাঙ্গণে ডুমুরিয়া থানার ১১৭ নেতাকর্মীকে কারাগারে হাজির করা হয়। তাদের মামলা তদারিক করছিলেন ডুমুরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি খান আলী মুনসুর ও সাধারণ সম্পাদক মোল্লা মোশাররফ হোসেন মফিজ।

মোল্লা মোশাররফ হোসেন মফিজ বলেন, নেতাকর্মীদের একটা বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকায় সবার মধ্যে হতাশা বেড়েছে। এজন্য সবার আগে তাদের কারামুক্ত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাদের আসনের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার আর্থিক ও আইনগত বিষয়গুলো দেখছেন। তারা কর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে কাজ করছেন।

বিএনপি নেতা রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, আমার আসনের ৩ থানা সভাপতিসহ ১১২ নেতাকর্মী কারাগারে। তাদের মুক্ত না করে আপাতত ঢাকায় ফিরছি না। খুলনায় জামিন না হলে সবাইকে হাইকোর্ট থেকে জামিন করাতে হবে।  জননেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জুর নেতৃত্বে এই কাজ আমরা তদারকি করছি।

বিএনপি নেতারা জানান, আপাতত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক রেখে সবাইকে মুক্ত করার পরই পরবর্তী নিয়ে ভাবতে চান তারা।

 

 

০৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ২৩:৩৩:১৮