পৌষের শীতে কাঁপছে উত্তরের হিমালয়কন্যা পঞ্চগড়
এস কে দোয়েল, পঞ্চগড়
অ+ অ-প্রিন্ট
পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার সদরের চৌরাস্তা বাজারের ফুটপাতে শীতের কাপড়ের দোকানে ক্রেতাদের ভিড়
পৌষের শীতের প্রকৌপ আর ঘূর্ণিঝড় পেথাইয়ের নি¤œচাপের কারণে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ে ঝেঁকে বসেছে তীব্র শীত। ষড়ঋতুর শীত মৌসুমে এ অঞ্চলে এমনিতেই ঠান্ডা বেশি। তারমধ্যে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় উত্তরের জেলাকে বলা হয় শীতের রাজ্য। ঘূর্ণিঝড় পেথাইয়ের প্রভাবের কারণে গত তিনদিন ধরেই দেশের বেশ কয়েকটি স্থানের মতো এখানেও ঝরেছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এতে করে বৃষ্টির সাথে উত্তরের হিমেল হাওয়ায় প্রবাহিত হওয়ায় শীতের প্রকোপে কাঁপছে ছিন্নমূলসহ সাধারণ মানুষ। সব থেকে বেশি কষ্ট হচ্ছে তৃণমূল মানুষের। গত কয়েকদিন ধরে সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ৯-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করায় দুদিন ধরে দেখা যায়নি সূর্যের মুখ। আকস্মিক শৈত্যপ্রবাহের কারণে তীব্র শীতে বয়স্ক ও শিশুরা পড়েছে চরম বিপাকে। সর্দি, কাশি, হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টসহ নানা শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। হাসপাতালে এ সব রোগে আক্রান্ত রোগীদের ভীড় দেখা গেছে। 

এদিকে ছিন্নমুলসহ হতদরিদ্র পরিবারগুলো বাড়িতে খড়-কুটোয় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে দেখা গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা শীত নিবারণের লক্ষে শহরের বাজারের বিভিন্ন ফুটপাতে গড়ে ওঠা দোকানগুলোয় ভীড় জমাচ্ছেন। সাধ্যের মধ্যে কিনতে চেষ্টা করছেন শীতের গরম কাপড়। কিন্তু এবার পুরোনো কাপড়গুলোও বিক্রি হচ্ছে কড়া দামে। এতে করে কেউ কিনতে পারছেন, কেউ কিনতে পারছেন না টাকার অভাবে। সন্ধ্যার পর থেকে বাড়তে থাকে শীতের তীব্রতা। বেশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না কেউ কেউ। রাত ৯/১০টার মধ্যে জনশূন্য হয়ে পড়ছে বাজার ও শহরাঞ্চল। শহরের বাজারগুলোর অনেক জায়গায় টায়ার ও খঁড়-কুটোয় আগুন দিয়ে শীত নিবারন করতে দেখা গেছে বাজারবাসীর। শীতের তীব্রতায় দৈনন্দিন আয় কমে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ।

জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার প্রায় দেড় লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে ৮০ ভাগ মানুষ কৃষিসহ অন্যান্য শ্রমের সাথে সম্পৃক্ত। তার মধ্যে ৪০ হাজার রয়েছে পাথর শ্রমিক। যাদের রুজি-রোজগার চলে কঠিন পাথর উত্তোলন শ্রমে। শীতের প্রকোপ থাকায় এসব পাথর শ্রমিকদের পাথর সাইটেও কাজ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সীমান্তবর্তী উপজেলার পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত নদী মহানন্দায় প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক পাথর তুলে জীবিকা নির্বাহ করে  থাকে। পৌষের শীত আর আকস্মিক শৈতপ্রবাহের কারণে তাদের আয়-রোজগারও কমে গেছে কাজে যেতে না পারায়। চা বাগানের শ্রমিকরাও পড়েছেন বিপাকে। তারাও চা বাগানে কাজ করতে পারছেন না। বুধবার সকালে কথা হয় বেশ কয়েকজন নারী পাথর শ্রমিকের সাথে। তারা শীত উপেক্ষা করেই ভোর সকালে কুয়াশার মধ্যেই কাজে ফিরছেন জীবিকার তাগিদে। এতো শীত আর ঠান্ডা হাওয়ার মধ্যে কাজে যাওয়ার কারণ প্রশ্ন করলে তারা জানান, শীত তো ভাই ভাত দিব না।

তীব্র শীতের কারণে পর্যটন মৌসুমে কমে গেছে ভ্রমন পিপাসুদের আগমনও। দেশের উত্তরের আকাশ হতে নিকটস্থ হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপমাধুর্য অতি কাছ হতে দেখা যাওয়ার কারণে এ সময়ে পর্যটকদের সমাগমও বেশি দেখা যায়। এবারের শীতের কুয়াশার কারণে আকাশ পরিস্কার না থাকায় তেমনটা দেখা যায়নি হিমালয়-কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখ। এতে করে পর্যটক সমাগম না থাকা আর শীতের প্রকোপ থাকার কারণে ভ্যান, অটোরিকশা চালকদেরও  কমে গেছে আয়-রোজগাড়ের পথ। শীতের প্রকোপের কারণে যেমন স্থবির হয়ে পড়েছে জীবন-যাপন, তেমনি কমে গেছে আয়-রোজগারের পথ। তাছাড়া এবার  শীতবস্ত্র বিতরণও তেমন একটা দেখা যায়নি। এছাড়া আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা চলছে ব্যাপক। শীতার্তরা আশায় বুক বাঁধছেন, বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা হয়তো নির্বাচনের আগ মুহুর্তে শীতের কম্বল বিতরণে পৌষের হাঁড়কাঁপা শীত নিবারণে এগিয়ে আসবেন।

গত ১২ ডিসেম্বর হতে বুধবার পর্যন্ত তাপমাত্রা ছিল ৯ থেকে ১৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের পর্যবেক্ষক মো. রহিদুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে জানান, আজ বুধবার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস। তবে বিকেল চারটার পর হতেই শুরু হয়েছে হিমেল হাওয়ার সাথে কনকনে শীত। এতে করে তাপমাত্রা আরও সর্বনিম্ন আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

২০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৮:২০:৫০