কেসিসি মেয়র নির্বাচন : আ'লীগ-বিএনপির লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি
মাওলা বকস, খুলনা
অ+ অ-প্রিন্ট
খুলনা সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে লড়াই হবে আ’লীগ মহানগর সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক ও বিএনপি মহানগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এর সাথে। ব্যাপক জনপ্রিয় এই দুই নেতা দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একে অন্যের প্রতিদ্বন্ধী হিসেবে এই প্রথম কোনো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। হেভীওয়েট এই দুই প্রার্থীর নির্বাচন নিয়ে এখনই জল্পনা কল্পনার যেন শেষ নেই। প্রার্থীরা এখন ভোটারদের মন জয়ের ছক কষা নিয়ে ব্যস্ত। আর ভোটাররা ব্যস্ত প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশে। ভোটারদের ভাষ্য, এবার নির্বাচনে মেয়র পদে লড়াই হবে মূলত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। খুলনায় স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিরোধ কখনও নোংরামীতে পরিণত হয়নি। সমঝতার মাঝেই এত কালের রাজনীতি আতিবাহিত হলেও কেসিসি নির্বাচনে দুই দলের দুই কর্ণধারের অংশগ্রহণ রীতিমত নগরবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে।

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক ও বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জুর নাম ঘোষণা হওয়ায় দু'দলের নেতাকর্মীদের মাঝে দেখা দিয়েছে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা।

নগরবাসীর সঙ্গে আলাপে জানা যায়, জনপ্রিয়তায় তালুকদার আব্দুল খালেকেরের চেয়ে নজরুল ইসলাম মঞ্জু এগিয়ে। নিজ নিজ দলের নেতাকর্মী ছাড়াও নগরীর সাধারণ বাসিন্দাদের কাছেও তারা জনপ্রিয়। তাই আসল লড়াইটি হবে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপিতে।

ভোটাররা জানান, নগরবাসীর নানা সমস্যায় তালুকদার আব্দুল খালেক ও নজরুল ইসলাম মঞ্জু একইসঙ্গে এগিয়ে আসেন। তাদের দুজন  জনপ্রিয় হওয়ার মূল কারণ এটা। এ ছাড়া, রাজনীতির ময়দানে একে-অপরের প্রতিপক্ষ হলেও তালুকদার আব্দুল খালেক ও নজরুল ইসলাম মঞ্জুর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এটাও তাদের তুমুল জনপ্রিয়তার আরেক কারণ।

খুলনা সদর আসনে ২০০৮ সালে নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিএনপি’র টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আবার একই বছর মেয়র নির্বাচিত হন তালুকদার আব্দুল খালেক। যদিও বিগত নির্বাচনে (২০১৩) তিনি বিএনপি’র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি’র কাছে প্রায় ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। আর এবার সংসদ সদস্য থেকে পদত্যাগ করে ফের মেয়র নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুর সাথে। তাই এ নির্বাচন বাঘে-সিংহের লড়াই।

নগরবাসী জানান, তালুকদার আব্দুল খালেক ও নজরুল ইসলাম মঞ্জু কেউই এবার মেয়র পদের জন্য দৌড়ঝাঁপ করেননি। নিজ নিজ দলই তাদের মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। তালুকদার আব্দুল খালেক একবার মেয়র ছিলেন। তিনি কমিশনার থেকে নির্বাচন করে মেয়র হয়েছিলেন। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি জয়ের জন্য নির্বাচনি ছক আঁকার ক্ষেত্রে তার জুড়ি নেই। এদিকে, নজরুল ইসলাম মঞ্জু আগে কখনো মেয়র পদে নির্বাচন করেননি। কিন্তু সংসদ নির্বাচন করায় জয়ের লক্ষ্যে নির্বাচনি ছক আঁকায় তিনিও অভিজ্ঞ। পাশাপাশি মেয়র পদে প্রার্থী জেতানোর অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। এসব সমীকরণ বিবেচনায় ১৫ মে অনুষ্ঠেয় কেসিসি নির্বাচনে মূলত কঠিন পরীক্ষায় পড়তে যাচ্ছে তালুকদার আব্দুল খালেক ও নজরুল ইসলাম মঞ্জুর জনপ্রিয়তা।

মহানগরীর খালিশপুর এলাকার মো. ইউনুচ আলী বলেন, ‘শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে খালেক ও মঞ্জু অনেকবার খালিশপুরে এসেছেন এবং একত্রে বসে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানও করেছেন। শ্রমিক স্বার্থে তারা দুজনই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছুটে আসেন। এবার কেসিসি নির্বাচনে নগরপিতার দায়িত্ব নিতে দুজনের ভূমিকা ও বক্তব্য কেমন হয়, তাই এখন দেখার পালা। এ ছাড়া, এ দুই প্রার্থীর নির্বাচনি কৌশল ও প্রক্রিয়া কেমন হয়, তাও দেখার অপেক্ষায় রয়েছি আমরা।’

মহানগরীর টুটপাড়ার বাসিন্দা অ্যাড. সুলতানা  বলেন, ‘অনেক দিন পর নৌকা আর ধানের শীষের নির্বাচন হচ্ছে। এ নির্বাচনে প্রার্থী ও প্রতীক দুটোই বড়। খালেক ও মঞ্জুর মধ্যে কে বেশি জনপ্রিয়, এ নির্বাচনে তার ফয়সালা হবে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আগামী জাতীয় নির্বাচনে মানুষ কাকে চায়, তাও দেখা হয়ে যাবে।’

এদিকে বড় দুই রাজনৈতিক দলের মেয়র পদে আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক ও বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জুর নাম  ঘোষণার পর নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে ভোটারদের কথায়। এরইমধ্যে তারাও হিসেব কষছে ভোট অংকের। নগরবাসীর মৌলিক অধিকারের দাবিও উচ্চারিত হচ্ছে জোরে-সোরে। আঞ্চলিক নির্বাচনি কার্যালয় সূত্র জানায়, এবারই প্রথম কেসিসিতে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে। এ কারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের কাছে আসন্ন নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এ সূত্র আরও জানায়, সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকে লড়াই হয়েছিল। ওই নির্বাচনে সারাদেশে নৌকার জয়জয়কার হলেও খুলনা-২ আসনে একহাজার ৬শ’ ভোটে হেরে যান আওয়ামী লীগ প্রার্থী। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকের লড়াই হয়নি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের এখনও ৮ মাস বাকি।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মিজানুর রহমান মিজান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের পর জেলা আওয়ামী লীগের সবাই তালুকদার আব্দুল খালেকের পক্ষে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছেন। তাকেই খুলনাবাসী বিপুল ভোটে জয়যুক্ত করবে তালুকদার আব্দুল খালেকে।’

মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক অ্যাড. সরদার আনিছুর রহমান পপলু বলেন, ‘পদ্মার এপারে দলের শ্রেষ্টনেতা তালুকদার আব্দুল খালেক। সততা, দক্ষতা ও যোগ্যতায় তিনি এগিয়ে। বিগত সময়ে খুলনার অভূতপূর্ব উন্নয়ন করে তিনি খুলনাবাসীর হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।’

মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ‘খুলনার মানুষ সবসময়ই বিএনপি ও ধানের শীষ প্রতীকে আস্থা রেখেছেন। মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আজিজুল হাসান দুলু বলেন, ‘নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনাবাসীর প্রাণের নেতা। কেসিসির মেয়র পদে নির্বাচনে তার জয় সুনিশ্চিত।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত কেসিসি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি (আনারস) একলাখ ৮১ হাজার ২৬৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক একলাখ ২০ হাজার ৫৮ ভোট পান। ওই নির্বাচনে ভোটার ছিল চার লাখ ৪০ হাজার ৫৬৬ জন। আসন্ন নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৬ জন এবং নারী ভোটার দুই লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ জন।

 

১৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০৯:৩১:৩৯