কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য সেবায় ভঙ্গুর দশা
জাহিদ আবেদীন বাবু, কেশবপুর (যশোর)
অ+ অ-প্রিন্ট
কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ডাক্তারদের অবহেলা, উদাসীনতা ও অর্থ বাণিজ্যের কারণে মানুষ জীবনের ঝুকি নিয়ে অভিজ্ঞ ডাক্তার, নার্স বিহীন স্থানীয় ক্লিনিকগুলোতে যেতে বাধ্য হচ্ছে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কতিপয় ডাক্তার অর্থের মোহে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশনের জন্য আসা বেশীভাগ রোগীকে অপারেশন বা চিকিৎসা সেবা না দিয়ে নানা অজুহাতে শহরে তাদের নিজস্ব চেম্বারে নিয়ে যান, অধিক পরীক্ষা নিরীক্ষার পরামর্শ্য দিয়ে ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে পাঠান। ঔষধ বিক্রয় প্রতিনিধি সন্তষ্ট করতে রোগিদের হাতে ঔষধের লম্বা প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দেন। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন করে কোন পয়সা পান না বলে ডাক্তাররা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন না করে চুক্তিবদ্ধ ক্লিনিকে অপারেশন করানোর জন্য রোগিদের প্ররোচিত করে থাকেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত ডাক্তারদের অবহেলা, উদাসীনতা ও অর্থ বাণিজ্যের কারণে ব্যাঙের ছাতার মতো কেশবপুরে গড়ে ওঠেছে ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার বলে এলাকাবাসির অভিযোগ। ক্লিনিক ব্যবসার সাথে জড়িত প্রভাবশালী কতিপয় ডাক্তারের কুটকৌশলের কারণে কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অভিজ্ঞ কনসালটেন্ট, সার্জন যোগদান করলেও তারা বেশীদিন টিকে থাকতে পারে না এলাকায় প্রচার রয়েছে 

কেশবপুরে  ১৯৭৮ সালে ৩১ শর্য্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০০০ সালে তা ৫০ শর্য্যায় উন্নীত করা হয়। প্রতিদিন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তাররা বর্হি:বিভাগে দেড়’শ থেকে দুই’শ রোগীকে চিকিৎসা এবং মাঝে মধ্যে বিষপানে আসা রোগীকে ওয়াশ করিয়ে থাকেন। জ্বরায়ু, সিজার, ডিম্বাশয়ের টিউমার, নাড়ী ছিদ্র, নাড়ী জড়ানো, হার্নিয়া, এপেন্ডিস, অন্ডকোষের পানি, পিত্তথলিতে পাথর এবং প্রস্রাবের থলির নানা জটিলতা অপারেশনের সকল যন্ত্রপাতি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকলেও এ জাতীয় কোন অপারেশন করা হয় না। মাঝে মধ্যে দু’এক জনকে অপারেশন করা হলেও তাদের বেশীভাগই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চাকুরিজীবিদের আত্মীয় স্বজন। 

জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র ৯ জন গর্ভবর্তী মাকে সিজার করা হয় এবং এর মধ্যে একজনের মৃত্যুও হয়েছে। মাইনর অপারেশন হয়েছে ২৫৪টি এবং এ সময়ের মধ্যে আউটডোরে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার ৬১৫ জন রোগীকে। পাশাপাশি শহরের ৭টি ক্লিনিকে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৮৬৩ জন রোগীকে সিজার ও মাইনর অপারেশন করা হয় এবং ৮০ হাজার ১৬৩ জন রোগীকে আউটডোরে চিকিৎসা সেবা দেওয়া  হয়েছে। যে কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বিমুখ হয়ে অপারেশনের জন্য আসা রোগিরা স্থানীয় ক্লিনিকগুলো থেকে সেবা নিতে বাধ্য হচ্ছে। শহরের মহাকবি মাইকেল ক্লিনিক, কপোতাক্ষ সার্জিক্যাল ক্লিনিক, মডার্ণ ক্লিনিক, মাতৃমঙ্গল ক্লিনিক, কেশবপুর সার্জিক্যাল ক্লিনিক, হেলথ কেয়ার হসপিটাল ও নাগরিক হসপিটাল ঔষধ ও সার্জন ফিসহ জ্বরায়ু অপারেশন ৪ থেকে ৬ হাজার, সিজার অপারেশন সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ হাজার, স্বাভাবিক সন্তান প্রসব দেড় থেকে ২ হাজার, ডিম্বাশয়ের টিউমার অপারেশন ২ থেকে ৩ হাজার, নাড়ী ছিদ্র অপারেশন ৫ থেকে ৮ হাজার, নাড়ী জড়ানো অপারেশন ৫ থেকে ৮ হাজার, হার্নিয়া অপারেশন ২ থেকে ৩ হাজার, এপেন্ডিস অপারেশন ৯‘শ থেকে ১২‘শ, অন্ডকোষের পানি অপারেশন ২ থেকে ৩ হাজার, পিত্তথলির পাথরসহ অন্যান্য অপারেশন ৫ থেকে ৭ হাজার এবং প্রস্রাবের থলির নানা জটিলতা অপারেশন করে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা নিয়ে থাকে। এ ৭টি ক্লিনিকে রোগী অপারেশন করা হয় কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার এবং যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে সার্জন এনে। যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরার কোন ক্লিনিকে এ জাতীয় অপারেশন করানো হলে ঔষধ ও সার্জন ফি বাদে রোগীকে ৪/৫ গুন বেশি টাকা দিতে হয়। কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোন ধরণের অপারেশন না হওয়ায় রোগীদেরকে যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরায় নিয়ে অপারেশন করালে টাকা লাগে কয়েকগুন বেশি। তাই বাধ্য হয়ে মানুষ কেশবপুরস্থ ক্লিনিকমূখী হয়ে পড়েছেন। ক্লিনিকে অভিজ্ঞ ডাক্তার, নার্স না থাকা ও রোগী মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্লিনিকগুলোতে ঘন ঘন মোবাইল কোর্ট বসিয়ে হাজার হাজার টাকা জরিমানা আদায় ও ক্লিনিক মালিকদের গ্রেফতার করা হয়। কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ৮ জন ডাক্তার ও ১৯ জন নার্স এবং অপারেশনের সকল যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও কোন রোগীকে অপারেশন করা হয় না এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও সেখানে মোবাইল কোর্ট তো দূরের কথা স্থানীয় প্রশাসন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মরত ডাক্তারদের অবহেলা, উদাসীনতা ও অর্থ বাণিজ্যের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকায় এলাকাবাসি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। 

যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার মধ্যবর্তী স্থান হওয়ায় কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গুরুত্ব অপরিসীম। পশ্চিমে কলারোয়া, দক্ষিণে ডুমুরিয়া ও তালা, উত্তরে মনিরামপুর উপজেলার অবস্থান সন্নিকটে হওয়ায় এ ৪ টি উপজেলার অধিকাংশ দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের চিকিৎসা ও অপারেশনের জন্য কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আগমন ঘটে। কিন্তু এখানে ভাল চিকিৎসা সেবা ও অপারেশন না হওয়ায় কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কতিপয় ডাক্তার, পল্লী চিকিৎসকদের পরামর্শ্যে রোগিরা নিরুপায় শহরের ৭ টি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন ও অপারেশন করিয়ে থাকেন।

গত ১৯ অক্টোবর উপজেলার ভালুকঘর গ্রামের মাহাবুবুর রহমানের স্ত্রী পারভীনা খাতুন ও ফতেপুর গ্রামের মফিদুল ইসলামের স্ত্রী ফতেমা খাতুন এরা দুজনই অন্ত:সত্ত্বা। হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে ক্লিনিকে ভর্তি হন শ্রীপুর গ্রামের আব্দুল গণি গাজীর স্ত্রী শিউলী বেগম, ভান্ডারখোলা গ্রামের মৃত পীর আলীর মেয়ে সাজেদা খাতুন, মধ্যকুল গ্রামের সুশান্ত সরকারের স্ত্রী পূর্ণিমা সরকার জানান, তাদের প্রসাব বেদনা শুরু হলে গত ১৫ অক্টোবর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হলে কোন ডাক্তার তাদেরকে সিজারিয়ান অপারেশন করতে রাজি না হওয়ায় বাধ্য হয়ে তাদের শহরের মর্ডাণ, কপোতাক্ষ সার্জিক্যাল ক্লিনিকে নিয়ে সিজারিয়ান করা হয়। 

ঔষধ বিক্রয় প্রতিনিধি এবং ঔষধের দোকানগুলি থেকে অবাক হবার মত তথ্য পাওয়া গেছে। ৭১টি ঔষধ কোম্পানীর প্রতি মাসে কেশবপুর শহরের ঔষধের দোকানগুলিতে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা থাকে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং তা পুরন হয় প্রতিমাসে। বিক্রয় প্রতিনিধিদের তথ্যে আরও জানা যায় অনেক মাসে চাহিদা মাফিক ঔষধ তারা সরবরাহ করতে পারেন না।

মহাকবি মাইকেল ক্লিনিকের মালিক ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি নাসির উদ্দীন গাজী জানান, কেশবপুরের ক্লিনিকগুলোতে কম খরচে যে সব অপারেশন করা হয় তা অন্য কোথায়ও সম্ভব হবে না। যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে সার্জন এনে ক্লিনিকগুলোতে রুগী অপারেশন করা হয়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপরেশন বন্ধ রয়েছে এবং জটিল কোন রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে তাকে না দেখেই রেফার্ড করে দেওয়া হয় অন্যত্র। এছাড়াও কোন রোগীর চিকিৎসা নিতে গেলে তাকে আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় শহরের কোন ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে। সে বাবদে ডাক্তার প্রতি রোগীর জন্য পেয়ে থাকেন ২শ টাকা এবং কমিশন তো আছেই। তিনি আরও বলেন, শহরের ৭টি ক্লিনিকে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৮৬৩ জন রোগীকে সিজার ও বিভিন্ন রোগের অপারেশন করা হয়েছে এবং ৮০ হাজার ১৬৩ জন রোগীকে আউটডোরে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শেখ আবু শাহীন জানান, এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কনসালটেন্ডসহ ৩২ জন ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও ইউনিয়নসহ আছে ১২ জন। জনবল সংকট এবং সার্জন না থাকায় অপারেশন করা হয় না। 

কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মিজানূর রহমান জানান, চিকিৎসক সংকটে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন বন্ধ রয়েছে। তবে দুই এক দিনের মধ্যে ৩ জন চিকিৎসক যোগদান করবেন। তখন হয়ত অপারেশন করা হবে। কেশবপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এইচ এম আমীর হোসেন জানান, জনবল সঙ্কটের কারণে কেশবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সেবা একেবারে ভঙ্গুর। ২০০০ সালে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শর্য্যায় উন্নীত হওয়ার পর মনে হয়েছিল এখানকার মানুষ ভাল স্বাস্থ্য সেবা পাবেন কিন্তু এখানে কোন কনসালটেন্ট, সার্জনকে নিয়োগ না দেয়ায় মানুষ স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। 

২৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:১৩:০৫