টেকনাফ সীমান্ত সোনা চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট : মাফিয়ারা সক্রিয়
শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার
অ+ অ-প্রিন্ট
মরণ নেশা ইয়াবা পাচারের পাশাপাশি স্বর্ণ চোরাচালানের নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্ত। প্রতি সপ্তাহে একাধিক অবৈধ সোনার চোরাচালান দেশে আসার সংবাদ উদ্বেগজনক। তবে সব বাহিনী মাদক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় র্স্বণ চোরাচালান অব্যাহত গতিতে চালাচ্ছে পাচারকারী চক্র। এতে ব্যবহৃত হচ্ছে র্স্বণ চোরাচালান মামলা হতে জামিনে আসা পাচারকারীরা। সীমান্তে নিয়োজিত এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারি যে চোরাচালানের সাথে জড়িত তা বহুবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও আইন-শৃংখলা বাহিনী র্স্বণ পাচার প্রতিরোধে তেমন তৎপর না হওয়ায় দেদারছে চলছে র্স্বণ পাচার। আর এ ফাকেঁ টেকনাফ পৌর সভার কুলাল পাড়া, লামার বাজার, ছোট হাজী মাকের্টসহ রোহিঙ্গা শিবির গুলোতে গড়ে উঠেছে নতুন করে পাচঁ শতাধিক স্বর্ণেও দোকান।

চলতি বছরের জুন মাসে ধরা পড়ে মাত্র ১টি চালান। তাও কোস্ট গার্ড সদস্যদের অভিযান। এর আগে গত ২০১৫-২০১৬ সালে ধরা পরে ১২ টি চালান। মিয়ানমার থেকে আনা এসব স্বর্ণ বাংলাদেশ হয়ে ভারতে পাচার হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কর্মকর্তারা। 

২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর ও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের জাতিগত দুটি ঘটনায় আইনশৃংখলা বাহিনী রোহিঙ্গা পূর্ণবাসন ও নিয়ন্ত্রন নিয়ে বেশী সময় ব্যয় ও ইয়াবাসহ মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করায় র্স্বণ পাচারকারী সিন্ডিকেট সহজে পাচার কাজ চালিয়েছে।  

বাংলাদেশ-মিয়ানমার বৈধ ট্রানজিট যাতায়াত বন্ধ থাকায় এখন র্স্বণ চোরাচালান সিন্ডিকেট টেকনাফ শাহপরীরদ্বীপ গবাধি পশুর করিডোর ও টেকনাফ স্থল বন্দর ও এর আশপাশ এলাকাকে বেচে নিয়েছেন। গত ২০ জুন দিবাগত রাতে টেকনাফে ৪টি স্বর্ণের বারসহ টেকনাফ পৌরসভার খায়ুকখালী পাড়া এলাকার মৃত নুর মোহাম্মদের ছেলে মোঃ আব্দুল্লাহকে (২৮) আটক করে কোস্টগার্ড সদস্যরা। 

কোস্টগার্ড পূর্বজোনের সহকারী গোয়েন্দা পরিচালক লে. কমান্ডার আব্দুল্লাহ আল মারুফ জানান, রাতে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের বরইতলী এলাকা (টেকনাফ স্থল বন্দরের পার্শ্বে) থেকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৪ টি স্বর্ণের বারসহ তাকে আটক করা হয়। এ ছাড়া চলতি বছর র্স্বণ পাচার রোধের তেমন অভিযান চালাতে পারেনি আইন-শৃংখলা বাহিনী। ফলে বিভিন্ন সময়ে আটক পাচারকারীরা জামিনে এসে ফের র্স্বণ চোরাচালানে নেমে পড়েছে। এর ফলে হুন্ডি চক্র তাদের জাল বিস্তার অব্যাহত রেখেছে বলে একাধিক সুত্রে প্রকাশ।

একটি সূত্র বলছে, স্থল সীমান্ত দিয়ে আনা কিছু চালান আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ধরা পড়লেও অধিকাংশ চালান পাচার হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও নির্ধারিত স্থানে নির্বিঘেœ পৌঁছে যাচ্ছে জলপথে ট্রলারের মাধ্যমে স্বর্ণের চালান গুলো।

বিজিবি সূত্র জানায়, ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টার দিকে টেকনাফ বিওপির নায়েব সুবেদার গুরুপদ বিশ্বাসের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টহল দল টেকনাফ পৌর এলাকার পুরাতন ট্রানজিট ঘাটে মিয়ানমার থেকে আসা যাত্রীবাহি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তল্লাশি চালিয়ে ১১৪ ভরি ওজনের ৮টি স্বর্ণের বার জব্দ করা হয়। যার বাজার মূল্য আনুমানিক পৌনে ৪৮ লাখ টাকা। এ সময় সংশ্লিষ্ট কাউকে আটক করতে পারেনি বিজিবি জওয়ানরা।

গত ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ জুন টেকনাফে পৃথক অভিযান চালিয়ে বিজিবির সদস্যরা ১ কেজি ৭০০ গ্রাম ওজনের ১০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে। এই স্বর্ণের বাজার মূল্য প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। এ সময় স্বর্ণসহ হাতেনাতে আটক করা হয় তিনজনকে। তারা হলেন- মিয়ানমারের নাগরিক মো. আরাফাত ও মো. রফিক এবং টেকনাফের পুরান পল্লানপাড়ার মো. ওসমান।

মিয়ানমার থেকে স্বর্ণের চালানটি টেকনাফ এনে চট্টগ্রামে যাওয়ার সময় তারা ধরা পড়েন। আরাফাত ও রফিক ওই সময় বিজিবির জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন মিয়ানমারের সঙ্গে টেকনাফের স্বর্ণ চোরাচালান বাড়ছে। মিয়ানমারের মংডু থেকে স্বর্ণ কিনে নৌকায় (নাফ নদী অতিক্রম করে) টেকনাফ আনা হচ্ছে। এরপর টেকনাফ থেকে স্বর্ণের চালান যায় চট্টগ্রামে। সেখান থেকে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে যাচ্ছে ভারতে।

এই দুটি ছাড়াও ২০১৬ সালের ৫ মে, ২৫ এপ্রিল ও ৫ মার্চ অভিযান চালিয়ে বিজিবি সদস্যরা তিনটি স্বর্ণেন চালান আটক করেন। এ ছাড়া ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আটক করা হয় আরো ছয়টি চালান। 

টেকনাফ বিজিবি সুত্রে জানা যায়, টেকনাফে বিজিবির উদ্ধার করা স্বণের্র পরিমাণ ১৮ কেজি ২৪৫ গ্রাম (৯৪টি বার)। এসব অভিযানে আটক করা হয় ১৪ জনকে। এব্যাপারে থানায় মামলাও হয়েছে। 

স্থানীয় একাধিক সুত্রে জানা গেছে, টেকনাফ হোয়াইক্যং পূর্ব সাতঘরিয়াপাড়ার রোহিঙ্গা নুর হাফেজ (প্রতিষ্টিত ইয়াবা কারবারী), একই এলাকার গিয়াস উদ্দিন সিকদার, নুর হাফেজের ভগ্নিপতি নুরুল আলম, পশ্চিম সাতঘরিয়াপাড়ার নুরুল হোসেন, কাঞ্জরপাড়ার শাহজালাল,   

টেকনাফ সাবরাং বাজার পাড়ার মাহমুদুল করিম, সৈয়দ হোসেন, মোঃ ইসমাইল, দীল মুহাম্মদ, আজিজুর রহমান, মাস্টার মহিউদ্দিন, বাহারছড়ার মৌলভী রফিক উদ্দিন, জুহুর আলমসহ শতাধিক সদস্য জড়িত রয়েছে সোনা চোরাচালানে। 

দীর্ঘদিন ধরেই এই টেকনাফ একটি শক্তিশালী চক্র সিএন্ডএফ ব্যবসার আড়ালে সোনা ও মুদ্রাসহ নানা রকম মালামাল পাচার করছে। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি হচ্ছে একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী। সন্দেহ নেই, সীমান্তে সোনা চোরাচালানের ঘটনার সময়ে সময়ে যাদের আটক করা হয়, তারা কেবল বাহক মাত্র। মূলত এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে দেশি-বিদেশি পাচারকারি মাফিয়া চক্র। 

সীমান্তে সোনা চোরাচালানসহ অন্যান্য অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নিয়ে এগিয়ে আসার কথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাঝে মধ্যেই বলা হয়ে থাকে। কিন্তু বাস্তবে যে তার প্রয়োগ নেই, সমঝোতার মাধ্যমে অবৈধভাবে দেশে সোনার চালান আনার ঘটনা তার বড় প্রমাণ। সরকার সোনা চোরাচালান সহ সব ধরনের অপরাধ দমনে শতভাগ আন্তরিক, এটা প্রমাণ করতে হলে অবশ্যই কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকতে হবে। 

সচেতন মহলের মতে, কোনোমতেই চাই না, আমাদের প্রিয় স্বদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধীচক্রের লীলাভূমিতে পরিণত হোক।

 

২৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০৬:০৯:৫৫