বরিশাল সিটি নির্বাচন : মেয়র প্রার্থী সাদিক আবদুল্লাহসহ অন্যান্য প্রার্থীদের প্রচারণা তুঙ্গে
তপন বসু, বরিশাল
অ+ অ-প্রিন্ট
প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর পক্ষে তাকে সাথে নিয়ে গণসংযোগ করেছেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নব-নির্বাচিত মেয়র এ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম। নগরীর সদর রোড, ফলপট্টি ও পোর্ট রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগকালে মেয়র জাহাঙ্গীর আলম বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরতœ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে এবং বরিশাল নগরীকে উন্নত ও আধুনিক এক তিলোত্তমা নগরীতে রূপান্তরিত করতে নৌকা মার্কায় ভোট প্রার্থণা করেন। বরিশাল নগরীর ভোটের মাঠে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমের গণসংযোগ রাজনীতিতে নতুন চমক সৃষ্টির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উৎসাহিত ও উজ্জীবিত করেছে। গণসংযোগের সময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে নৌকা মার্কার মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ, আওয়ামী লীগ নেতা মাহাবুব উদ্দিন আহম্মেদ বীর বিক্রম, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলাল, সহসভাপতি এ্যাডভোকেট আফজালুল করিমসহ দলীয় নেতৃবৃন্দরা।

প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধোকাবাজি করতে চাইনা ॥ আওয়ামীলীগ মনোনীত নৌকা মার্কার মেয়র প্রার্থী বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ জনকন্ঠকে বলেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বরিশালের উন্নয়নে জনগন যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে। বরিশালের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থী যে অভিযোগ করেছে তার কোন ভিত্তি নেই। আমাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বলে দেয়া হয়েছে কোন প্রকার আচরনবিধি লঙ্ঘন করা যাবেনা। সাদিক আব্দুল্লাহ আরও বলেন, আমি কোন প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগনের সাথে ধোকাবাজি করতে চাইনা। আমি উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে বরিশাল নগরবাসীকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকবো ॥ সিটি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ মার্কার মেয়র প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও বরিশাল মহানগর বিএনপি সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে বলেন, সরকার যতই গ্রেফতার আতঙ্ক সৃষ্টি করুক না কেন আমরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকবো। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে নির্বাচনকালীন সময়ে কোন গ্রেফতার করা যাবেনা কিন্তু প্রশাসন তা মানছেনা। তারা ইতোমধ্যে আমাদের সমর্থনকারী জামায়াতের মহানগর সেক্রেটারীসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করে ভোটের মাঠে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সরোয়ার আরও বলেন, প্রশাসনের উপর সরকারের হস্তক্ষেপ থাকার কারনেই আমরা সেনাবাহিনীর দাবী করেছি। পাশাপাশি ইভিএম প্রদ্ধতি সকলের জানা নেই বলে তা বাতিলের দাবি করেছি। সোমবার দুপুরে ধানের শীষের পক্ষে নগরীতে ব্যাপক গণসংযোগ করেছেন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসনের ধানের শীষ মার্কার প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান। এসময় অন্যান্যদের মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর হোসেন মিলন, আনোয়ার সাদাত তোতা, বিএনপি নেতা মনির হোসেন মোল্লা, নেছার উদ্দিন তালুকদার, রাসেদুল ইসলাম, তোফাজ্জেল হোসেনসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে জনগন ॥ নির্বাচনী মাঠ বেশ চাঙ্গা রেখে নগর চষে বেড়াচ্ছেন জাতীয় পার্টির মনোনীত লাঙ্গল প্রতীকের মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস। নগরীর হাটখোলা এলাকায় গণসংযোগকালে তিনি (তাপস) সাংবাদিকদের বলেন, জনগন যতক্ষন আমার সাথে আছেন, ততক্ষন আমি নির্বাচনী মাঠে তাদেরকে নিয়ে লড়াই করে যাবো। নির্বাচনী পরিবেশ যতোই উত্তপ্ত হোক না কেন সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে জনগন।

প্রার্থী পরিচিতি সভা ॥ ‘সিটি কর্পোরেশন ব্যবস্থাপনায় চাই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা’ শ্লোগানকে সামনে রেখে টিআইবি’র সহযোগিতায় সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর আয়োজনে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে ‘প্রার্থী পরিচিতি ও স্বচ্ছ-জবাবদিহিমূলক সিটি কর্পোরেশন গঠণে অঙ্গীকার বিষয়ক মতবিনিময় সভা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন তাপস, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির এ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা ওবাইদুর রহমান মাহবুব, স্বতন্ত্র বশীর আহমেদ ঝুনু ও বাসদ’র মেয়র প্রার্থী ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী। মেয়র প্রার্থীরা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সিটি কর্পোরেশন গঠনে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একইসভায় বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থীগণ তাদের স্ব-স্ব পরিচয় ও মার্কা তুলে ধরেন। সভায় প্রার্থীগণ নির্বাচনে বিজয়ী হলে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত সিটি কর্পোরেশন গড়ার এবং পরাজিত হলেও নির্বাচনের রায় মেনে নিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করেন। সনাক সভাপতি অধ্যক্ষ গাজী জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সহসভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা, সদস্য সাইফুর রহমান, শুভংকর চক্রবর্তী প্রমুখ।

নয় বিচার বিভাগীয় হাকিম নিয়োগ ॥ সিটি কর্পোরশন নির্বাচনে অপরাধ বিচারার্থে আমলে নেয়া এবং তা সংক্ষিপ্ত বিচারের জন্য নয়জন বিচার বিভাগীয় (জুডিশিয়াল) হাকিম নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব ওয়েব সাইটে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, ভোট গ্রহনের পূর্বের দিন (২৯ জুলাই) থেকে ভোটের দিন ও পরের দুইদিনসহ মোট চারদিন অপরাধ আমলে নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিচারের জন্য বিচার বিভাগীয় হাকিমদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গত ১৯ জুলাই তাদের নিয়োগ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারবিভাগীয় হাকিমরা হলেন-নগরের ১,২ ও ৩ নং ওয়ার্ডে বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রেপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট মারুফ আহম্মেদ। ৪,৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের জন্য ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ কায়সারুল ইসলাম। ৭,৮ ও ৯নং ওয়ার্ডে বরিশালের জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট অনুতোষ চন্দ্র বালা। ১০,১১ ও ১২নং ওয়ার্ডের জন্য ঢাকার মেট্রেপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট সত্যব্রত শিকদার। ১৩,১৪ ও ১৫ নং ওয়ার্ডের জন্য বরিশালের মেট্রেপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ শামিম আহম্মেদ। ১৬, ১৭ ও ১৮নং ওয়ার্ডে বরিশালের জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট শাম্মী আকতার। ১৯,২০,২১ ও ২৮নং ওয়ার্ডের জন্য ভোলার চরফ্যাশন চৌকির সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ শিবলী নোমান খান। ২২, ২৩, ২৪ ও ২৯নং ওয়ার্ডের জন্য ঝালকাঠির সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট এইচএম কবির হোসেন এবং ২৪, ২৫, ২৬ ও ৩০নং ওয়ার্ডে গোপালগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট অমিত কুমার বিশ্বাস।

র‌্যাব-পুলিশের পাশাপাশি থাকছে ১৫ প্লাটুন বিজিবি ॥ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহন সুষ্ঠু, সুন্দর, নিরপেক্ষ ও উৎসব মূখর পরিবেশে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে  নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট, পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা এরইমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করলেও ৩০ জুলাই ভোটগ্রহনকে কেন্দ্র করে কয়েকদিনের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ও বিজিবি’র সদস্যরা। সবমিলিয়ে নির্বাচনকে ঘিরে ভোটের দিন তিন হাজারের মতো বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারী কর্তকর্তারা নিয়েজিত থাকবেন। সহকারী রিটার্রিং অফিসার মোঃ হেলাল উদ্দিন খান জানান, নির্বাচনের দিনসহ আগে ও পরের দিন ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। কমিশনের পক্ষে এ সংক্রান্ত নিদের্শনা আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহীনিসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল দফতরকে দেয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী সকল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। হেলাল উদ্দিন খান আরও জানান, নির্বাচনের আগে ২৮ জুলাই থেকে নির্বাচনের দিন ৩০ জুলাই এবং পরেরদিন ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৩০টি ওয়ার্ডে ৩০জন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের সমন্বয়ে ৩০টি ভ্রাম্যমান আদালত মাঠে কাজ করবে। ভোটগ্রহনের পূর্বেরদিন থেকে পরের দুইদিন পর্যন্ত নয়জন জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট নির্বাচনী এলাকায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এছাড়া র‌্যাব-৮ এর ৩০টি টিম, ১৫ প্লাটুন বিজিবি সদস্যদের ৩০টি টিম, পুলিশের ৩০টি টহল টিম, ১০টি স্ট্রাইকিং ফোর্স মাঠে কাজ করবে। এছাড়া ১২৩টি ভোট কেন্দ্রে ১২৩জন প্রিজাইডিং অফিসার, ৭৫০জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং এক হাজার পাঁচশ’ জন পোলিং অফিসার নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহন কার্যক্রমে অংশগ্রহন করবেন। তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ১০ভাগ বেশি প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারকে প্রশিক্ষনের আওতায় আনা হবে। ফলে দায়িত্বপালকারী সংখ্যার থেকে আরো ১৫জন প্রিজাইডিং, ৭৫জন সহকারী প্রিজাইডিং ও ১৫০জন পুলিশ অফিসারকে প্রশিক্ষন দেয়া হবে। যাদের আপদকালীন সময়ে জরুরী প্রয়োজনে কাজে লাগানো হতে পারে। হেলাল উদ্দিন খান আরও জানান, সাধারণ ভোট কেন্দ্র নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে পুলিশ সদস্যসহ ২২জন নিরাপত্তা কর্মী। এরমধ্যে অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্যের মধ্যে একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই), একজন সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ও পাঁচজন সদস্য। তিনজন ব্যাটলিয়ান আনসার সদস্য এবং একজন পিসি ও দুইজন এপিসিসহ সাধারণ ১২জন আনসার সদস্য। এরমধ্যে পাঁচজন নারী ও সাতজন পুরুষ সদস্য কাজ করবেন। পিসি ও এপিসিরা অস্ত্রধারী আর বাকিদের হাতে থাকবে লাঠি। কেন্দ্রগুলো দুই ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভাষায় গুরুত্বপূর্ন ও অতিগুরুত্বপূর্ন। সেক্ষেত্রে অতিগুরুত্বপূর্ন কেন্দ্রগুলো সাধারনের থেকে দুইজন পুলিশ সদস্য বেশি নিয়োগ দেয়া হবে। তবে গুরুত্বপূর্ন ও অতিগুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর তালিকা পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা থেকে এখন পর্যন্ত প্রদান করা হয়নি। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার নাছির উদ্দিন মল্লিক বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ও অতিগুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করার কাজ গোয়েন্দা সংস্থা করছে। ২/১ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে তালিকাসহ রির্পোট পাঠানো হবে। অপরদিকে ১২৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫২টি কেন্দ্রে আসবাবপত্র সংকট থাকায় তা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা হবে।

 

২৪ জুলাই, ২০১৮ ১১:৩১:১৭