শীতে ঘরে বসে থাকলে কী কেউ খাওয়াইবো?
এস কে দোয়েল, পঞ্চগড়
অ+ অ-প্রিন্ট
যেখানে রেকর্ড পরিমান ঠান্ডা! কনকনে শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত। ঘর থেকে বের হওয়া দায়। কিন্তু সেখানে দেশের উত্তর সীমান্তের নারী শ্রমিকদের জীবন সংগ্রামের কাছে শীতও হার মানতে বাধ্য হয়। চারদিকে ঘিরে ঠান্ডা কুয়াশা। পথঘাট অন্ধকার। সেখানে ভোরে উঠেই ঘরের কাজ শেষ করে দর্জিপাড়া গ্রামের জয়গুন বেগম বের হয়েছেন কাজের উদ্দেশে। পাথরের সাইটে কাজ করে এ নারী শ্রমিক। কুয়াশার চাদরে কাজের উদ্দেশেই বের হতেই পথে দেখা হয় এই প্রতিবেদকের। এতো ঠান্ডার মধ্যে কোথায় যাচ্ছেন প্রশ্ন করতেই বলে উঠেন-কাজে যাই ভাই। শীতে ঘরে বসে থাকলে কী  কেউ খাওয়াইবো? না খাইয়া থাকতে অইবো ভাই-বলেই যানবাহনের অভাবেই হেটে হেটে চলে গেলেন কাজে।

চলতে চলতে দেখা হয় আব্দুস সালামের সাথে। আখ ক্ষেতে কাজ করবেন তিনি। প্রচন্ড শীত থাকা সত্ত্বেও বেরিয়ে পড়েছে কাজে। ঘরে স্ত্রী-সন্তানদের অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষাসহ মৌলিকা চাহিদা পূরণ করতে শরীর খাটিয়ে। সেখানে বর্ষাই কী আর প্রবল শীতই কী? কোনটাই বাঁধা হয়ে থাকা যায় পেটের কারণে। স্ত্রী-সন্তানদের জন্য। দল নিয়ে তেঁতুলিয়ার কালূর মা চৌরাস্তায় এসে গরম গরম ভাপা খেয়ে নেয় সবাই। তারপর কোদাল-ঢাকি নিয়ে সাইকেল চালিয়ে কাজের দিকে ছুটে। 

টানা শৈতপ্রবাহের কারণে দুঃশ্চিন্তার পাহাড় জমেছে পাথর শ্রমিক মর্জিনা বেগমের। দু:চিন্তার আওয়াজ। কনকনে শীত, ঠান্ডা বাতাস আর কুয়াশার কারণে কোথাও বের হতে পারছেন না। চিন্তার ভাজ নিয়ে উঠোনে খড়কুটোর আগুন তাপাচ্ছিলেন পাশের বাড়ির আলাউদ্দীন মিয়া। দিন মজুরী করেই জীবন চলে তার। প্রচন্ড কুয়াশার গেরস্থের বাড়িতে কামলা দেওয়া কষ্টকর হওয়ায় চিন্তার ভাজ নিয়ে আগুন তাপাচ্ছেন। রাস্তা বেরুতে দেখা যায় পথ ফাঁকা। চাদর-মাফলার দিয়ে মাথা-মুখ ঢেকেও ঠান্ডা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না পথচারী থেকে সাধারন মানুষ। বলছিলাম দেশের উত্তরজনপদের সীমান্তঘেষা উপজেলা তেঁতুলিয়ার কথা। 

এই বরফ গলার ঠান্ডার মধ্যেই ঠান্ডাকে জয় করেই কাজ করছে চা শ্রমিকরা। গত কয়েক দিনের শৈতপ্রবাহে বিপর্যস্ত উত্তরজনপদের মানুষ। তবুও প্রচন্ড হিম কুয়াশার মধ্যে জীবন জীবিকার কাজে বের হচ্ছেন তারা। তবে তীব্র শীতের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেকেই কাজে যেতে না পারায় পোহাতে হচ্ছে মানবেতর জীবনযাপন। সপ্তাহ জুড়ে বইছে শৈত প্রবাহ। তীব্র শীতের কারণে বেকার হয়ে অর্ধ-অনাহারে জীবন কাটছে ছিন্নমূলসহ নিম্নআয়ের মানুষের। হাজার হাজার পাথর শ্রমিক, চা শ্রমিক, ভ্যান চালকদের জীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। এদিকে সীমান্ত নিকটস্থ হিমালয় পর্বত থাকায় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শীতের মাত্রা। শৈতপ্রবাহের ঘন কুয়াশায় দেখা যাচ্ছে না সূর্য। গত ৮ জানুয়ারি সর্বনিম্ন ২দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ঠান্ডায় কেঁপেছে এ এলাকার মানুষ। ৫০ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপামাত্রা আর শৈতপ্রবাহ দূর্ভোগে থেমে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। 

এদিকে গরম কাপড়ের অভাবে নিম্ন আয়ের মানুষগুলো বাড়ির উঠোনে খড়-কুটোতে আগুন লাগিয়ে শীত নিবারনের চেষ্টা করছেন তারা। সন্ধ্যা নামলেই ফাকা হয়ে যায় হাটবাজার ও শহর। কেউ কেউ যেখানে সেখানে খড়কুটো, টায়ারে আগুন লাগিয়ে ঠান্ডা শরীর গরম করার চেষ্টা করছেন। ঠান্ডার কারণে  

ফুটপাতের গরম কাপড়ের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভীড়। শীত নিবারনের চেষ্টায় অল্প টাকায় খুঁজছেন শতশত আধা-পুরোনো কাপড়গুলোর মধ্যে পছন্দের কাপড়। এ ভীড়ের মধ্যে বাদ পড়ছে না মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ বিত্তের ব্যক্তিরা। শীতের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নানা ঠান্ডাজনিত রোগ। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, হাইপারটেনশনসহ নানা শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু থেকে আবাল বৃদ্ধবনিতা। কর্মচঞ্চলতাহীন দেখা গেছে হাসপাতালেও চিকিৎসক সংকট। দুয়েকজন চিকিৎসক চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন রোগীদের। শীত স্বাভাবিক জীবনের স্থবিরতা আনলেও জয়গুন বেগমের মতো খেটে খাওয়া শ্রমিকদের কাছে শীতকে হার মানতে দেখা গেছে।

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ২৩:৫১:০৮