খুলনায় পথ-শিশুরা বেশীরভাগ মাদকে আসক্ত
মাওলা বকস, খুলনা
অ+ অ-প্রিন্ট
খুলনা রেলস্টেশনে চার বছর ধরে বাস করছে ১১ বছরের শিশু রুবেল। সাত বছর বয়সে সে যখন স্টেশনে এসেছিল, তখন মানুষের কাছে হাত পেতে খাবারের টাকা জোগাড় করত। কারও দয়া হলে খাবার জুটত, নয়তো না খেয়েই দিন কাটত তার। দুই বছর আগে প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে শিশুটি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। কিছু না ভেবে স্টেশন এলাকায় গাঁজা বিক্রি করতে রাজি হয়ে যায় সে।এর পর থেকে বেল গাঁজা গাঁজা সেবন করেন। এখন ট্রেনযাত্রীদের ব্যাগ-ব্যাগেজ বহন করে যে ক'টাকা পায়, তার বেশিরভাগই ব্যয় করে মাদক সেবনে। তার বাবা-মা কোথায় থাকে, তা জানে না; জানার চেষ্টাও করে না। স্টেশনের বাসিন্দা- এটিই তার পরিচয়।

মাদক ব্যবসায়ী নারী নিজের নাম-পরিচয় জানায়নি। 'খালা' বলে সম্বোধন করতে বলা হয়েছিল রুবেলকে। তাই সে ওই নারীকে খালা নামেই চেনে। শুধু রুবেল নয়, খুলনায় এমন হাজার হাজার পথশিশু-কিশোর মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের সংস্পর্শে এসে প্রতিদিনই নতুন করে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। এদের কারও বাবা অন্য নারীকে বিয়ে করে চলে গেছে, কারও মা অপর ব্যক্তিকে বিয়ে করে পেতেছে নতুন সংসার। আবার কারও বাবা-মা থাকলেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তাদের সঙ্গে। খুলনার রেলস্টেশন, ঘাট, বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, সড়কের ফুটপাত কিংবা বিভিন্ন পার্কই যেন তাদের জন্য হয়ে উঠেছে আবাসস্থল। তাদের মাদক সেবনের দিকে ঠেলে দিতে বড় ভূমিকায় মাদকের খুচরা ব্যবসায়ীরা। সুপরিকল্পিতভাবে তারা ফাঁদ পাতে, যাতে শিশু-কিশোররা তাদের ক্রেতা হয়ে ওঠে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে শিশুদের 'নিরাপদ' মনে করে মাদক বহনেও ব্যবহার করে কারবারিরা। এসব শিশু-কিশোরের ভবিষ্যৎ যে অনিশ্চিত, তা তাদের বোঝানোর মতো যেন নেই কেউ। মাদকাসক্ত এসব শিশু-কিশোর জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে। অপরাধ কী- বোঝার আগেই ভয়ঙ্কর অপরাধী হয়ে বেড়ে উঠছে তারা।

বাংলাদেশে পথশিশু-কিশোরের বর্তমান সংখ্যা কত, তার হিসাব নেই সরকারের কাছে। এমনকি সারাদেশে কতজন মাদকাসক্ত, তারও নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়ে থাকে, দেশে ৭০ লাখের বেশি মাদকাসক্ত রয়েছে। গত জুনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের একাংশে বলা হয়েছে, মাদকসেবীদের মধ্যে ৮০ শতাংশ যুবক, তাদের ৪৩ শতাংশ বেকার। শিশু মাদকসেবীর পরিসংখ্যান বলা হয়নি তাতে।বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যানুযায়ী, পথশিশুদের ৮৫ ভাগই কোনো না কোনোভাবে মাদক সেবন করে। এর মধ্যে ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৪৪ শতাংশ ধূমপান, ২৮ শতাংশ বিভিন্ন ট্যাবলেট ও ৮ শতাংশ ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা করে। এটি কয়েক বছর আগের গবেষণা তাদের।

কে নেবে এসব পথশিশু-কিশোরের দায়িত্ব? মাদক-জীবন থেকে কে ফেরাবে তাদের? নাকি মাদকেই শেষ হয়ে যাবে অভিভাবকহীন পথশিশু-কিশোররা! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য, সামাজিক অবক্ষয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা পথশিশুদের নিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে। এসব শিশু-কিশোর কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেটের ক্ষুধার সঙ্গে যুদ্ধ করে। পেটের তাগিদে তারা মাদক সরবরাহ বা বহনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব সরকারের। পাশাপাশি সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে জনশক্তি হিসেবে তাদের কাজে লাগানো যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞরা।

পথশিশু-কিশোররা কীভাবে মাদকে জড়িয়ে পড়ছে সে তথ্য তুলে আনতে সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে অনুসন্ধান চালায় । এসব এলাকার অন্তত দুইশ' পথশিশু, কিশোর ও কিশোরীর সঙ্গে কথা হয় । তাদের মধ্যে কমপক্ষে ১৭৫ জন মাদকাসক্ত। তাদের প্রায় প্রত্যেকের মাদক সেবনের শুরুটা অভিন্ন। প্রথমে সিগারেট। এর পর অপর মাদকাসক্তের সংস্পর্শে এসে ড্যান্ডি ও সিগারেটের সঙ্গে গাঁজা সেবন শুরু। পর্যায়ক্রমে জড়িয়ে পড়ে ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকে। ড্যান্ডি সলিউশন নামে পরিচিত। এতে টলুইন নামে একটি উপাদান আছে, যা মাদকদ্রব্যের তালিকায় আছে। এটি জুতা তৈরি ও রিকশার টায়ার-টিউব লাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। পলিথিনে মুখ লাগিয়ে ড্যান্ডি সেবন করে পথশিশুরা। দীর্ঘ মেয়াদে ড্যান্ডি সেবন করলে মস্তিস্ক, যকৃত ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এসব শিশু-কিশোর নেশায় বুঁদ হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ব্লেড দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে নিজের শরীর। তাদের সুচিকিৎসা হয় না। এমন এক ১২ বছরের শিশু ইমনের সঙ্গে কথা হয়। সে সময় ইমনসহ ১৭ শিশু-কিশোর পাকা কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছিল। ইমনের বাড়ি নরসিংদীর মাধবদী থানার বউবাজার এলাকায়। তার মা ,বাবা মারা গেছে। তার ভাষায়, অনেক ছোট থাকতে সে রেলওয়ে স্টেশনে এসেছে। তার দুই হাতের কনুই পর্যন্ত অসংখ্য কাটা চিহ্ন ও বাঁ গালে লম্বা করে একটি কাটা দাগ দেখা যায়। হাত-মুখের এই অবস্থা কীভাবে হয়েছে- জানতে চাইলে ইমন বলে, 'নেশা হয়ে গেলে কী করি, মনে থাকে না।' ট্রেনযাত্রীদের লাগেজ বহন করে আয় করে বলে জানায় সে। রাকিব নামের আরেক শিশু জানায়, নেশা করার সময় নিজের শরীর রক্তাক্ত করতে ভালো লাগে তার।

অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, পথশিশুরা পরিবারকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে না। শিশুকালেই পৃথিবীর কঠিন কদর্য পরিস্থিতির চিত্র তার সামনে উঠে আসে। বাস্তবতার মুখোমুখি হতে গিয়ে সে মুষড়ে পড়ে। তখন ক্ষণিকের আনন্দ লাভের জন্য কল্পনার জগতে বিচরণ করতে চায়। এ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনে তারা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। যৌন নিপীড়ন থেকে শারীরিক নির্যাতন- সেগুলো মোকাবেলা করতে গিয়ে যখন পারে না, তখন অন্যজগতে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায়। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

 

১৪ অক্টোবর, ২০১৮ ২২:১৩:০১